নিজস্ব প্রতিনিধি, কৃষ্ণনগর: মায়াপুরের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ইসকনের ভিতরে ও বাইরে অলোক প্রভু ছিলেন অত্যন্ত পরিচিত নাম। তাঁর আরও একটা পরিচয়ও ছিল—জমি মাফিয়া। দীর্ঘ সময় ধরে মায়াপুর ও তার আশেপাশের এলাকার জমির কেনাবেচা হতো অঙ্গুলি হেলনেই। প্রতিষ্ঠান ও সাধুর পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিল গোটা এলাকায়। ফুলে ফেঁপে উঠেছিল তাঁর প্রোমোটারির ব্যবসা। মায়াপুরের কোন জমি কত দামে বিক্রি হবে, সেটাও ঠিক হতো অলোকের কথাতেই। কম দামে কেনা জমি চড়া দামে বিক্রি করে মোটা টাকা কামানোই ছিল কাজ। এমনকী, চারগুণ দামেও নিজের নামে থাকা জমি বিক্রি করেছেন তিনি।
কথায় বলে, লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। অলোক প্রভুর ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই ঘটেছে। বিপুল সম্পত্তির মালিকানার পর খুনের অভিযোগে ধরা পড়েছে তিনি। সেই মামলার জল এখন কতদূর গড়ায় সেই দিকে নজর সবার। তার আগে জমি কেলেঙ্কারিতে তার নাম জড়ানো নিয়ে সরগরম মায়াপুর। তাঁর এই কাজে প্রতিষ্ঠানের বেশ কয়েকজন জড়িত ছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি ধৃত অলোক প্রভুকে নিয়ে ইসকনের শীর্ষ মহলের আভ্যন্তরীণ বৈঠক হয়। সেই বৈঠকের কার্যবিবরণীতেই তাঁর জমি কেলেঙ্কারির বিষয়টি উঠে আসে।
বর্তমানে নবদ্বীপ ব্লকের মায়াপুর ও তার আশেপাশের এলাকার জমি কিনতে গেলে নাভিশ্বাস ওঠে সাধারণ মানুষের। মায়াপুরের জমির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে যাওয়ার পিছনে অলোক প্রভুর বড় ভূমিকা ছিল বলেই মনে করেন অনেকে। ২০০৯ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১২ বছর মায়াপুর ইসকনের জমি বিভাগের দায়িত্ব সামলেছিলেন তিনি। সেই দায়িত্বে থাকাকালীনই তাঁর প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়ে। ইসকনের শীর্ষ কর্তাদের কার্যবিবরণী থেকে জানা গিয়েছে, ইসকনের অপর এক কর্তার সহযোগিতায় অলোক প্রভু নিজের নামে এবং তৎকালীন আরও তিনজন ইসকন নেতার নামে জমি লিখিয়ে নিয়েছিলেন। এমনকী নিজের ব্যবসার স্বার্থে ইসকনের সেই জমি উপর দিয়ে রাস্তাও তৈরি করেন। ইসকন কর্তৃপক্ষের দাবি, এর জেরে মায়াপুরের জমির বাজারে ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল। শুধু তাই নয়, ইসকনকেও কয়েকশো কোটি টাকার ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল অলোক প্রভুর এই কীর্তির জন্য। কারণ, ইসকনের মাস্টার প্ল্যান ল্যান্ডের জন্য নির্ধারিত জমি কিনতে গিয়ে সংস্থাকে এই অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। যা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে শীর্ষ কর্তাদের। এমনকী সবকিছু জানার পরও প্রতিষ্ঠানের ভিতরে তাঁর বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস ছিল না কারও। যার জেরেই ১০০ কোটি টাকার সম্পত্তি বানিয়ে ফেলে সে।
২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি রাতে নবদ্বীপ থানার অন্তর্গত মায়াপুর গৌরনগরে খুন হন ঘি ব্যবসায়ী রিপন দাস ওরফে রসিক শেখর দাস (৩২)। সেই মামলা নয়া মোড় নেয় ১৩ জুলাই। ওইদিন নবদ্বীপ থানার পুলিশ অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র-সহ গ্রেপ্তার করে কোতোয়ালি থানার গঙ্গাবাসের বাসিন্দা আব্বাস আলি শেখ ওরফে আকাশকে। পরে সিআইডি তাকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। সেখানেই উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। তদন্তকারীদের সন্দেহ, আব্বাস সরাসরি যুক্ত ব্যবসায়ী হত্যাকাণ্ডে। তার বয়ানে সামনে আসে আর এক নাম—অলোক প্রভু। সিআইডি নিশ্চিত হয়, খুনের ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে বড় ভূমিকা ছিল অলোকের। মনে করা হচ্ছে, সুপারি কিলারের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছিল রিপন দাসকে। আর সেই পরিকল্পনায় ইন্ধন জুগিয়েছিলেন অলোক প্রভুই।