


ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের আবহে কোপ পড়েছে গেরস্থালিতে। রান্নার সিলিন্ডার সহজে মিলছে না। ফলে গ্যাস বাঁচাতে বিকল্প রান্নার নানা উপায় খুঁজছেন গৃহস্থ। রেস্তঁরা থেকেও খাবারের সম্ভার কমছে। এমন অবস্থায় বিকল্প রান্নার নানা রকমের উপায় আয়ত্তে আনতে চাইছেন গৃহস্থ। কেউ বা ফিরে গিয়েছেন পুরনো স্টোভ বার্নারে, কেউ আবার আধুনিক ইন্ডাকশন বা কনভেকশনে ভরসা করতে শুরু করেছেন। গ্রামগঞ্জে সনাতনী কয়লার উনুন হয়ে উঠছে মুশকিল আসান। কিন্তু কী পদ্ধতিতে রান্না করলে খাবারের পুষ্টিগুণ অটুট থাকে ও দূষণের মাত্রাও কমে, তা না জেনে রান্নার ধরন বদলালে গৃহস্থের আখেরে ক্ষতি। এই অবস্থায় গ্যাসের সবচেয়ে প্রচলিত বিকল্প ইন্ডাকশন ও কাঠ-কয়লার উনুন।
উনুনে রান্না: একসময় ঘরে ঘরে উনুনের রান্না প্রচলিত ছিল। এখনও নানা মুখরোচক রান্নায় স্মোকি ফ্লেভার আনতে কাঠ-কয়লা যোগ করেন। উনুনে করা রান্না সবসময়ই খেতে ভালো হয়। তার স্বাদ ভালো, তরিতরকারির পুষ্টিও তাতে বজায় থাকে। নানা রেস্তঁরায় কাঠকয়লার উনুনে তৈরি হান্ডি মাটন, বাঁশ পোড়া মাংস, বিরিয়ানি ইত্যাদি পদ যোগ করা হয়। তবে উনুনের প্রধান সমস্যা দূষণ। পরিবশ দূষণের পাশাপাশি উনুনের জন্য সিওপিডি, ফুসফুসের নানা অসুখ শরীরে বাসা বাঁধে। তাছাড়া গ্রামগঞ্জে গাছপালা বেশি বলে জ্বালানির জোগানও বেশি। শহরের দূষণে উনুনে রান্না খুব একটা কার্যকর নয়।
ইন্ডাকশন: সিলিন্ডার সমস্যায় অন্যতম সাহারা হয়ে উঠেছে ইন্ডাকশন কুকটপ। তার কারণ শুধু একটি বিকল্প ভাবনা ভাবাই নয়, বরং সাশ্রয়ী হয়ে ওঠাও। ১৪.২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম পড়ে ৯৩৯ টাকা। অর্থনীতিবিদদের মতে, গ্যাসে যে রান্না করতে চইছেন, তার সম পরিমাণ রান্না ইন্ডাকশনে করলে ইউনিট পোড়ে প্রায় ৮০-৯০ ইউনিট। বিদ্যুতের বিলে ইউনিটের দাম গড়ে ৭ টাকা করে হলে সেখানে খরচ দাঁড়ায় ৫৬০-৬৩০ টাকা। ফলে ইন্ডাকশনে খরচ বাঁচে প্রায় ৩০০-৩৫০ টাকা। তবে ইন্ডাকশনে রান্না একটু সময়সাপেক্ষ বটে। তবে এর দূষণের মাত্রাও অনেক কম। ইন্ডাকশনে তড়িৎ চুম্বকীয় ক্ষেত্র ব্যবহার করে রান্না করা হয়। ফলে খাবারের পুষ্টিগুণও বজায় থাকে। গ্যাসে রান্নার সময় প্রথমে বার্নার গরম হয়, তারপর ভেসেলকে গরম করে, তারপর সেই তাপ খাবারে পৌঁছয়। কিন্তু ইন্ডাকশনে যে পাত্রে রান্না হচ্ছে, সরাসরি তাতে তাপ পড়ে ও রান্না করা যায়। তাই গ্যাসের অপচয়ও ইন্ডাকশনে কম হয়। জল ফোটানোর ক্ষেত্রে গ্যাসের তুলনায় ইন্ডাকশনে ৭০ শতাংশ সময় কম লাগে।
কনভেকশনে রান্না: এই পদ্ধতিতে রান্না করলেও তেলের পরিমাণ কম লাগে। বেশিরভাগ ভাপা, রোস্ট ও বেকড খাবার এতে ভালো হয়। তাই তেল মশলা বেশি শরীরে প্রবেশ করে না। পুষ্টিগুণও সঠিক পরিমাণে পাওয়া যায়। রান্না করতে সময়ও লাগে অনেক কম। চটজলদি ওয়ান পট মিল হোক বা রোজের রান্না, কনভেকশনের রেডিয়েশন পদ্ধতিতে রান্নায় তার সর্বত্র সমানভাবে যায়। একসঙ্গে একাধিক ট্রেতে রান্না করা যায়। তাই সময়ও বাঁচে। তবে এর একটিই অসুবিধা, ইন্ডাকশনের তুলনায় বেশি বিদ্যুৎ খরচ হয়।
গ্যাসে রান্না বনাম এই তিন পদ্ধতি: এই প্রচলিত তিন পদ্ধতি ও গ্যাসের তুলনা করা হলে অবশ্যই রোজের রান্নায় গ্যাস সবচেয়ে বেশি কার্যকরী। তবে গ্যাসের আকালে অনায়াসে ভরসা করতে পারেন ইন্ডাকশন কুকটপ ও কনভেকশনের উপর। পকেটের কথা ভাবলে এই দুইয়ের মধ্যে সেরা আবার ইন্ডাকশন। এতে পুষ্টিগুণ মেলে। পরিবেশও দূষিত হয় না। স্বাদও ভালো হয়। তবে এখনো যাঁরা গ্যাস সিলিন্ডারের উপর ভরসা করেই রান্না করছেন, তাঁরা চাপা দিয়ে রান্না করা, গ্যাসের আঁচ ঢিমে রাখা, বারবার জল গরম না করে ফ্লাস্কে চা-কফি একবারে রাখা, প্রেশার কুকার বেশি ব্যবহার করা, এমন কয়েকটি প্রচলিত রান্নার নিয়ম মানলে অনেকটাই গ্যাস বাঁচাতে পারবেন।
লিখেছেন মনীষা মুখোপাধ্যায়।