মাতৃশক্তির আরাধনার সময় আসন্ন। যেসব মহিলা উদ্যোগপতি কাজের মাধ্যমে অনুপ্রেরণা দিচ্ছেন তাঁদের শক্তিকে কুর্নিশ করার সময়। আজ ‘আদি মোহিনী মোহন কাঞ্জিলাল’-এর কর্ণধার স্বর্ণালী কাঞ্জিলাল।
মাতৃশক্তির আরাধনার সময় আসন্ন। যেসব মহিলা উদ্যোগপতি কাজের মাধ্যমে অনুপ্রেরণা দিচ্ছেন তাঁদের শক্তিকে কুর্নিশ করার সময়। আজ ‘আদি মোহিনী মোহন কাঞ্জিলাল’-এর কর্ণধার স্বর্ণালী কাঞ্জিলাল।
সারি সারি শাড়ি। স্বর্ণালী কাঞ্জিলালের রোজনামচা এটাই। ফ্যাশন দুনিয়ায় তিনি পরিচিত নাম। শাড়ি যাঁরা ভালোবাসেন, তাঁদের কাছে আদি মোহিনী মোহন কাঞ্জিলাল এবং স্বর্ণালী কাঞ্জিলাল— এই দু’টি নাম সমার্থক। প্রতিষ্ঠানে গেলে বড়ো যত্ন করে শাড়ি দেখান স্বর্ণালী। ক্রেতার সামনে শাড়ির বর্ণনা হোক বা নতুন ডিজাইন নিয়ে তাঁতির সঙ্গে আলোচনা, সবেতেই পেশাদারিত্বের ছোঁয়া। কিন্তু তার মধ্যে লেগে থাকে আন্তরিকতার পরশ। এটাই এই প্রতিষ্ঠানের বিশেষত্ব। স্বর্ণালীর কথায়, ‘আমাদের ইউএসপি সাধ্যের মধ্যে স্বপ্নপূরণ। যে ক্রেতা হাজার টাকার শাড়ি কিনছেন আর যিনি দশ হাজার টাকার শাড়ি কিনছেন, দু’জনেই সমান গুরুত্ব পাবেন।’
গত ২৫ বছর ধরে সক্রিয় ভাবে এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত স্বর্ণালী। তার আগে তিন-চার বছর শিখেছেন। মহিলা হিসেবে এই পথচলা নেহাত সহজ ছিল না। তাঁর কথায়, ‘হাতেকলমে কাজ শুরু করার এক বছর পর অনুভব করেছি, কী করতে চাই, কোন স্বপ্ন পূরণ করতে চাইছি সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি। নিজেকে এগিয়ে এসে দায়িত্ব নিতে হয়। নাহলে কাজ হয় না। নারী হিসেবে ঘরে বাইরে ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হয়। ফলে বাড়িতে সকলের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকা জরুরি। তার জন্য ব্যক্তিজীবনে কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করেছি। সকলের জন্য সেই একই পদ্ধতি নাও হতে পারে। কারণ সকলের পরিস্থিতি এক নয়। আমার বাচ্চা যখন একেবারে ছোটো, তখন থেকে কাজ করছি। ওকে কোয়ালিটি টাইম দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কোয়ান্টিটি টাইম দিতে পারিনি। সেটা ব্যবসায় দিতে হয়েছে। শাশুড়ি মায়ের সঙ্গেও কোয়ালিটি টাইম কাটাতাম।’
ঘরে-বাইরে পরিবারের সমর্থন পেয়েছেন স্বর্ণালী। সেসব দিনের কথা মনে করে বললেন, ‘আমি এবং আমার স্বামী আশিস কাঞ্জিলাল একই ব্যবসায় জড়িত, এটা আমার কাছে বোনাস। আমাদের মতপার্থক্য হয়েছে। ওর থেকে শিখেওছি। তিন প্রজন্ম ধরে ওদের এই ব্যবসাটা চলছে। আবার আমি যুক্তি দিয়ে কোনো পরামর্শ দিলে সেটা ও শুনেছে, বুঝেছে। আমাকে এগিয়ে যাওয়ার জায়গাটা দিয়েছে। মেয়েরা জায়গা পায় না। আমি সেই জায়গাটা ধীরে ধীরে অর্জন করতে পেরেছি। তার জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। পরিশ্রমের বিকল্প হয় না।’
২৫ বছর আগে আদি মোহিনী মোহন কাঞ্জিলালের দোকান ৮০০ স্কোয়ার ফুট ছিল। সেটা আজ ৮০০০ স্কোয়ার ফুট হয়েছে শুধু কলেজ স্ট্রিটেই। এছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় এই প্রতিষ্ঠানের ১৫টি আউটলেট রয়েছে। সাফল্যের হাত ধরেই আসে চ্যালেঞ্জ। স্বর্ণালী বললেন, ‘কোভিড সব ব্যবসা শূন্যতে এনে দিয়েছিল। তখন থেকে অনলাইন কেনাকাটায় মানুষ আগ্রহী হয়েছেন। আমরাও মানুষের দরজায় পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা করেছি।’
সারা বছরই ব্যস্ততা থাকে। তবে পুজোর আগে স্বর্ণালীর ব্যস্ততা তুঙ্গে। এ বছর কোন ধরনের শাড়ির চাহিদা রয়েছে? ‘কারদানা জামদানি ট্রেন্ডিং। মোডাল উইথ মিরর ওয়ার্ক এগারোশো টাকায় পাবেন। অনেক তরুণী আমাকে এসে বলেন, অষ্টমীর দিন অঞ্জলি দেব এমন একটা বাজেট ফ্রেন্ডলি শাড়ি দেখাও। সফট, হালকা। তাদের জন্য এই দুটো অপশনই খুব ভালো। হ্যান্ডলুম ভালোবাসলে উড়িষ্যার হ্যান্ডলুম এবছর খুব ট্রেন্ডিং। পাশাপল্লি, বহেরমপুরি মানুষ চাইছেন। পাওয়ার লুমেরগুলো ১২০০ টাকা থেকে শুরু। হ্যান্ডলুমের দাম শুরু ১০ হাজার টাকা থেকে’, বললেন তিনি।
বাজারে নানা মানের শাড়ি পাওয়া যায়। ক্রেতারা আসল-নকলের পার্থক্য বুঝবেন কীভাবে? হেসে স্বর্ণালীর জবাব, ‘পাওয়ার লুম গ্লসি। চকচক করবে, স্লিপারি। হ্যান্ডলুম ম্যাট ফিনিশ, স্মুথ।’
মহিলা উদ্যোগপতি হিসেবে অনেকের অনুপ্রেরণা স্বর্ণালী। ভবিষ্যতে যেসব মহিলা এই ধরনের ব্যবসা শুরু করতে চান, তাঁদের কী পরামর্শ দেবেন? ‘মেয়েদের সুবিধা, শাড়ির প্রতি ভালোবাসা তাঁদের থাকেই। এটা বোনাস। এরপর দরকার টাইম ম্যানেজমেন্ট। ফান্ড বড়ো ফ্যাক্টর। আমার অসুবিধে হয়নি। কারণ আমি একটা চলতি ব্যবসায় যোগ দিয়েছিলাম। আমার যে ১২-১৩টা ফ্র্যাঞ্জাইজি রয়েছে, সেগুলো মহিলারাই পরিচালনা করেন। সকলেই গৃহবধূ ছিলেন। এখন ব্যবসা করছেন। দায়িত্ব নিতে হবে। কঠিন পরিশ্রম করতে হবে। লাভ ছাড়া ব্যবসা হবে না। কিন্তু লাভ দেখতে পাবেন দু’বছর পরে। এই দু’বছরের কী করছেন, কেন করছেন সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নিয়ে শুরু করুন।’
নিজস্ব প্রতিনিধি