সংবাদদাতা, ঘাটাল: ঘাটাল শহরে মাঝে মধ্যে দেখা মেলে একটি হুড খোলা টোটোর। তাতে বসে কোনও বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা। গন্তব্য হাসপাতাল অথবা স্বাস্থ্যকেন্দ্র। শহরবাসীর কাছে ওই টোটোর পরিচয় ‘ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স’। অর্থাৎ, যাত্রীরা বিনামূল্যে পৌঁছে যান হাসপাতালে। পৌঁছে দেন চালক মিত্রপ্রসাদ বারুই।
ঘাটাল শহরের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের গোঁসাইপাড়ার বাসিন্দা মিত্রপ্রসাদ। বয়স ৫৬। সেলসের চাকরি করেন। বিয়ে-থা করেননি। সংসার বলতে বাড়িতে শুধু মা। তাঁর বয়স ৮০ বছর। নাম লাইলি শিকদার। তিনি একদা ঘাটাল বসন্তকুমারী বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। মায়ের সেবাযত্ন করতে করতেই মিত্রপ্রসাদ বুঝেছেন, বয়স হলে মানুষের জীবন কতটা কঠিন হয়ে ওঠে। বিশেষ করে অসুস্থ হলে, হাসপাতালে যাতায়াত করতে গেলে কিংবা হঠাৎ বিপদ এলে, পাশে কাউকে পাওয়া যেন বিরাট লড়াই। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি জুলাই মাসে ৬৫ হাজার টাকায় একটি টোটো কেনেন। সেটাকেই ব্যবহার করছেন বিনা ভাড়ার টোটো-অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে। মিত্রপ্রসাদ বলছিলেন, ‘আমার মা বৃদ্ধা। তাঁর দেখাশোনা করতে গিয়েই আমি বুঝেছি, বৃদ্ধবৃদ্ধাদের সমস্যাটা। তাই ভাবলাম, যদি আমি নিজের টোটোটা তাঁদের জন্য ব্যবহার করি, তাহলে অন্তত কিছু মানুষের কষ্ট কমবে। কোনও টাকা নিই না। এসব করি ভালোলাগা থেকেই।’ তিনি জানান, দিনের প্রথমে নিজের কাজে ব্যস্ত থাকেন। দুপুরের পর থেকে কল পেলেই ওই টোটো নিয়ে বেড়িয়ে পড়েন। কিন্তু, এখানেই শেষ নয়। মিত্রপ্রসাদের জীবনের আর একটা দিক সমাজের কাছে শিক্ষণীয়। ছোটবেলা থেকে পথকুকুরদের প্রতি টান তাঁর। এখন এলাকায় প্রায় ২৫টি পথকুকুরের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছেন। খাওয়ানো থেকে শুরু করে ভ্যাকসিন দেওয়া—সবটাই করেন নিজের খরচে। তিনতলা বাড়ির ছাদটাকে বানিয়ে ফেলেছেন সারমেয়দের আশ্রয়কেন্দ্র। দুর্ঘটনায় আহত কিংবা পা-হারা অসুস্থ কুকুররা সেখানে চিকিৎসা পায়, আশ্রয় পায়। আবার নতুন করে বাঁচার সুযোগ খুঁজে নেয়। ঘাটাল পৌরসভার কাউন্সিলার বিভাসচন্দ্র ঘোষ, স্থানীয় বাসিন্দা কার্তিক মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘মিত্রপ্রসাদের মতো উদ্যোগ আজকের দিনে খুব বিরল। যখন অনেকেই শুধু নিজের স্বাচ্ছন্দ্যেই সীমাবদ্ধ, তখন তিনি একা হাতে সমাজের জন্য নিঃস্বার্থ কাজ করে যাচ্ছেন। কারও ডাক্তার দেখানোর জন্য ভরসা। আবার আহত কুকুর বাঁচাতেও ভরসা মিত্রপ্রসাদ।’
আসলে মিত্রপ্রসাদের গল্পটা শুধু এক জন মানুষের নিঃস্বার্থ উদ্যোগ নয়। এটা একটা সামাজিক বার্তা। আমরা প্রত্যেকে যদি সামান্য করে এগিয়ে আসি, তাহলে সমাজে অনেক বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বৃদ্ধবৃদ্ধাদের পাশে দাঁড়ানো হোক কিংবা অসহায় প্রাণীদের জন্য একটু খাবার রাখা হোক এই ছোট্ট ছোট্ট কাজই আমাদের পৃথিবীটাকে অনেক সুন্দর করে তুলতে পারে। মনে করেন মিত্রপ্রসাদ।