Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সেনাপতিরা বিপদের কারণ হয়েছেন অতীতে

সঞ্জয় গান্ধী। অরুণ নেহরু। লালকৃষ্ণ আদবানি। এঁরা তিনজনেই হয়ে উঠেছিলেন সরকারের দ্বিতীয় পাওয়ার সেন্টার।

সেনাপতিরা বিপদের কারণ হয়েছেন অতীতে
  • ২৮ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: সঞ্জয় গান্ধী। অরুণ নেহরু। লালকৃষ্ণ আদবানি। এঁরা তিনজনেই হয়ে উঠেছিলেন সরকারের দ্বিতীয় পাওয়ার সেন্টার। প্রধানমন্ত্রীর পর সেকেন্ড ম্যান হিসেবে বিবেচিত হতেন তাঁরাই। ইন্দিরা গান্ধীর পতনের পিছনে অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছিলেন সঞ্জয় গান্ধী। কারণ ইন্দিরা গান্ধী সরকারের বিরুদ্ধে যত রকম সমালোচনা তৈরি হয়েছিল, তার সিংহভাগ সঞ্জয় গান্ধীর নীতি ও সিদ্ধান্তের কারণে। 

Advertisement

রাজীব গান্ধীর সরকারে ক্রমেই অরুণ নেহরু নিজেকে অঘোষিত উপ প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই প্রতিভাত করতেন। তাঁকেই বিশ্বাস করেছিলেন রাজীব গান্ধী। অথচ রাজীব গান্ধীর পতনের জন্য যে বোফর্স ইশ্যু ছিল অন্যতম কারণ, সেই ইশ্যুর প্রধান সেনাপতি ভি পি সিং-এর সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন অরুণ নেহরু। 
অটলবিহারী বাজপেয়ি বহুবার চেয়েছিলেন গুজরাত দাঙ্গার বিরুদ্ধে কঠোর কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে। অর্থাৎ মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সরিয়ে দেওয়া। সরকারের সেনাপতি, উপ প্রধানমন্ত্রী এবং দ্বিতীয় ক্ষমতাবান লালকৃষ্ণ আদবানি সেই কাজ করতে দেননি বাজপেয়িকে। ২০০৪ সালে এনডিএ পরাজিত হওয়ার পর ১২ জুন বাজপেয়ি স্বীকার করেছিলেন যে, সম্ভবত গুজরাত দাঙ্গা একটি বিশেষ কারণ এই পরাজয়ের। আমরা ভোটব্যাংক অটুট রাখতে পারিনি।
সুতরাং লক্ষ করা যাচ্ছে, স্বাধীনতার পর যে সরকারে প্রধানমন্ত্রীর পর আরও একজন কেউ মোস্ট পাওয়ারফুল ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছেন, তাঁদের নানাবিধ সরকারি নীতি, সিদ্ধান্ত, পরামর্শ সরকার গ্রহণ করার জেরে ভারতবাসীর মধ্যে তীব্র বিরূপ প্রভাব তৈরি হয়েছে। এবং সরকারের বিপদ ঘটেছে। অতীতের এই প্রবণতা থেকে কিন্তু বর্তমান এবং আগামী সরকারগুলির শিক্ষা নেওয়া দরকার। কারণ, একটি আপ্তবাক্য সর্বজনবিদিত। হিস্ট্রি রিপিটস ইটসেলফ। রাজনীতিতে এই আপ্তবাক্য সবথেকে বেশিবার প্রমাণিত হয়েছে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। অতএব সাধু সাবধান। 
কাশ্মীরের রাজা হরি সিং-এর পুত্র করণ সিং কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে সরাসরি ইন্দিরা গান্ধীকে ১৯৭৫ সালের ১২ জুন বলেছিলেন, আপনার ইস্তফা দেওয়াই সবথেকে আদর্শ এক সিদ্ধান্ত হবে। রাষ্ট্রপতির কাছে আজই পাঠিয়ে দিন ইস্তফাপত্র। সবেমাত্র এলাহারাদ হাইকোর্ট রায় দিয়েছে যে, ১৯৭১ সালে ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচনে জয় অবৈধ। তিনি সরকারি ব্যবস্থার অপব্যবহার করেছিলেন। প্রতিপক্ষ রাজনারায়ণ এই মামলা করেছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই আদালতের এই রায় ইন্দিরা গান্ধীর কাছে চরম ধাক্কা এবং অসম্মানেরও। করণ সিং একা নন, জগজীবন রামের মতো আরও কয়েকজনও বলেছিলেন ইস্তফা দেওয়াই সঙ্গত। কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্নমত পোষণ করেছিল অন্য একটি গোষ্ঠী। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশংকর রায়, দেবকান্ত বড়ুয়া, এইচ আর গোখলে, বিদ্যাচরণ শুক্ল, ওম মেহতা, বংশীলাল। কিন্তু সবথেকে  তীব্রতম আপত্তি ছিল একজনেরই। সঞ্জয় গান্ধীর। তিনি বলেছিলেন, কোনওভাবেই ইস্তফা দেওয়া চলবে না। এখানেই শেষ নয়। ২৫ জুন জরুরি অবস্থা জারি করার সিদ্ধান্তের পিছনে বড়ো অবদান সঞ্জয় গান্ধীরই। তিনি মনে করতেন, ইন্ডিয়ার অন্যতম সমস্যা টু মাচ ডেমোক্রেসি। অর্থাৎ অতিরিক্ত বেশি গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা। অতএব ইমার্জেন্সিই সঠিক পথ।
ইমার্জেন্সির আগে থেকেই সঞ্জয় গান্ধী ক্রমেই হয়ে উঠেছিলেন ইন্দিরা সরকারের দ্বিতীয় শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব। অঘোষিত সুপার প্রাইম মিনিস্টার। ইন্দিরা গান্ধীও অজ্ঞাত কারণে তাঁর এই ছোটো পুত্রকেই সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে রেখেছিলেন। তথ্য সম্প্রচার মন্ত্রী ইন্দ্রকুমার গুজরালকে সঞ্জয় বলেছিলেন, আপনাকে দিয়ে এই মন্ত্রক চলছে না। সরকারের ভালো ভালো কাজের প্রচার সেভাবে হচ্ছে না। এবার থেকে যে কোনও ইভেন্ট কভারেজ কিংবা বুলেটিন আগে আমার কাছে পাঠাবেন। আমি ক্লিয়ারেন্স দিলে সেগুলি টিভি এবং রেডিওতে সম্প্রচারের জন্য যাবে। অপমানিত গুজরাল বলেছিলেন, তোমার কাছে আমি পাঠাব না। তোমার মা প্রধানমন্ত্রী। তাঁর কাছে পাঠাব। তার পরিণতি হল, জরুরি অবস্থা জারির ঠিক পরদিন গুজরালকে ওই মন্ত্রক থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। 
সঞ্জয় গান্ধী সরকারের কেউ ছিলেন না। অথচ তিনিই সরকারের প্রধান নীতি নির্ধারক হয়ে উঠেছিলেন। নিয়েছিলেন ফাইভ পয়েন্ট প্রোগ্রাম। পরিবার পরিকল্পনা, পণ নেওয়া বন্ধ করা, গাছ লাগানো, বয়স্ক শিক্ষা এবং কাস্ট ব্যবস্থার অবলুপ্তি। প্রতিটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং অবশ্যকর্তব্য প্রকল্প। সকলেই সমর্থন করবে। কিন্তু সমস্যা হল, সেগুলি বাস্তবায়িত করার পদ্ধতি ছিল স্বৈরতান্ত্রিক। দিল্লির তুর্কমান গেটের ১৫০ পাকা বাড়ি ভেঙে দিয়ে ২৪ কিলোমিটার দূরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল বাসিন্দাদের। সংঘর্ষ গুলি, মৃত্যু হয়েছিল। পরিবার কল্যাণে পুরুষদের নির্বীর্যকরণ কর্মসূচি যেন অত্যাচারের নামান্তর হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং সব দোষ পড়ে ইন্দিরা গান্ধীর উপর। ১৯৭৭ সালের ভোট পর্যন্ত তাঁর সরকার এতটাই জনপ্রিয়তা হারায় যে মুখ থুবড়ে পড়ে কংগ্রেস। 
কংগ্রেস দলের জন্য সবথেকে বড়ো ক্ষতি করে দেয় জরুরি অবস্থা। ওই একটিমাত্র ক্ষত না থাকলে আজও কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বড়োসড়ো অস্ত্র ব্যবহার করতে পারত না কংগ্রেস বিরোধী দলগুলি। জরুরি অবস্থা একাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কংগ্রেসকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে। দায়ী সঞ্জয় গান্ধী। আজও অনেক ভালো প্রকল্প নেওয়া হয়। কিন্তু সেগুলি বাস্তবায়িত করার পদ্ধতি স্বৈরতান্ত্রিক। নাগরিককে অপমান করা সরকারের কাজ নয়। তাই আনপপুলার হচ্ছে সরকার। অতএব...। 
রাজীব গান্ধীর প্রমাতামহ মতিলাল নেহরু এবং অরুণ নেহরুর প্রপিতামহ নন্দলাল নেহরু ছিলেন দুই ভাই। অতএব গান্ধী নেহরু পরিবারের সরাসরি সদস্য অরুণ নেহরু। ১৯৮৫ সালে অরুণ নেহরু ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী। কিন্তু বুটা সিং অরুণ নেহরুকে স্যার সম্বোধন করতেন। অরুণ নেহরুর একটি ব্যক্তিগত চেম্বারে কংগ্রেসের নেতারা দেখা করতে এলে দাঁড়িয়ে কথা বলতে বাধ্য হতেন। সেই ঘরে কোনও চেয়ার থাকত না। তিনি পা সামনে ছড়িয়ে দিয়ে কথা বলতেন। কারণ আছে। ইন্দিরা গান্ধী একসময় অরুণ নেহরুকে বলেছিলেন, রাজীব সহজে সবাইকে বিশ্বাস করে। ওকে একটু বাঁচিয়ে রাখবে এরকম স্বার্থন্বেষীদের থেকে। সেই সুযোগ নিয়ে অরুণ নেহরু রাজীব গান্ধী সরকারের দ্বিতীয় পাওয়ারফুল ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন। সব মন্ত্রীকেই তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করতে হত। তিনি সকলকেই নির্দেশ দিতেন নানারকম। এবং একটা সময় এল যখন রাজীব গান্ধী সন্দেহ করতে শুরু করলেন, অরুণ নেহরু তাঁকে সরিয়ে সর্বোচ্চ পদ পেতে চাইছেন না তো? সেকেন্ড পাওয়ারফুল ম্যানদের সর্বদাই এই স্বপ্ন থাকে। প্রধানমন্ত্রী হওয়া।
তাই অরুণ নেহরুকে রাজীব গান্ধী অফার দিয়েছিলেন  ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত করার। নেহরু বলেছিলেন, আমাকে তুমি সরাতে চা‌ইছো সরকার থেকে। সেই শুরু দূরত্ব সৃষ্টির। বোফর্স ইশ্যু ১৯৮৭ সালে আছড়ে পড়েছিল। আর রাজীবের পতনের কারণও ক্রমেই স্পষ্ট হয়। অরুণ নেহরু তারপরই পুরোদস্তুর বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং-এর জনমোর্চায় চলে গিয়েছেন। লক্ষ্য ছিল রাজীব গান্ধীর পতন। তা‌ই হয়েছিল ১৯৮৯ সালে। 
আদবানি ও বাজপেয়ি দুজনে মিলে ১৯৮০ সালে তৈরি করেন ভারতীয় জনতা পার্টি। সেই দলকে নিয়ে বস্তুত ভারতের রাজনীতিকে সম্পূর্ণ বদলে দেওয়ার কাজ করেছিলেন লালকৃষ্ণ আদবানি ও অটলবিহারী বাজপেয়ি। কেউ কারও থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ নন। তবু বাজপেয়িকে বলা হত হিন্দুত্বের নরম মুখ। আদবানিকে কট্টরমুখ। বাজপেয়ি মুখোশ। আদবানি মুখ। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই বাজপেয়ি প্রধানমন্ত্রী হলেও উপ মুখ্যমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছিলেন আদবানি। যে ইগোর লড়াই ছিল নেহরু ও প্যাটেলের মধ্যে, অবিকল সেটা বহুবার দেখা গিয়েছে এই জুটির মধ্যেও। কারণ আদবানি দল ও সরকারে ছিলেন প্রবল প্রতাপশালী। সেকেন্ড ম্যান! 
লালকৃষ্ণ আদবানি ১৯৮৭ সাল থেকে একটি নিজস্ব তরুণ তুর্কি টিম তৈরি করেছিলেন। সুষমা স্বরাজ, অরুণ জেটলি, নরেন্দ্র মোদি, বেঙ্কা‌ইয়া নাইডু, প্রমোদ মহাজন, গোবিন্দাচার্য। এঁদের সকলের রাজনৈতিক গুরু আদবানি। অতএব সেই নরেন্দ্র মোদিকে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী পদে বসানোর পিছনে আদবানির অবদান সবথেকে বেশি। ২০০২ সালে গুজরাত দাঙ্গায় তিনি এবং অরুণ জেটলি সর্বতোভাবে চেষ্টা করছিলেন কীভাবে বাজপেয়ির ক্ষোভ, ক্রোধ, রোষ থেকে রক্ষা করা যায় নরেন্দ্র মোদিকে। কারণ বাজপেয়ি চাইছিলেন মোদি পদত্যাগ করুন। আদবানি সেটা চান না। বাজপেয়ি প্রকাশ্যে রাজধর্ম পালনের বার্তা দিয়েছিলেন। কিন্তু আদবানির চাপে মোদি স্বমহিমায় গদিকে রয়ে গিয়েছিলেন। 
আর তার জেরে তেলুগু দেশম থেকে তৃণমূল কংগ্রেস কিংবা রামবিলাস পাসোয়ানরা এনডিএ জোটের মধ্যে প্রবল ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। কেউ কেউ জোট থেকে বেরিয়ে এলেন। ২০০৪ সালে এনডিএ জোট দুর্বল হয়ে গেল। অবশেষে বিস্ময়করভাবে লোকসভা ভোটে পরাজয়ের পর বাজপেয়ি বললেন, ২০০২ সালের গুজরাত দাঙ্গা হয়তো পরাজয়ের কারণ হয়েছে কিছুটা।  কিছু ভোটব্যাংক মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। অতএব আদবানির ওই নরম অবস্থানকেই পরোক্ষে দায়ী করলেন বাজপেয়ি।
সুতরাং সরকারের দ্বিতীয় শক্তিশালীদের নিয়ে সতর্ক থাকা দরকার প্রধানমন্ত্রীদের! তাঁদের সিদ্ধান্ত দল ও সরকারের দুর্বলতার কারণ হয়েছে অতীতে। ভবিষ্যতে যে হবে না কে বলল? 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ