সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: চিত্র-১: বাড়িতে এক ফোঁটাও জল নেই। কারখানায় কাজ সেরে হন্তদন্ত হয়ে জলের পাত্র নিয়ে সাইকেলে তপসিতে হাজির আসানসোলের ৭নম্বর ওয়ার্ডের সার্থকপুরের দীনেশ ঘোষ। রাজ্যের অন্যতম বৃহৎ পুরসভার বাসিন্দা তাঁরা। অথচ পানীয় জলের তীব্র সঙ্কট। ভরসা করতে হয় গ্রামীণ এলাকার উপর। প্রায় তিন কিলোমিটার দূর থেকে জল আনতে হয় সার্থকপুরের বাসিন্দাদের। তিনি বলেন, আমি কাজে চলে গেলে স্কুলপড়ুয়া ছেলেকেই দূর থেকে জল নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। জল ছাড়া তো বাঁচা যায় না!
চিত্র-২: আসানসোল শহরের আপকার গার্ডেন, ওয়েস্ট আপকার গার্ডেনে মূলত অভিজাতরা থাকেন। প্রাসাদোপম অট্টালিকা, কোটি কোটি টাকা মূল্যের গাড়ি রয়েছে। সেখানেও রয়েছে জল যন্ত্রণা। সেখানকার বাসিন্দা বৃদ্ধা দীপালি ভট্টাচার্য বলেন, অভিযোগ করে করে হাঁপিয়ে উঠেছি। দোতলা পর্যন্তই জল উঠছে না। পাইপ লাইনে জলের গতি এত কম। জল দেওয়ার সময়ও খুবই কমিয়ে দিয়েছে।
চিত্র-৩: কুলটির শিমুলগ্রামে পুরসভার জলের ট্যাঙ্কার ঢুকেছে। তা যেন ‘অমৃতকলস’। ‘দেব-দানবের যুদ্ধ’ হচ্ছে। কে একটু বেশি জল নিতে পারবে তা নিয়েই প্রতিযোগিতা। ছোট বড়, যার বাড়িতে যেমন পাত্র আছে তা নিয়ে লাইন দিচ্ছেন সকলে। জল নিয়ে নিত্য অশান্তি লেগে থাকে ট্যাঙ্কারের সামনে।
চিত্র-৪: পানীয় জলের দাবিতে শিল্পাঞ্চলে নিত্যদিন আন্দোলন চলছে। জল না পাওয়ার অভিযোগে ঢাং মহিশীলার বাসিন্দারা জল প্রকল্পের অফিসেই তালা দিয়ে দিয়েছিলেন। জামুড়িয়া বাইপাস রাস্তা অবরোধ করেও বিক্ষোভ দেখিয়েছেন মহিলারা।
ধর্মগ্রন্থে কথিত আছে ভগীরথ ধরাধামে মা গঙ্গাকে নামিয়ে এনেছিলেন। সেই দশরথকেই খুঁজছে শিল্পাঞ্চলবাসী, যিনি শিল্পাঞ্চলের জলকষ্ট পুরোপুরি ঘোচাবেন। কংগ্রেস আমল থেকে বাম আমল পেরিয়ে তৃণমূলের সরকার, থেকে গিয়েছে খনি অঞ্চলের জল যন্ত্রণা। জল সমস্যা মেটাতে বহু উদ্যোগ সত্ত্বেও পরিস্থিতি সেই তিমিরেই থেকে গিয়েছে। বহু জায়গায় পানীয় জল মিলছে না। এই পরিস্থিতিতে জল দিতে নাভিশ্বাস উঠছে পুরসভারও।
যদিও অনেকে এই কষ্টকে ‘ম্যানমেড’ বলছেন। পুরসভার জলচুরি ‘ক্যান্সারে’র আকার নিয়েছে। জনস্বাস্থ্য ও কারিগরি দপ্তর নতুন জল প্রকল্প করলেও প্রকল্পের মেন লাইন থেকেই ফুটো করে বিপুল পরিমাণ জল নিয়ে নেওয়া হচ্ছে। যা দিয়ে চলছে প্রভাবশালীদের হোটেল, ফ্যাক্টরি, শোরুম। এর পাশাপাশি কিছু অসাধু সাধারণ নাগরিক বাড়িতে দেওয়া পুরসভার জলের সংযোগের মুখে পাম্প বসিয়ে অতিরিক্ত জল টেনে নিচ্ছে। এর জেরে পরবর্তী বাড়িগুলি পর্যাপ্ত জল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যার ফলে জল নিয়ে হাহাকার দেখা দিয়েছে।
আসানসোল পুরসভার মেয়র পারিষদ সদস্য গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় বলেন, শহরের সর্বত্র পর্যাপ্ত জল দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় চুরি। জলের সংযোগের মুখে পাম্প বসানো আটকাতে আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি। আমরা জানিয়েছি, আন্ডারগ্রাউন্ড রিজার্ভার ছাড়া জলের সংযোগ দেওয়া হবে না। (চলবে)