Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

কুয়াশাভেজা বার্সের ট্রেক পথ

গ্যাংটক থেকে জোরথাং আসতে সময় লাগে আড়াই ঘণ্টা কিন্তু খুব খারাপ রাস্তা আর ধস সারানোর কাজ চলছিল বলে সেই রাস্তাটুকু আসতে সময় লেগে গেল প্রায় চার ঘণ্টা।

কুয়াশাভেজা বার্সের ট্রেক পথ
  • ৫ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

গ্যাংটক থেকে জোরথাং আসতে সময় লাগে আড়াই ঘণ্টা কিন্তু খুব খারাপ রাস্তা আর ধস সারানোর কাজ চলছিল বলে সেই রাস্তাটুকু আসতে সময় লেগে গেল প্রায় চার ঘণ্টা। জোরথাং যখন পৌঁছেছিলাম তখন মনের মধ্যে একটা অজানা আশঙ্কা, ওখরের গাড়িটা পাব তো? আশঙ্কা যে এমন অক্ষরে অক্ষরে ফলে যাবে কে জানত? পশ্চিম সিকিমের এই পাহাড় ঘেরা ওখরেতে যাওয়ার কোনও গাড়ি নেই আপাতত। শুধু আছে তরিতরকারি বোঝাই একটা ছোট্ট ট্রেকার। অনেক কাকুতি মিনতি করে তাকেই রাজি করানো হল। 

Advertisement

পাহাড়ের পাকদণ্ডী বেয়ে গাড়ি ক্রমশ উপরে উঠতে লাগল। জানলার কাচের শাসন না মেনে কুয়াশা আমাদের গায়ে মাখিয়ে দিচ্ছিল প্রেমের পরশ। পাহাড়ি জমিতে অদ্ভুত সুন্দর ফুল, স্ট্রবেরি গাছ, পাহাড়ি শাক। রোদ-কুয়াশা মাখা পাহাড়ে হঠাৎ নামা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। আমাদের গন্তব্য পশ্চিম সিকিমের ওখরে গ্রাম। সেখান থেকে যাব হিলে হয়ে বার্সে রডোডেনড্রন অভয়ারণ্য।
আমরা যখন ওখরে পৌঁছলাম তখন বিকেল হয়ে গিয়েছে। আমাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল শেরপা লজে। পবন শেরপা হাসিমুখে এগিয়ে এসে করমর্দন করে বললেন, ‘জ্যাকেট পহন লিজিয়ে, রাত মে বহুত ঠান্ডা হোগা।’ জোরথাং থেকে ওখরের পথে অদ্ভুত সুন্দর মেঘ কুয়াশা মাখানো রাস্তায় পড়েছিল আরও দু’টি পাহাড়ি গ্রাম— ড্রামডিম আর সোমবড়িয়া। জোরথাং থেকে সোমবড়িয়ার দূরত্ব ৩৫ কিমির কাছাকাছি। এখানে অনেকে বার্ড ওয়াচিং ক্যাম্প করেন। থাকার জন্য আছে ফরেস্ট বাংলো, হোটেল ও লজ। 
এবার বার্সে রডোডেনড্রন অভয়ারণ্যে অনেক রকমের ফুল দেখতে পাব। আমরা এপ্রিলে এসেছি, এটি পাহাড়ের প্রস্ফুটিত হওয়ার সময়। আর কপাল ভালো থাকলে দেখা মিলতেও পারে রেড পান্ডার! সামনে আঁকাবাঁকা উঁচু-নিচু রাস্তা চলে গিয়েছে হিলের দিকে, পাশের সরু রাস্তা উপরে উঠেছে পুরনো এক মনাস্ট্রির পথে।
শীতটা ক্রমশ জাঁকিয়ে পড়ছে। দু’পাশে শুধু পাইনের বন আর রডোডেনড্রন গাছ, তাতে ফুটে আছে নানা বর্ণের রডোডেনড্রন। পাহাড়ি কুয়াশাভেজা বাতাসে ভেসে আসছে মনাস্ট্রির পবিত্র সুর। চড়াই-উতরাই বেয়ে ক্রমশ এগিয়ে চললাম পড়ন্ত বেলার শীত গায়ে মেখে। 
পরেরদিন ভোরবেলায় নির্মল শেরপার গাড়ি চড়ে রওনা হলাম হিলের উদ্দেশ্যে। দারুণ রাস্তা, তবে দিনের বেলাতেও মেঘ কুয়াশার জন্য বেশ অন্ধকার। গাড়ি ক্রমশ পাহাড়ের পাকদণ্ডী বেয়ে উঠতে লাগল, আধঘণ্টার মধ্যে হিলে পৌঁছে 
গেলাম। সামনেই বার্সে রডোডেনড্রন অভয়ারণ্যের প্রবেশদ্বার, আমরা পারমিট করিয়ে নিলাম চেকপোস্টে। বাইরের রডোডেনড্রন গাছটায় দেখলাম একটা ব্লু থ্রোটেড বার্বেট বসে আছে। মোট ১০৪ বর্গফুট বিস্তৃত এই অরণ্যে মূলত অ্যালপাইন জাতীয় গাছ। বার্সে প্রবেশের জন্য হিলে দিয়ে এলেই সুবিধা।  
হিলে থেকে ঘন পাহাড়ি জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ট্রেক রুট। ফার্ন, মস, রডোডেনড্রনের ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সরু পাহাড়ি রাস্তা আপনাকে নিয়ে যাবে অজানা পৃথিবীর সন্ধানে। যেখানে আপনি জঙ্গলের আদিমতা অনুভব করবেন। কোনওরকম গাইড ছাড়াই ট্রেক শুরু করলাম। আসার সময় শুনেছিলাম এই অভয়ারণ্যেই নাকি দেখা মেলে বিরল সেই নীল রডোডেনড্রন ফুলের। যত রাস্তা পেরচ্ছি ততই গাছের পাতার রং ফুলের রং প্রকৃতি বদল হতে লাগল। ক্রমশ রূপসী হচ্ছে চারপাশের জঙ্গল। মাঝে মাঝে কুয়াশার চাদর এসে ঢেকে দিচ্ছে আমাদের। এই জঙ্গলে নাকি প্রচুর হিমালয়ান ব্ল্যাক বিয়ারের দেখা মেলে। সেই আতঙ্ক মনে বেশ একটা রোমাঞ্চ জাগাচ্ছে। দু’পাশে ফুটে আছে নানা বর্ণের রডোডেনড্রন। 
একসময় এসে পড়লাম সম্পূর্ণ রডোডেনড্রন ঘেরা রাস্তায়। যেদিকে তাকাই শুধুই রডোডেনড্রন। ঈশ্বর যেন নিজের সমস্ত রং, উচ্ছ্বাস, শিল্পীসত্তা উজাড় করে দিয়েছেন এই ফুলের মাঝে। ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আমাদের ট্রেকিং চলেছে, রাস্তায় শুধু আমরা দু’জন। হঠাৎ শুনতে পেলাম সাদা ফুলের গাছের মাথা থেকে খুব মৃদু শব্দ। পা টিপে টিপে গেলাম সেই গাছের তলায়, ক্যামেরার শাটার অন করা, তারপর অন্তহীন অপেক্ষা। 
     শব্দটা হয়েই চলেছে, হঠাৎ বিদ্যুৎগতিতে ছুটে পালিয়ে পাশের রডোডেনড্রন গাছের পাতার আড়ালে আশ্রয় নিল রেড পান্ডা। শাটার টেপার সময়ই পেলাম না। আমাদের নির্বাক ও স্তম্ভিত করে দিয়েছিল তার রূপ আর উজ্জ্বল লাল রং। 
রডোডেনড্রনের ঘন জঙ্গলের মধ্যেই দূর থেকে দেখতে পেয়েছিলাম একটা বাংলো। সেখানে পৌঁছেই বুঝলাম কেউ নেই। আছে শুধু এক পাহাড় নৈঃশব্দ্য ও মাতাল করা রঙের রডোডেনড্রন।
ফিরতি পথে হিলে পৌঁছে গেলাম দেড় ঘণ্টায়। চায়ের খোঁজ করতে দেখি অস্থায়ী রেস্তরাঁ জুড়ে রডোডেনড্রন সাজানো। বেরিয়ে দেখি, পাহাড়ের কোলে ঢালু উপত্যকার অর্ধেকাংশ মেঘে ঢাকা। বাকি অর্ধেক সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে। মুগ্ধ হলাম হিমালয়ের সেই রঙিন দৃশ্য দেখে। এই রূপের ব্যাপ্তি সারাজীবন মনের কোণে সেরা সঞ্চয় হয়ে থেকে গেল।
হোমাগ্নি ঘোষ 

সম্পর্কিত সংবাদ