


বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: রাজ্যবাসীকে স্বাস্থ্য পরিষেবা দেবে, নাকি পদ্ম শিবিরের হেভিওয়েট নেতাদের জন্য মেডিকেল টিম? এই করতে গিয়ে ঘুম উড়েছে স্বাস্থ্যদপ্তরের। প্রচুর নিয়োগ সত্ত্বেও রাজ্যজুড়ে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে ডাক্তার-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়ন্ত অবস্থা। দু-একজন ছুটিছাটা নিলেই পরিবর্ত হিসেবে রোস্টারে কাকে রাখা হবে, বাছাইয়ে দম বেরোয় কর্তাদের। তার মধ্যে গত একমাস ধরে নতুন তাড়নার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে মেডিকেল টিম। জেলায় কলকাতা বিমানবন্দর থাকায় সবচেয়ে বেশি কাহিল দশা হয়েছে উত্তর ২৪ পরগনা জেলা স্বাস্থ্যদপ্তরের। জেলা ও রাজ্য স্বাস্থ্যদপ্তর সূত্রের খবর, গত একমাসে দিনে গড়ে দুটি শিফটে ৫টি করে ১০টি মেডিকেল টিমের জোগান দিতে হচ্ছে পদ্মপার্টির বহিরাগত নেতামন্ত্রীদের ‘সেবায়’। দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, অসম, মধ্যপ্রদেশ প্রভৃতি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের জন্য গড়ে দুটি করে টিম দিতে হয়েছে। প্রতিটি টিমে একজন চিকিৎসক, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, নার্স, ড্রাইভার, এফএসও থাকছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের মেডিকেল টিমে দিতে হচ্ছে তিনজন চিকিৎসক। মেডিসিন স্পেশালিস্ট, সার্জন ও অ্যানাসথেসিয়োলজিস্ট। বাকিরা প্রথম টিমে যেমন আছেন। আজ প্রধানমন্ত্রীর সভা থাকায় এমন ৮টি মেডিকেল টিম মানে ডাক্তার-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মী মিলিয়ে ৪৮ জনের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে শুধু জেলা উত্তর ২৪ পরগনাকেই। ২১ এপ্রিল থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জন্য জেলাকে ব্যবস্থা করতে হচ্ছে ১৪টি মেডিকেল টিম মানে ৮৪ জন ডাক্তার-স্বাস্থ্যকর্মীর। গত এক-দেড় মাস ধরে ‘ভোট পাখি’ হয়ে উড়ে আসা কলকাতা এবং অন্যান্য জেলার বহিরাগত নেতা-মন্ত্রীদের জন্য মোট মেডিকেল টিমের সংখ্যা ধরলে, তা হাজার ছাড়াবে! পথদুর্ঘটনা ও মেডিকেল ইমার্জেন্সিতে আশঙ্কাজনক রোগীদের নিয়ে যাতায়াতের জন্য রাজ্য ৬৫টি হাইটেক অ্যাডভান্স লাইফ সাপোর্ট অ্যাম্বুলেন্স চালু করেছিল। দপ্তর সূত্রের খবর, সবকটিই এখন নিয়োজিত হয়েছে ভিভিআইপি সেবায়! অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, বহিরাগত ভিআইপি, ভিভিআইপিদের জন্য মেডিকেল টিমের ব্যবস্থাপনায় রোজ ভিসি করতে হচ্ছে স্বাস্থ্য, পুলিস এবং অন্যান্য দপ্তরকে। ফলে রাজ্যবাসীকে সুষ্ঠু চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার থেকে ফোকাস এখন সরে গিয়েছে অন্যত্র। উত্তর ২৪ পরগনার এক শীর্ষ স্বাস্থ্যকর্তা বলেন, টানা ১২ ঘণ্টার ডিউটির পরও যতক্ষণ না রিলিভার আসছে, নিষ্কৃতি দেওয়া হবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে ডাক্তারদের। সঙ্গে চূড়ান্ত দুর্ব্যবহার, অশালীন শব্দ প্রয়োগ। টানা ডিউটি শেষে বিশ্রামটুকু নেওয়া জায়গা দেওয়া হচ্ছে না আমাদের চিকিৎসক-কর্মীদের। জানি না কতদিন এইভাবে টানতে পারবেন ওঁরা।
কলকাতা বিমানবন্দর থেকে শহরে আসা পদ্মপার্টির ভিভিআইপিরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে থাকছেন রাজারহাটের এক পাঁচতারা হোটেলে। নীচে অ্যাম্বুলেন্সে মশার কামড় খেতে খেতে দু-চোখের পাতা এক করতে পারছেন না চিকিৎসকরা। বলেকয়ে রাজি করালে কোনোক্রমে ক্লান্ত শরীরকে এলিয়ে দিচ্ছেন হোটেলের লবির সোফায়। টিমের এক চিকিৎসক বললেন, ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নেই। একে-তাকে অনুরোধ করার পর মিলছে ওয়াশরুমে যাওয়ার অনুমতি।
অ্যানাসথেসিয়োলজিস্টের অভাবে রাজ্যের বহু হাসপাতালে সময়ে অপারেশন হয় না। সেখানে কলকাতা বিমানবন্দরে পদ্মপার্টির প্রভাবশালীদের সেবায় রাখা একটি এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ২৪ ঘণ্টা ডিউটিতে একজন অ্যানাসথেসিয়োলজিস্টকে রেখে দেওয়া হয়েছে। বেহালা ফ্লাইং ক্লাবেও শুক্রবার থেকে একটি হেলিকপ্টারও আসছে। সেজন্য বেহালার বিদ্যাসাগর হাসপাতালের আরও একজন অ্যানাসথেসিয়োলজিস্ট বা ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিশেষজ্ঞকে দেওয়া হয়েছে ভিআইপি ডিউটি।