Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ভারতের উচ্চশিক্ষায় জালিয়াতি!

গবেষণার মান নয়, এখন যেন সাফল্যের মাপকাঠি হয়ে উঠেছে— ক’টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হল, কোন জার্নালে ছাপা হল কিংবা সেই গবেষণার ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর কত।

ভারতের উচ্চশিক্ষায় জালিয়াতি!
  • ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

দুর্নীতি দানা বেধেছে ভারতের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাক্ষেত্রে। গবেষণার মান নয়, এখন যেন সাফল্যের মাপকাঠি হয়ে উঠেছে— ক’টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হল, কোন জার্নালে ছাপা হল কিংবা সেই গবেষণার ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর কত। এই রেটিং-র‌্যাঙ্কিং নির্ভর কাঠামো গবেষকদের উপর ফেলছে অতিরিক্ত চাপ, যা অনেককেই ঠেলে দিচ্ছে অনৈতিক পথের দিকে। ২০২১ সালের জুলাইয়ে বেঙ্গালুরুর ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেস তাদের একটি গবেষণা নিবন্ধ ‘নেচার কেমিক্যাল বায়োলজি’ থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। কারণ? গবেষণার তথ্যচিত্রে ছিল জালিয়াতির ছাপ। অথচ এই গবেষণা নিবন্ধকে একসময় রাসায়নিক জীববিদ্যায় যুগান্তকারী আবিষ্কার হিসেবে দেখা হয়েছিল। এমনই আরও একটি ঘটনা ঘটে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে। বারাণসী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের কোভ্যাক্সিন-সম্পর্কিত গবেষণা ‘ড্রাগ সেফটি’ জার্নাল থেকে প্রত্যাহার করা হয়। কারণ, গবেষণায় উল্লিখিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলি উপস্থাপন করা হয়েছিল এমনভাবে, যা বিভ্রান্তিকর বা ভুল ব্যাখ্যার জন্ম দিতে পারত। এই ঘটনাগুলি বিচ্ছিন্ন নয়। গত দুই দশকে ভারতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা অন্তত ৫৮টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করেছেন। অভিযোগ, ওই গবেষণাপত্রগুলির বেশিরভাগই অন্যের গবেষণাপত্র থেকে টোকা!

Advertisement

আন্তর্জাতিক গবেষণা পর্যবেক্ষণভিত্তিক সংস্থা রিট্র্যাকশন ওয়াচ-এর তথ্য অনুযায়ী, গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের প্রধান কারণগুলির মধ্যে রয়েছে প্রতারণা, গুরুতর ভুল, নৈতিকতা লঙ্ঘন, প্রকাশনা নীতিমালা ভাঙা ও আইনি জটিলতা। এই ধরনের অনিয়ম কেবল একটি গবেষণার মানই ক্ষুণ্ণ করে না, বরং গোটা দেশের অ্যাকাডেমিক প্রতিষ্ঠানের উপর আস্থার সংকট তৈরি করে। আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব ও গবেষণা অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। গত এক দশকে ভারতের গবেষণা কাজে এসেছে ব্যাপক গতি। আমেরিকার ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিজ্ঞান ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে গবেষণাপত্র প্রকাশে ভারতের অবস্থান এখন চীন ও আমেরিকার পরেই। তথ্য বলছে, ১৮৬৭ সালের পর থেকে ভারতে ৩৬.৭ লাখ গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে ৩ হাজার ৪৪৬টি (০.০৯ শতাংশ) প্রত্যাহার করা হয়েছে। যদিও আনুপাতিক হার হিসেবে এটি কম। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এই প্রত্যাহারের হার দ্রুত বাড়ছে। ১৯৯১–২০০০ সময়কালের তুলনায় ২০০১–২০১০-এ তা বেড়েছে ৬.৩ শতাংশ, আর ২০১১–২০২০ সময়কালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ শতাংশে। এখনও পরিস্থিতির বিশেষ হেরফের হয়নি। পুনে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষকের ভাষায়, ‘যখন একজন বিজ্ঞানীর পেশাগত টিকে থাকা নির্ভর করে ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টরের উপর, তখন নৈতিকতা কেবল বিলাসিতা মনে হয়।’ ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টরের অর্থ, কোনও জার্নালে প্রকাশিত প্রবন্ধ কতবার উদ্ধৃত হচ্ছে তার গড় হার। এই সূচক এখন নিয়োগ, পদোন্নতি, র‌্যাঙ্কিং ও গবেষণা অনুদান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যা গবেষকদের উপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এই চাপই অনেক সময় গবেষকদের অনৈতিক শর্টকাট পথে ঠেলে দেয়। গবেষণা ও প্রকাশনার নৈতিকতা বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘কমিটি অন পাবলিকেশন এথিক্স’ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন নির্দেশিকা দিয়ে আসছে। ভারতের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েও পিএইচডি শুরুর আগে গবেষণার নৈতিকতা নিয়ে কোর্স বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব গবেষণাকাজে এসব নির্দেশনার প্রতিফলন কতটা ঘটছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
বর্তমানে ভারতের শিক্ষাক্ষেত্রে এক ভয়ঙ্কর প্রবণতা বিস্তার লাভ করছে, যাকে বলা হয় ‘পাবলিশ অর পেরিশ’। অর্থাৎ, গবেষণা প্রকাশ করুন, নইলে হারিয়ে যান। এই মানসিকতায় পদোন্নতি, চাকরি রক্ষা ও অনুদান পাওয়ার একমাত্র মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রকাশনার সংখ্যা। ফলে গুণগত গবেষণা অনেক সময়েই পিছনে পড়ে যাচ্ছে। এর চাপ অনেককে অনৈতিক পথে পরিচালিত করছে, যা বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে। শুধু নীতিমালা থাকলেই গবেষণায় নৈতিকতা রক্ষা সম্ভব নয়। দরকার গঠনমূলক সংস্কার। অ্যাকাডেমিক মূল্যায়নের পদ্ধতি ও পরিকাঠামোয় পরিবর্তন না আনলে অনৈতিকতা প্রতিরোধ কঠিন। এই দুর্বলতার মূল প্রোথিত ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়ে। নতুন জ্ঞান, অপ্রচলিত চিন্তা, ব্যতিক্রমী গবেষণার সঙ্গে আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার কোনও সম্পর্কই যেন নেই। মুখস্থ বিদ্যা, ছাঁচে-ঢালা পঠন-পাঠন, ছকে-বাঁধা পরীক্ষার বৈচিত্র্যহীন ঘানি ঠেলছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি। এ দেশে হাতে-গোনা কয়েকটি গবেষণা-প্রতিষ্ঠান বিশ্বমানের, অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান মাঝারি মানের, অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ই শুধুমাত্র ডিগ্রির কারখানা। শিক্ষকদের পদোন্নতির জন্য গবেষণাপত্র প্রকাশের শর্ত ভারতে বিকৃত হয়েছে, নিম্নমানের প্রকাশনায় হাস্যকর ‘গবেষণাপত্র’-র আবর্জনা বাড়ছে। বিষয়টি উদ্বেগজনক।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ