Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

পরাক্রম থেকে প্রগতি, নেতাজির সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। সাহস, ত্যাগ আর স্বাধীনতার অদম্য নেশায় উজ্জ্বল এক জীবন

পরাক্রম থেকে প্রগতি, নেতাজির সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা
  • ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সিপি রাধাকৃষ্ণণ: নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। সাহস, ত্যাগ আর স্বাধীনতার অদম্য নেশায় উজ্জ্বল এক জীবন! আজ, জন্মবার্ষিকীর দিনে গোটা দেশ গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে সেই মৃত্যুহীন প্রাণকে। অল্প বয়সেই নীতি-আদর্শের দিক থেকে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী। ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, এমনকী ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎকেও হেলায় ত্যাগ করেছিলেন। নিজেকে সম্পূর্ণ রূপে উৎসর্গ করেছিলেন দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য। স্বাধীনতা ছিল তাঁর কাছে পবিত্র এক দায়িত্ব। এমন এক দায়িত্ব, যা পালন করতে প্রয়োজন কঠোর শৃঙ্খলা, ভয়ডরহীন মন আর সবটুকু উজাড় করে দেওয়ার মানসিকতা।

Advertisement

নেতাজির অন্যতম অনুরাগী ছিলেন ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ সন্তান কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯৩৯ সালে লেখা এক বার্তায় তিনিই ‘দেশনায়ক’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন সুভাষচন্দ্র বসুকে। কবিগুরু জানতেন, গুরুতর সংকটের সময় এমন একজন প্রাণবন্ত ও সাহসী নেতাকেই প্রয়োজন গোটা দেশের, যিনি যাবতীয় প্রতিকূলতাকে জয় করে বীরত্বের সঙ্গে এগিয়ে চলবেন। নেতাজির মধ্যে সাহস, দূরদর্শী চিন্তা আর নৈতিক শক্তির এক দুর্লভ সমন্বয় দেখেছিলেন তিনি।

নেতাজির যাত্রাপথ ছিল কঠিন সব সিদ্ধান্ত আর একক লড়াইয়ে ঘেরা। তাই তো যখন দেখলেন স্বাধীনতা অর্জনের জন্য চিরাচরিত পন্থা যথেষ্ট নয়, তখন নিজের রাস্তা নিজেই তৈরি করলেন। আজাদ হিন্দ ফৌজের মাধ্যমে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে পৌঁছে দিলেন বিশ্ব দরবারে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, ‘স্বাধীনতা আমাদের জন্মগত অধিকার। পৃথিবীর এমন কোনো শক্তি নেই, যা এই অধিকার থেকে আমাদের বঞ্চিত করতে পারে।’ তাঁর এই বিশ্বাসকেই বাস্তব রূপ দিয়েছিল ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’ (আইএনএ)।

নেতাজির সেই বজ্রনির্ঘোষ আহ্বান, ‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব’—আজও আমাদের শিহরিত করে। তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘স্বাধীনতা কেউ কাউকে দেয় না, তা অর্জন করতে হয়।’ সাহস এবং আত্মসম্মানে ভরপুর এই আহ্বান পৌঁছে গিয়েছিল ভারতের প্রতিটি প্রান্তে। দক্ষিণ ভারতের মানুষের মনে, বিশেষত তামিলদের হৃদয়ে তা গভীর রেখাপাত করে। নেতাজি এবং তামিল জনগণের এই আত্মিক ও আদর্শের সম্পর্ক ছিল আজাদ হিন্দ ফৌজের অন্যতম প্রধান শক্তি। নেতাজির জনপ্রিয়তা শুধু তৎকালীন মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, মালয়, বার্মা এবং সিঙ্গাপুরে বসবাসকারী তামিলদের মধ্যেও প্রবলভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল।

১৯২০ সালের গোড়ার দিকেই ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির রাজনৈতিক গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেন নেতাজি। মাদ্রাজ সফরে এসে সর্বত্র তিনি বিশাল জনসভা করেন। তাতে ছাত্রছাত্রী এবং রাজনৈতিভাবে সচেতন তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ব্যাপক উন্মাদনা সৃষ্টি হয়। শুধু সম্পূর্ণ স্বাধীনতা লাভই নয়,  বক্তৃতায় তিনি যেভাবে শৃঙ্খলাপরায়নতা এবং জাতীয় স্তরে পুনর্গঠনের ডাক দেন, তাতে তামিলদের সঙ্গে তাঁর বন্ধন আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

১৯৩৯ সালের ৩  সেপ্টেম্বর নেতাজি মাদ্রাজ সেন্ট্রাল স্টেশনে এসে পৌঁছান। তাঁকে স্বাগত জানান আইনজীবী এস শ্রীনিবাস আয়েঙ্গার এবং পি ইউ মুথুরামলিঙ্গা থেভার সহ অগণিত সমর্থক। সেই সন্ধ্যায় মেরিনা বিচে বিরাট এক জনসভায় ভাষণ দেন নেতাজি। সেই  সময় তামিলনাড়ুর ফরওয়ার্ড ব্লকের প্রধান নেতা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন মুথুরামলিঙ্গা থেভার। অনেকেই তাঁকে বলতেন, ‘বোস অব দ্য সাউথ’। আইএনএ-র প্রতি তামিলদের সমর্থনের নেপথ্যে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। আর একজন হলেন পেনাংয়ের যুবক রামু থেভার। আদতে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির রামনাড়ের এই বাসিন্দা মাত্র ১৪ বছর বয়সে আইএনএতে যোগ দেন। গোপন তথ্য আদানপ্রদানের কাজে লাগানো হয় তাঁকে। পরে ভারতে আসার চেষ্টা করলে তিনি গ্রেপ্তার হন। আলিপুর জেলে তাঁর ঠাঁই হয়। সেই সময় মা-কে লেখা রামুর চিঠিগুলি ছিল অবিচল দেশপ্রেমে পূর্ণ। ১৯৪৪ সালে, মাত্র ১৮ বছর বয়সে ফাঁসির হয় তাঁর। রামুর মা সেকথা জানতেন না। তিনি ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ছেলেকে অবিরত চিঠি পাঠিয়ে গিয়েছেন। নেতাজির যোদ্ধাদের মধ্যে অন্যতম লেফটেন্যান্ট আর মাধবন পিল্লাইও। ২০২৪ সালে পরাক্রম দিবস উদযাপনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁকে সংবর্ধনা দিয়েছেন।

সিঙ্গাপুরের পেডং-এ ১৯৪৩ সালে নেতাজির ভাষণ মালয়ে তামিল মহিলাদের মধ্যে বিপুল উদ্দীপনার সঞ্চার করে। অধিকাংশই ছিলেন রাবার বাগিচার শ্রমিক। ভারতবর্ষ কেমন দেখতে, সেটাও জানতেন না। তবু নেতাজির আহ্বানে প্রায় এক হাজার মহিলা স্বেচ্ছাসেবক যোগ দেন ঝাঁসির রানি রেজিমেন্টে।

ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী সায়গল বা ডঃ লক্ষ্মী স্বামীনাথনের সাহসের কথা সর্বজনবিদিত। কিন্তু, জানকী থেভার, অঞ্জলাই পোন্নুসামি এবং রসম্মা ভূপালনরাও কম যান না। জানকীর বয়স যখন ১৪, প্রথমবার নেতাজির ভাষণ শুনে নিজের কানে থাকা হীরের দুল খুলে দান করেছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজকে। পরে ঝাঁসির রানি রেজিমেন্টে শীর্ষ আধিকারিকের দায়িত্ব পালন করেন। সরস্বতী রাজামণিকে ভারতের কনিষ্ঠতম মহিলা গোয়েন্দা হিসাবে বিবেচনা করা হয়। মাত্র ১৬ বছর বয়সে আইএনএতে যোগ দেন। আসলে নেতাজি পুরুষ-মহিলা বিভেদের পক্ষপাতী ছিলেন না। আজাদ হিন্দ বাহিনীতে জাতপাতের বিভাজনও ছিল কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

পাণ্ডিত্যের সঙ্গে নির্ভীক মানসিকতার মেলবন্ধনে নেতাজি ছিলেন এক বিরল চরিত্র। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজনৈতিকভাবে স্বাধীনতা অর্জন এক যাত্রার সূচনা মাত্র। আসল কাজ হল একটি শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ ও আত্মনির্ভর ভারত গড়ে তোলা, যেখানে সকলে মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করবেন।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও সর্বদা ঔপনিবেশিক মানসিকতা ছেড়ে বেরিয়ে আসার উপর গুরুত্ব দেন। তাঁর ভাবনায় অনুপ্রাণিত হয়ে সরকার নেতাজির জন্মদিনটিকে পরাক্রম দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নেতাজির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কয়েকটি দ্বীপের নামকরণ করা হয়েছে, কর্তব্য পথে তাঁর প্রতিকৃতি বসানো হয়েছে। দেশের প্রতি তাঁর অবদানকে জাতীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

নেতাজি বলেছিলেন, ‘একজন ব্যক্তি একটি ভাবনার জন্য মৃত্যুবরণ করতে পারেন, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর সেই ভাবনাই হাজার হাজার জীবনকে প্রভাবিত করবে।’ তাঁর আদর্শ আজও ভারতকে পথ দেখায়। শুধু কথায় নয়, কাজেও আমরা তাঁর আদর্শকে অনুসরণ করে চলেছি। গোটা দেশ আজ সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরাক্রমকে প্রগতিতে পরিণত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ