Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

সতর্ক হলেই কমবে প্রতারণা

আগামী ২৪ ডিসেম্বর জাতীয় গ্রাহক দিবস। নিত্যদিন কতকিছুই কিনি আমরা। প্রতারিতও হই মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য কিনে।

সতর্ক হলেই কমবে প্রতারণা
  • ২০ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

আগামী ২৪ ডিসেম্বর জাতীয় গ্রাহক দিবস। নিত্যদিন কতকিছুই কিনি আমরা। প্রতারিতও হই মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য কিনে। ঠকে গেলে কী করবেন? মতামত দিলেন আইনজীবী  দেবাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়।

Advertisement

ঘটনা ১
বিপত্তি বাঁধল গত সপ্তাহে। স্কুলে পৌঁছেই শরীর খারাপ মিঠির। বদহজম, পেটের সমস্যা এমন পর্যায়ে পৌঁছল যে হাসপাতালে ভর্তি হতে হল একরত্তিকে। নিয়ম মেনেই মেয়েকে খাওয়ান মিঠির মা। এমন কিছুই দেওয়া হয়নি যাতে অসুবিধা হতে পারে! ভেবে আকুল পরিবার। চিকিৎসকরা জানালেন ময়দার বিষক্রিয়া থেকেই এই হাল! ফ্রিজে রাখা বাকি পাউরুটির প্যাকেটে চোখ গেল মিঠির ঠাকুরমার। সব ক’টি প্যাকেটই এক্সপায়েরি ডেট পেরিয়ে গিয়েছে! সেই অবস্থাতেই বিক্রি করেছে দোকানদার।
ঘটনা ২
মাসকাবারি দোকান থেকে জিনিসপত্র এসেছে বাড়িতে। সুচরিতার হঠাৎ চোখে পড়ল শিশিটা। ওষুধের দোকান থেকে কেনা বাচ্চার দুধের কৌটোয় ‘বেস্ট বিফোর’ লেখাটা দেখে হতবাক সে! কৌটোর দুধের মেয়াদ ফুরিয়েছে মাস খানেক আগেই। জিনিসটি ফেরত দিতে গেলে দেখা গেল আরেক ঝঞ্ঝাট! ওষুধের দোকানের বড় ব্র্যান্ড এভাবে জিনিস ফেরত নেবে না। তার জন্য নানা মেল চালাচালি, দরকারি ফর্মালিটিস! টাকার বিনিময়ে মেয়াদ উত্তীর্ণ জিনিস গছিয়ে দিয়ে ফের নানা নিয়ম দেখাচ্ছে স্টোর।
ঘটনা ৩
সামনেই ক্রিসমাস। নিজের চেষ্টায় একটা বেকারি দাঁড় করিয়েছে সোমক। আজও একটা অর্ডার আছে। কেকটা মাইক্রো আভেনে ঢোকানোর আগেই বিপত্তি! নামী ব্র্যান্ডের সব জিনিস ব্যবহারের পরেও কেকটা কেমন যেন দেখতে লাগছে! দুধসাদা কেকে কালচে ভাব কোথা থেকে এল! উপকরণগুলো দেখতেই চমকে উঠল সে। হুইপড ক্রিমটাই খারাপ হয়ে গিয়েছে! টিন উল্টে পণ্যের তথ্য দেখতে গিয়ে দেখা গেল প্রায় ১ মাস আগে ফুরিয়েছে মেয়াদ। সেই পণ্যই তাকে গছিয়ে দিয়েছে চেনা দোকানদার! সোমকও দেখে নেয়নি।
ঘটনাগুলি নানা গৃহস্থবাড়ির হলেও, এমন সমস্যায় কমবেশি আমরা সকলে পড়েছি। নিত্যপ্রয়োজনের নানা দ্রব্য ফি দিন কিনতে গিয়ে কখনও সখনও দু’তরফেরই গাফিলতিতে ব্যাগে চলে আসে নানা মেয়াদোত্তীর্ণ দ্রব্য। দু’তরফরই, অর্থাৎ দোকানি ও ক্রেতা। শুধু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসেই নয়, রান্না ও খাওয়ার সামগ্রী, ওষুধ, লোশন, ক্রিম, অপারেশনের সরঞ্জাম, প্রসাধনী দ্রব্য ইত্যাদি জিনিসেরও নির্দিষ্ট তারিখসীমা থাকে। তার মধ্যেই সেগুলি ব্যবহার করতে হয়। নইলে মেয়াদোত্তীর্ণ দ্রব্যে পরিণত হয় এগুলি। মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে বা এক্সপায়ারি ডেট চলে গেলেই সেই পণ্য দোকান থেকে সরে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় তা হয় না। সেখানেই প্রয়োজন পড়ে মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি এবং ক্রেতার আইনি সুরক্ষার দিকটি। 
তাহলে কী করব?
প্রাথমিক ক্ষেত্রে সচেতন হতে হবে। গ্রাহক হিসেবে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য যখনই কিনবেন, অবশ্যই সেই কৌটো বা প্যাকেটের গায়ে এক্সপায়ারি ডেট দেখে জিনিস কিনুন। কেউই কথায় কথায় আইন আদালত চায় না। তাই বাড়িতে কোনওভাবে মেয়াদোত্তীর্ণ জিনিস চলে গেলে প্রথমেই দোকানিকে জানান। তাঁরই উচিত সেটি সঙ্গে সঙ্গে বদলে দেওয়া। প্রমাণস্বরূপ পণ্যের প্যাকেটের গায়ে যেখানে মেয়াদের তারিখ দেওয়া আছে, তার ছবি বা ভিডিও তুলে রাখুন। দোকানিকে বদলাতে বলার পরেও যদি তিনি অস্বীকার করেন বা বদলে দিতে না চান, তখনই আসে আইনের প্রশ্ন। যদি স্থানীয় দোকান থেকে পণ্য না কিনে কোনও ডিলার বা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে কেনেন, সেক্ষেত্রে অনেক সময় মুখোমুখি কথা বলে দ্রব্য বদলানো যায় না। মেল, অফিসিয়াল চিঠি এসবের পর্ব থাকে। প্রয়োজনে সে পথে হাঁটতে হতে পারে। 
তাতেও কাজ না হলে?
জাতীয় গ্রাহক হেল্পলাইন নম্বর হতে পারে আপনার বন্ধু। যে কোনও জিনিস কিনে ঠকে গেলেই এখানে অভিযোগ জানানো যায়। অভিযোগ করুন ১৮০০-১১-৪০০০ বা consumerhelpline.gov.in-এ। জেলাভিত্তিক আলাদা আলাদা হেল্পলাইন নম্বরেও যোগাযোগ করে অভিযোগ দাখিল করা যায়। মেয়াদোত্তীর্ণ জিনিস ব্যবহার করে কারও শারীরিক ক্ষতি হলে চিকিৎসার নথিও জরুরি নথির মধ্যে পড়ে। এতে অভিযোগ আরও পোক্ত হয়। তবে চিকিৎসার নথি না থাকলেও অভিযোগ করা যায়। অনেক সময় বড় ডিলার বা এজেন্টের সঙ্গে বদলের জন্য প্রয়োজনীয় যোগাযোগ করা সম্ভবপর হয় না। তখন সরাসরিই অভিযোগ জানাতে পারেন কনজিউমার ফোরামে। পুলিশের কাছেও অভিযোগ দায়ের করা যায়।
আইন কী বলছে
কনজিউমার প্রোটেকশন ল, ২০১৯, লিগ্যাল মেট্রোলজি (প্যাকেজড কমোডিটিজ) রুলস, ২০১১, খাদ্য নিরাপত্তা ও মানদণ্ড আইন, ২০০৬ ইত্যাদি নানা আইনি দিক রয়েছে ক্রেতার পক্ষে। এসব আইনে প্রতারকের শাস্তি ও জরিমানার বিধান রয়েছে। যেমন: লিগ্যাল মেট্রোলজি (প্যাকেজড কমোডিটিজ) রুলস, ২০১১-র অধীনে ৬ /১ (ডি) বিধি অনুসারে, প্যাকেটজাত পণ্যে ‘বেস্ট বিফোর ’ বা ‘ইউজ বাই’ কথাটি রাখা বাধ্যতামূলক। পণ্যটি কোন কাঁচামালে প্রস্তুত তাও লিখতে হবে প্যাকেটের গায়ে। তার পুষ্টিগুণও লিখতে হবে। বিধি ১৮(২) অনুসারে মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য কেউ বিক্রি করলে তাঁকে প্রথমবারের জন্য ২৫,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা দিতে হতে পারে। এই কাজের পুনরাবৃত্তি হলে কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। আবার খাদ্য নিরাপত্তা ও মানদণ্ড আইন, ২০০৬-এর ২৬ নং ধারায় মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যকে ‘অসুরক্ষিত খাদ্য’ হিসাবে ধরা হয়। ধারা ৫৯ অনুসারে, বিক্রেতার ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা ও কারাদণ্ড হতে পারে। 
মনীষা মুখোপাধ্যায়

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ