Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

‘মমতা’র স্পর্শে জীবন বদল প্রাক্তন মাওবাদী রাজু হাঁসদার, আজ পা মেলাবেন মুখ্যমন্ত্রীর মিছিলে

‘মমতা’র স্পর্শে সেই ত্রাস রাজুর চোখে আজ দিনবদলের স্বপ্ন। তবে, তা বন্দুকের নলে নয়, প্রেম-ভালোবাসা আর উন্নয়নে।

‘মমতা’র স্পর্শে জীবন বদল প্রাক্তন মাওবাদী রাজু হাঁসদার, আজ পা মেলাবেন মুখ্যমন্ত্রীর মিছিলে
  • ৬ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

প্রদীপ্ত দত্ত, ঝাড়গ্ৰাম: বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস। বদলানো যায় সমাজ—এমন দর্শনে উদ্বুদ্ধ হয়ে মাওবাদী দলে নাম লিখিয়েছিলেন বিনপুরের রাজু হাঁসদা। একদা তাঁর নামে কাঁপত গোটা জঙ্গলমহল। ‘মমতা’র স্পর্শে সেই ত্রাস রাজুর চোখে আজ দিনবদলের স্বপ্ন। তবে, তা বন্দুকের নলে নয়, প্রেম-ভালোবাসা আর উন্নয়নে। রাজু এখন নিজেই বলছেন, ‘আমার জীবনদর্শন বদলে দিয়েছেন একজনই। তিনি বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।’ আজ, বুধবার ঝাড়গ্রামে বাংলা ভাষার সম্মান রক্ষায় মুখ্যমন্ত্রী মিছিলে পা মেলাবেন রাজু। হয়ে উঠবেন মাওবাদীদের মূলস্রোতে ফেরার মমতার আহ্বানের সেরা ‘পোস্টার বয়’। 

Advertisement

তখন ভরা বাম-শাসন। দারিদ্র আর অনাহারকে সঙ্গী করে জঙ্গলমহলে বড় হয়েছেন রাজু। চোখের সামনে দেখেছেন গরিব নেতাদের বড়লোক হয়ে ওঠা। ধীরে ধীরে তাঁদের বিরুদ্ধে আক্রোশ তৈরি হয়। রাজু তখন কিশোর। গরম রক্ত বইছে শিরা-উপশিরায়। সেই রক্তকে আরও তাতিয়ে দিয়েছিল মাওবাদীরা। একদিন জঙ্গলবাসীর দারিদ্র মোচনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে হাতে অস্ত্র তুলে নেয় রাজু। সেই শুরু। অরণ্য ও পাহাড়ের গোপন ঘাঁটিতে চলত যুদ্ধের প্রশিক্ষণ। তারপর রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একাধিক হিংসাত্মক ঘটনায় অংশ নেওয়া। রাজুর মতো  অরণ্যভূমে বহু যুবক বন্দুক কাঁধে তুলে নিচ্ছেন। মাওবাদীদের শীর্ষনেতারা পাড়ায় পাড়ায় গোপন বৈঠকে মগজ ধোলাই করছেন। সিধো-কানহো-বিরসা লড়াইয়ের কথা শোনাচ্ছেন। শিহরিত হচ্ছেন রাজুরা। রক্তে রাঙা হচ্ছে সবার হাত। এভাবে আর কতদিন? সন্ত্রাসের রাজনীতিতে তো আর দুঃসময় ঘুচছে না জঙ্গলমহলের! মাওবাদীদের সশস্ত্র সংগ্রামের লক্ষ্য নিয়ে ধন্দ বাড়ছে। এলাকার চেনা মানুষকে শত্রু হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বন্দুকধারী যুবকরা গোপন ঘাঁটিতে আসা দাদা-দিদিদের কাছে সেই নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। বেগতিক বুঝে মাওবাদী নেতা-নেত্রীরা প্রশ্নের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে দিয়েছেন। রাজুদের বুঝতে আর বাকি রইল না—সশস্ত্র সংগ্রামের নামে জঙ্গলমহলে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা চলছে। স্বার্থের সংঘাতে তাঁদের সামনের সারিতে এগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বাসস্থান নিয়ে কোনও আলোচনা হচ্ছে না। 
মালাবতীর আলো আঁধারি  জঙ্গলে দেড় দশক আগের দিন এখনও টাটকা রাজুর স্মৃতিতে। বলছিলেন, ‘তখন আমি সদ্য তরুণ। মেদিনীপুরের একটি  কলেজে সাঁওতালি ভাষা নিয়ে ভর্তি হয়েছি। চারিদিকে এত বৈভব, চাকচিক্য কিন্তু জঙ্গলের মানুষ কেন দু' বেলা খেতে পাচ্ছে না, তার কারণ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। সিধো-কানহো-বিরসার লড়াইয়ের কথা বুকে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছিল। শহরের দাদা-দিদিদের মুখে আমাদের উপর অবিচার, অন্যায়ের কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে পড়েছিলাম। সশস্ত্র সংগ্রামের পথেই আমাদের দারিদ্র ও অনাহার কাটবে ভেবেছিলাম। এলাকার অনান্য যুবকের সঙ্গে আমিও বন্দুক কাঁধে তুলে নিয়েছিলাম। পরে অবশ্য বুঝতে পারি, আমরা অন্যের হাতের বন্দুক হয়ে উঠছি। ট্রিগার টিপছে ওরা। কিন্তু, মূলস্রোতে ফেরার কোনও উপায় ছিল না।’
রাজ্যে পালাবদল হল। মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে শপথ নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মাওবাদীদের মূলস্রোতে ফেরাতে প্যাকেজ ঘোষণা করেন। সেই সঙ্গে ঢালাও উন্নয়ন। রাজু বলছিলেন, ‘বাংলায় পালাবদল আমাদের সামনে এক নতুন পথ খুলে দেয়। মুখ্যমন্ত্রী জঙ্গলমহলের মানুষের ভালো চাইছেন। উন্নয়নের কর্মযেজ্ঞে তার প্রমাণ পাচ্ছিলাম। তাই, আগ্নেয়াস্ত্র ফেলে উন্নয়নের অস্ত্রকে বেছে নিয়েছি। এখন জোর দিয়ে বলছি, উন্নয়নের অস্ত্র সন্ত্রাসবাদ নিপাত যাক। আজ মুখ্যমন্ত্রীর মিছিলে যোগ দিয়ে আরও জোরদার আওয়াজ তুলব।’   রাজু হাঁসদা

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ