সংবাদদাতা, রামপুরহাট: ভিন রাজ্যে কাজে গিয়ে ফের আক্রান্ত বাংলার চার পরিযায়ী শ্রমিক। এবারের ঘটনাস্থল তামিলনাড়ু। বাংলায় কথা বলার অপরাধে একটি ঘরে আটকে রেখে নির্মমভাবে মারধরের পর কেড়ে নেওয়া হয় সর্বস্ব। শুধু তাই নয়, প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে পরিবারের কাছ থেকে অনলাইনে কয়েক হাজার টাকাও হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। রবিবার দুপুরে ওই চার শ্রমিক ঠিকাদারের নামে নলহাটি থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে।
সম্প্রতি, ঝাড়খণ্ডে মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার এক শ্রমিককে খুনের অভিযোগ ওঠে। প্রতিবাদে দিন দুয়েক আগে সড়ক অবরোধ করে আগুন জ্বালিয়ে তুমুল বিক্ষোভে নামেন বেলডাঙার বাসিন্দারা। এরই মধ্যে এবার তামিলনাড়ুতে নলহাটির চার শ্রমিক আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় পরিচায়ী শ্রমিক পরিবারগুলিতে আতঙ্ক বাড়ছে।
জানা গিয়েছে, গত সোমবার নলহাটির আমলাই গ্রামের লতিফুর শেখ, সমৃত লেট, এন্তাজ শেখ ও রাফিউল শেখ নামে চার শ্রমিক তামিলনাড়ুতে কাজে যান। অভিযোগে তাঁরা জানিয়েছেন, তামিলনাড়ুর একটি তেল পাম্পে মোটা টাকা বেতনের টোপ দিয়েছিল ঠিকাদার দিলীপ মাল। সেই মতো গত বুধবার তামিলনাড়ুর ইরোড জংশনে তাঁরা নামেন। সেখান থেকে একঘণ্টা বাসে চেপে যাওয়ার পর একটি জায়গায় পৌঁছন। এরপর ঠিকাদার তাঁদেরকে কাজের জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়ি পাঠায়। মাঝপথে গাড়িটি থামিয়ে সবাইকে. নেমে যেতে বলা হয়। সেখানেই একটি ঘরের মধ্যে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখা হয়। আগে থেকেই ওই ঘরে বেশ কয়েকজন ছিল। তাঁদের কারও হাতে লাঠি, কারও হাতে চাকু, স্ক্রু-ড্রাইভার, কারও হাতে হাতুড়ি ছিল। হাঁটু গেড়ে বসিয়ে ব্যাপক মারধর করে শ্রমিকদের কাছে টাকা ও জামাকাপড় কেড়ে নেয়। পরে খুনের হুমকি দিয়ে তাঁদের বাড়িতে ফোন করে একটি নম্বরে অনলাইনে মাথাপিছু ১৫ হাজার টাকা করে পাঠাতে বলতে বাধ্য করা হয়। সেই টাকা পাঠাতে দেরি হওয়ায় নির্মমভাবে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। এন্তাজ শেখ বলেন, ‘পরিবার থেকে টাকা পাঠানোর পর আমাদের মোবাইল ফোনগুলি কেড়ে নেয়। পরে একটি গাড়িতে চাপিয়ে জঙ্গলের ভিতরে এনে আমাদেরকে ফেলে দেয়। সেখান থেকে আমরা কোনওরকমে স্টেশনে এসে ট্রেন ধরে গত শুক্রবার রাতে বাড়ি ফিরি।’ নির্যাতনের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন রাফিউল। বলেন, ‘গরিব মানুষ আমরা। পাথর শিল্পাঞ্চলের ধুলো খেয়ে অনেকেই রোগে ভুগে মারা যাচ্ছেন। তাই দিলীপদা যখন তামিলনাড়ুতে মোটা মাইনের কাজের সন্ধান দিল, তখন সেখানে গেলাম। কিন্তু এমন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে ভাবিনি।’
আক্রান্ত শ্রমিকদের রোজগারেই চলত সংসার। পরিবার এবং এই দুঃস্থ শ্রমিকদের কাছ থেকে টাকা ছিনিয়ে নেওয়ায় এখন সংসার চলবে কীভাবে, তা ভেবেই দিশাহারা পরিবার। রাফিউল বলেন, ‘এর আগে দিলীপদার অধীনে আমি ও লতিফুর কেরালায় একটি হাসপাতাল বিল্ডিং নির্মাণ কাজে রাজমিস্ত্রির শ্রমিকের কাজ করেছি। তবে ওর ফোন নাম্বার জানলেও বাড়ি কোথায় জানি না। দিলীপদা তামিলনাড়ুতেই থাকে। দশজন শ্রমিক চেয়েছিল। আমরা চারজন গিয়েছিলাম।’
পশ্চিমবঙ্গ পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য মঞ্চের রাজ্য সভাপতি মহম্মদ রিপন শেখ বলেন, ‘বিভিন্ন রাজ্যে বাংলার শ্রমিকদের মারধর সহ নানাভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে। সেখানকার পুলিশের কাছে গিয়েও সুবিচার পাচ্ছেন না। আমাদের বারবার আবেদন সত্ত্বেও বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের দুর্দশার সমাধানে কোনও গরজ দেখাচ্ছে না কেন্দ্র।’