নিজস্ব প্রতিনিধি, আসানসোল: নদীয়ার মায়াপুরের পর আসানসোল। ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’-এর মাধ্যমে প্রতারণার জাল ক্রমেই ছড়াচ্ছে বাংলায়। কাজ হচ্ছে না সরকারি পর্যায়ে সচেতনতামূলক প্রচারেও! তার চেয়েও বড় কথা, যাঁরা প্রতারিত হচ্ছেন, তাঁরা প্রায় সকলেই যথেষ্ট উচ্চশিক্ষিত। ক’দিন আগে মায়াপুরে যে মহিলা ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’-এর ফাঁদে পড়ে এক কোটি টাকাও বেশি খুইয়েছেন তিনি ইংরেজি সাহিত্যে তুখোড়। এবার আসানসোলে যিনি সাড়ে তিন কোটি টাকারও বেশি খোয়ালেন তিনিও সাধারণ কেউ নন। ‘ভারত কুকিং কোল লিমিটেড (বিসিসিএল)-এর অবসরপ্রাপ্ত কর্তা! অন্য আর একটি প্রতারণার ঘটনায় প্রায় ২ কোটি ৫৩ লক্ষ টাকা খুইয়ে পথে বসার জোগাড় শিল্পাঞ্চলের এক বড়মাপের ঠিকাদারের। শেয়ার বাজারে টাকা বৃদ্ধির ফাঁদে পা দিয়েছিলেন তিনি। পর পর ঘটে যাওয়া এই দু’টি হাই প্রোফাইল প্রতারণাকে ঘিরে এখন তোলপাড় গোটা আসানসোল। উদ্বিগ্ন পুলিস-প্রশাসনও। এসিপি (সাইবার) বিশ্বজিৎ নস্কর বলেন, ‘এক সপ্তাহের মধ্যে দুই বড় সাইবার প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। দু’টি তদন্তেই প্রাথমিক সাফল্য এসেছে। তবে আক্ষেপের বিষয় যেটা, আমাদের শত চেষ্টাতেও হুঁশ ফিরছে না কারও।’
দেশের নামজাদা কয়লা উত্তোলনকারী সংস্থা বিসিসিএল। কেন্দ্রীয় কয়লা মন্ত্রকের নিয়ন্ত্রণাধীন এই সংস্থার বেশিরভাগ অংশ ঝাড়খণ্ডে। কুলটি এলাকায়ও সংস্থার একটি এরিয়া রয়েছে। এখানকার কর্মী থেকে আধিকারিকদের অতি উচ্চ বেতন। সংস্থারই চিফ জেনারেল ম্যানেজার পদে কর্মরত ছিলেন অমল মান্না। অবসর নেওয়ার পর আসানসোল কোর্ট মোড়েই থাকতেন। অবসরকালীন সুযোগ সুবিধাও বেশ ভালোই ছিল। স্বাচ্ছন্দে জীবন কাটছিল তাঁর। ছন্দপতন ২৯ মে। ওইদিন ফোন করে তাঁকে জানানো হয়, তাঁর অ্যাকাউন্ট থেকেই কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হয়েছে। বিষয়টি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের নজরে এসেছে। এরপরই উচ্চ পদস্থ পুলিস আধিকারিক পরিচয় দিয়ে অমলবাবুর কাছে একের পর এক হুমকি ফোন আসে। আইনি পদক্ষেপ হিসেবে তাঁকে ‘ডিজিট্যাল অ্যারেস্ট’ করা হয়েছে বলে জানিয়ে দেওয়া হয়। বাড়ির বাইরে বেরোলেই গ্রেপ্তার। ভয়ে ঘরবন্দি হয়ে পড়েন অমলবাবু। অদৃশ্য লোকেদের নজরদারিতে শুরু তাঁর দিন যাপন। এরপর বিষয়টি সালটে দেওয়ার প্রস্তাব দিতে থাকে প্রতারকরা। পাশাপাশি, চাপও দেওয়া হয়। বাধ্য হয়ে অমলবাবু প্রতারকদের অ্যাকাউন্টে প্রস্তাবমতো টাকা পাঠাতে শুরু করেন। জানা গিয়েছে, ৩৩ দিন বন্দি থেকে মোট ৩ কোটি ৬৮ লক্ষ পাঠানোর পর হুঁশ ফেরে অমলবাবুর। ১ জুলাই ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’-এর ফাঁদ কেটে আসানসোল সাইবার থানায় মামলা রুজু করেন তিনি। তদন্তে নেমে এখন পর্যন্ত ৮৪ লক্ষ টাকা বাজেয়াপ্ত করতে সমর্থ হয় পুলিস।
অন্যদিকে, ২৯ জুন, রবিবার সাইবার থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন আসানসোলের এক পরিচিত ঠিকাদার। রাতারাতি ধনী হওয়ার টোপ গিলে শেয়ারে টাকা বিনিয়োগ করতে গিয়ে প্রতারকদের ফাঁদে পড়েন তিনি। খোয়া যায় ২ কোটি ৫৩ লক্ষ টাকা। তদন্তে নেমে প্রাথমিক সাফল্য পেয়েছে পুলিস। চার অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শুক্রবার ধৃতদের আসানসোল আদালতে তোলা হয়। ১০ দিনের পুলিস হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক। খোয়া যাওয়া টাকা ও মূল অভিযুক্ত এখনও অধরা। তার খোঁজে ভিন রাজ্যে পাড়ি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে পুলিস।