


বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: শুরু হয়েছিল গতবছর অক্টোবরে। খুশি হয়েছিলেন নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত, এমনকি বহু উচ্চবিত্ত পরিবারও। কারণ, পিজি হাসপাতালে দিনে ১২-১৩ হাজার রোগীর ভিড়ে আউটডোরে সময় মেলে মাত্র ২ মিনিট! কত কথা জানানোর থাকে চিকিৎসককে। সেসব বলা দূরের কথা, ভিড় ঠেলে সিনিয়র ডাক্তারবাবুর নাগালই মেলে না। যতক্ষণে প্রশ্ন করবেন বলে ঠিক করলেন, ঘাড়ের কাছে নিশ্বাস পড়ছে পরের রোগীর—‘এগিয়ে যান, এগিয়ে যান তো, অনেক হয়েছে!’ পরিকাঠামোর তুলনায় কয়েকগুণ বেশি চাপ সহ্য করে পিজি। সেখানে এইভাবে ডাক্তার দেখাতে গররাজি, নিমরাজি মানুষজন হাতে যেন চাঁদ পেয়েছিলেন ‘অনন্য’ বা ‘উডবার্ন ২’ চালু হওয়ায়। কারণ এই বিভাগটি নামী প্রাইভেট হাসপাতাল বা নার্সিংহোমের ধাঁচে পরিচালিত হয়।
কারণ, যেসব নামী চিকিৎসকদের প্রাইভেটে দেখাতে কমপক্ষে হাজার টাকা ফি গুনতে হয়, পিজির তেমন বহু চিকিৎসককেই এখানে দেখানো যাচ্ছে মাত্র ৩৫০ টাকায়! তা সত্ত্বেও এত বড়ো উদ্যোগের সাফল্য নিয়ে চাপা টেনশন ছিল স্বাস্থ্যভবন থেকে পিজি—সবেরই বড়ো কর্তাদের মনে। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, সরকারি হাসপাতালের ভিতর প্রাইভেটে সময় নিয়ে ডাক্তার দেখানোর এই ব্যবস্থা হয়েছে একেবারে সুপারহিট!
সোমবার অনন্যতে গিয়ে জানা গেল, অক্টোবর থেকে এপ্রিলের এই পর্যন্ত প্রাইভেট চেম্বারের ধাঁচের এখানকার আউটডোরে ডাক্তার দেখিয়েছেন সাড়ে ১০ হাজার রোগী! প্রথম দিকে হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগোলেও, সময় যত এগিয়েছে, অনন্যর প্রাইভেট চেম্বারে যেন রোগীর ঝড় উঠেছে। সবচেয়ে বেশি রোগী এসেছেন গত জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে—যথাক্রমে ১৮১১, ১৮৯৪ ও ১৮৮৭ জন। এমাসের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই ১২০০ রোগী এসে দেখিয়ে গিয়েছেন স্পেশালিস্টদের।
পিজির এক কর্তা বললেন, এখানে রোজ তিনটে স্লট আছে দেখানোর। দুপুর ৩টে থেকে ৫টা। বিকেল ৫টা থেকে ৭টা। রাত ৭টা থেকে ৯টা। সপ্তাহের ছয়দিনে সব মিলিয়ে রয়েছে ৫০টি স্লট। বসছেন ২৩টি বিভাগের ৪৫ জন বিশেষজ্ঞ নামী চিকিৎসক। একেকটি দু-ঘণ্টার স্লটে ১০ থেকে ২৫ জন করে রোগী এসে দেখিয়ে যাচ্ছেন। এখন চাহিদা এমনই যে, পরবর্তী তিনমাসের আগে দেখানোর ডেটই মিলছে না!
কোন বিভাগে ডাক্তার দেখানোর চাহিদা সর্বোচ্চ? অনন্যর কর্মকর্তারা বললেন, চাহিদার শীর্ষে রয়েছে নিউরোমেডিসিন। তারপরই রোগীর ভিড় বেশি হচ্ছে জেনারেল সার্জারি, অর্থোপেডিকস, রিউম্যাটোলজি ও গ্যাসট্রো মেডিসিনের ডাক্তারদের চেম্বারে।
এদিন দেখা গেল, অনন্যতে ঢোকার আগে বড়ো সাইনবোর্ডে কবে, কোন সময়ে, কোন চিকিৎসক বসছেন, সেই পূর্ণাঙ্গ তালিকা টাঙানো। প্রাইভেট হাসপাতালের মতো ঝাঁ চকচকে আউটডোর তৈরি হয়েছে। গেটের মুখে নিরাপত্তারক্ষীর কড়া প্রহরা। কাছাকাছি গেলেই দুদিকে খুলে যাচ্ছে হালফ্যাশনের কাচের দরজা। রিসেপশনে রোগীদের টাকা জমা দেওয়ার লম্বা লাইন পড়েছে। তবে সমস্যা হল, এখানে বসবার জায়গা অপ্রতুল। তাই শুধুমাত্র রোগীকে বসতে দেওয়া হচ্ছে। বাড়ির লোকজনকে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে পাশেই অনন্যর ইনডোর বাড়ির একতলায়, প্রশস্ত রিসেপশনলাগোয়া বসবার বিশাল জায়গায়। বসবার জায়গার সমস্যার কথা স্বীকার করেছেন পিজির এক পদস্থ কর্তাও। বললেন, ‘দেখছি কী করা যায়’। নতুন পরিষেবা থেকে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্মীলাভ কেমন হচ্ছে? মুচকি হাসিতে তাঁর উত্তর ছিল, ‘ভালোই। কিন্তু কত, বলব না!’