Bartaman Logo
৩১ মে, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

আলোর জামা পরা মাছ

সমুদ্রের গভীরে বাস। প্রয়োজনে এই মাছের পেটে জ্বলে ওঠে আলো। অভিনব হ্যাচেটফিশ নিয়ে লিখেছেন রমলা মুখোপাধ্যায়।

আলোর  জামা পরা মাছ
  • ৩১ মে, ২০২৬ ০৪:০০

সমুদ্রের গভীরে বাস। প্রয়োজনে এই মাছের পেটে জ্বলে ওঠে আলো। অভিনব হ্যাচেটফিশ নিয়ে লিখেছেন রমলা মুখোপাধ্যায়।

Advertisement

হ্যাচেটফিশ। যার বৈজ্ঞানিক নাম আর্গিরোপেলেকুস অ্যাকিউলিয়াটাস। এর একটি বিশেষ প্রজাতির লেজের গোড়ায় থাকে ছোটো কাঁটা। অন্যান্য প্রজাতিগুলির মধ্যে এই কাঁটাওয়ালা প্রজাতিটিই সর্ববৃহৎ। আর এর আলোকচ্ছটা সকলকে বিস্মিত করে। কুড়ুল আকৃতির এই মাছের দৈর্ঘ্য মাত্র ২.৫-১২ সেমির মধ্যে হয়। হ্যাচেটফিশের বাসস্থান সমুদ্রের ২০০-১৫০০ মিটার গভীরে। এদের আয়ু মোটামুটি এক বছর। ছোটো জীবন। কিন্তু রূপে চমকপ্রদ!
এই মাছকে অনেকে কুড়ুল মাছও বলে। কারণ এদের দেখতে অনেকটা কুড়ুলের মতো। এদের শরীরের পেটের দিকটা খুব চওড়া আর ধারালো। আর পিঠের দিকটা সরু। এইজন্য উপর থেকে অন্য কোনো শিকারি প্রাণী তাকালে শরীরটা এত সরু লাগে যে, প্রায় অদৃশ্য মনে হয়। চ্যাপ্টা শরীরে জলের রেজিস্ট্যান্স কম, তাই কম শক্তি খরচ করেই  উপরে-নীচে ওঠানামা করতে পারে হ্যাচেটফিশ।
আলোর জামা বা কাউন্টার ইলুমিনেশন এই মাছের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। হ্যাচেটফিশ সমুদ্রের গভীরে টুইলাইট জোনে বিচরণ করে। গভীর জলস্তর ভেদ করে যেখানে সূর্যের আলো খুবই অল্প পৌঁছয়। মাছগুলির পেটের নীচে সারি সারি ছোটো বাতি থাকে। এগুলিকে বলে ফোটোফোর। প্রতিটা বাতি আলাদাভাবে জ্বালানো-নেভানো যায়। আর এদের পিঠের উপর থাকে আলো মাপার সেন্সর। জলের নীচে কতটা সূর্যালোক পৌঁচ্ছছে এর সাহায্যে হ্যাচেটফিশ বুঝতে পারে। সেই সংকেত পৌঁছয় মস্তিষ্কে। তারপর হিসাব করে পেটের বাতি ঠিক ততটাই জ্বালায়, যাতে উপরের আলোর সঙ্গে মিশে যায়। নীচ থেকে উপর দিকে তাকালে মনে হবে কিছুই নেই, শুধু জল। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, এদের শরীর থেকে নির্গত আলোর রং নীলচে-সবুজ। কারণ গভীরে ওই রংটাই পৌঁছয়। কী চমৎকার ব্যাপার-স্যাপার তাই না ছোট্ট বন্ধুরা?
শুধু আলোর জামাই নয়, এদের  টিউব চোখে ডুয়াল ক্যামেরা সিস্টেম থাকে। এই মাছের চোখ দুটো বিশাল। টেলিস্কোপের মতো এবং সবসময় উপরের দিকে তাক করা থাকে। কারণ খাবার আর বিপদ দুটোই যে ওপর থেকেই আসে। চোখের লেন্সের উপরের অংশ দূরের আবছা আলো দেখে। আর নীচের অংশ কাছের জিনিস ফোকাস করে। অর্থাৎ এদের চোখের লেন্স দুটো বাইফোকাল। এটাও এক আশ্চর্যের ব্যাপার যে, একই চোখে জুম আর ওয়াইড লেন্স। চোখ ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে এরা সামনের দিকে তাকাতে পারে। শিকার একদম কাছে এলে তখনই সামনে তাকায়।
সব হ্যাচেটফিশই প্রতিদিন একসঙ্গে ৫০০-৭০০ মিটার ওঠানামা করে।  রাতে ২০০ মিটার গভীরতায় উঠে আসে। কারণ এখানে প্ল্যাঙ্কটন ও ক্ষুদ্র চিংড়ি ভেসে বেড়ায়। এগুলি সারারাত ধরে পেট ভরে খেয়ে সূর্য উঠলে আবার নেমে যায় হ্যাচেটফিশ। কারণ উপরে আলো বেশি। অন্য শিকারি প্রাণীর হামলার আশঙ্কাও বেশি। নীচে নামার সময় শরীরের চ্যাপ্টা আকার ব্যবহার করে গ্লাইড করে নামে। সাঁতরাতে হয় না। এই অদ্ভুত মাছের খাদ্য হল কপিপড, ক্রিল, প্ল্যাঙ্কটন ইত্যাদি। মুখটা উপরের দিকে হাঁ করে। যা ভেসে আসে টুপ করে গিলে খায়।
বৈজ্ঞানিকদের গবেষণার কাজেও এই আলোর জামা পরা মাছেদের বিশেষ অবদান আছে। এই মাছের ফোটোফোরের এনার্জি-এফিশিয়েন্ট আলো থেকে বৈজ্ঞানিকরা মোবাইল স্ক্রিনের আইডিয়া নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এছাড়াও হ্যাচেটফিশ যে গভীরতায় থাকে, সেখানে জলের চাপ ১০০ গুণ বেশি। শুনলে অবাক লাগবে যে, এদের শরীরের প্রোটিন স্টাডি করে  সমুদ্রের গভীরের রোবটের যন্ত্রাংশ তৈরির চেষ্টা চলছে।
হ্যাচেটফিশ নিজে আলো তৈরি করতে পারে, তাই তারা সবসময় আলো জ্বালায়— এমনটা ভাবলেও কিন্তু ভুল হবে। দিনের বেলা গভীরে নামলে এরা বাতি নিভিয়ে দেয়। শক্তি বাঁচায়। শুধু দরকার পড়লেই আলো জ্বালায়। এদের আলো জ্বালানোর কৌশল সত্যিই আশ্চর্যের। তাই আলোর জামা পরা কুড়ুল মাছ প্রকৃতির বিরাট বিস্ময়। হ্যাচেটফিশের আলোর কোনো ছায়া পড়ে না, যাতে শত্রু প্রাণী সহজে এদের আক্রমণ করতে পারে। সত্যিই কী অদ্ভুত আলোর কারসাজি। এসবই প্রকৃতির দান। অপার রহস্যের ডালি প্রকৃতি মানুষের জন্য অপেক্ষা করছে।

সম্পর্কিত সংবাদ