


পরামর্শে কামারহাটির সাগর দত্ত মেডিকেল কলেজের মেডিসিনের অধ্যাপক ডাঃ জ্যোতির্ময় পাল।
ভ্যাকসিন এবং আমাদের শরীর
আমাদের শরীরে দুই ধরনের ইমিউনিটি কাজ করে। প্রথমটি ইননেট ইমিউনিটি। এর কাজ অনেকটা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মতো। আমাদের ত্বক বা মিউকাস মেমব্রেন হলো এই প্রাথমিক প্রতিরক্ষা বলয়। এই বাহিনী ব্যর্থ হলে ময়দানে নামে আসল সেনাবাহিনী বা অ্যাকোয়ার্ড ইমিউনিটি। এই সিস্টেমের অধীনে থাকে অত্যন্ত শক্তিশালী টি-সেল এবং বি-সেল। শরীরে নতুন কোনো জীবাণু ঢুকলে, এই সেলগুলো লড়াই করে জেতার পর সেই জীবাণুর একটি ‘স্মৃতি’ বা মেমোরি জমা রাখে। ভবিষ্যতে একই জীবাণু আবার আক্রমণ করলে শরীর আর সময় নষ্ট করে না; মেমোরি থেকে দ্রুত চিনে নিয়ে ব্যাপক হারে অ্যান্টিবডি তৈরি করে ফেলে। ভ্যাকসিনের মাধ্যমে আমরা এই ‘মেমোরি সেল’টাই আগেভাগে তৈরি করে রাখি। আসল রোগ হতে না দিয়ে শুধু জীবাণুর মৃত বা নিষ্ক্রিয় অংশ শরীরে প্রবেশ করানো হয়, যাতে শরীর তাকে চিনে ভবিষ্যতে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত থাকতে পারে। একেই আমরা বলি সেকেন্ডারি রেসপন্স তৈরি রাখা।
ভ্যাকসিনের সাফল্য ও ইতিহাস
১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় ভারতীয়দের গড় আয়ু ছিল মাত্র ৩৪ বছর! এর প্রধান কারণ ছিল সংক্রামক রোগে শিশুমৃত্যুর উচ্চ হার। ১৯৪৩ সালের জোসেফ ভোর কমিটির চিহ্নিত ছয়টি ‘কিলার ডিজিজ’— ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, টিটেনাস (ধনুষ্টঙ্কার), যক্ষ্মা (টিবি), পোলিও এবং হামের বিরুদ্ধে ভারত সরকার সার্বিক টিকাকরণ কর্মসূচি গ্রহণ করে। আজ ভারত বসন্ত ও পোলিওমুক্ত এবং আমাদের গড় আয়ু বেড়ে হয়েছে প্রায় ৬৬-৬৭ বছর।
সব বয়সের জন্য সুরক্ষা
ভ্যাকসিন মানেই শুধু শিশুদের বিষয় নয়। বর্তমানে আমাদের দেশে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। তাই তাঁদের সুরক্ষার কথাও ভাবতে হবে।
• শিশুদের জন্য: ভারত সরকারের ‘ইউনিভার্সাল ইমিউনাইজেশন প্রোগ্রাম’-এর অধীনে বিসিজি, পোলিও, হেপাটাইটিস-বি, পেন্টাভ্যালেন্ট (৫টি রোগের টিকা), রোটাভাইরাস (ডায়ারিয়া রোধে), নিউমোনিয়া (পিসিভি) এবং হাম-রুবেলার টিকা বিনামূল্যে দেওয়া হয়।
• বড়দের জন্য: হেপাটাইটিস-বি টিকা লিভারের ক্যানসার আটকাতে সাহায্য করে। ২৫ বছরের নীচে মেয়েরা এইচপিভি টিকা নিলে সার্ভাইক্যাল ক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় থাকে না বললেই চলে। বর্তমানে সরকার ১৪-১৫ বছর বয়সি কিশোরীদের এই টিকা বিনামূল্যে দিচ্ছে। ৩০ বছরের পর টিটেনাস বা ডিপথেরিয়ার বুস্টার ডোজ নেওয়াও জরুরি।
• বয়স্কদের জন্য: যাঁদের বয়স ৬৫ বছরের উপরে অথবা যাঁরা ডায়াবেটিস ও হার্টের সমস্যায় ভুগছেন, তাঁদের জন্য ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং নিউমোকক্কাল ভ্যাকসিন নেওয়া জরুরি। এটি বার্ধক্যের শ্বাসকষ্ট বা ফুসফুসের মারাত্মক সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। অকাল প্রাণহানি কমায়।
শেষ কথা
টিকা হয়তো সবক্ষেত্রে রোগ পুরোপুরি আটকাবে না। কিন্তু রোগের তীব্রতা ও হাসপাতালে ভর্তির আশঙ্কা কমিয়ে জীবন রক্ষা করবে। আধুনিক বিজ্ঞানের এই আশীর্বাদ গ্রহণ করে নিজেকে ও পরিবারকে সুস্থ রাখুন।
লিখেছেন: সুপ্রিয় নায়েক