‘অসম্ভব, এ হতে পারে না। তোমার এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমরা কেউ একমত নই।’ ঝড় উঠে গেল পরিবারে। এ যেন সেই উত্তমকুমার অভিনীত ‘দেয়া নেয়া’ ছবির বিখ্যাত দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি। শিল্পপতি বিকে রায়ের ছেলে প্রশান্তর গানই জীবন। কিন্তু বাবা চান ছেলে ব্যবসা সামলাক। এই নিয়ে মতবিরোধ। তারপরই প্রশান্তরূপী উত্তমকুমারের গৃহত্যাগ। উত্তম যখন বি কে রায়রূপী কমল মিত্রকে প্রশ্ন করলেন, আপনি বলতে চান আপনার শেল্টারে থেকে গান গাওয়া যাবে না? দাঁতে দাঁত চেপে জলদগম্ভীর স্বরে কমল মিত্রের উত্তর, বলতে চান না, তাই বলছি।
তবে এক্ষেত্রে প্রেক্ষাপট, পাত্রপাত্রী আলাদা। প্রথমত এখানে কেউ গৃহত্যাগ করেননি। আর গান নয়, মতবিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত। আর ছেলের বদলে মূল চরিত্র বাড়ির বউ, দুই সন্তানের জননী, বিখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার অগ্নিমিত্রা পাল। যিনি আজ রাজ্য সরকারের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী।
বাড়ির বউ, ফ্যাশন ডিজাইনার থেকে মন্ত্রী হওয়ার এই পথটি মোটেই ফুল বিছানো ছিল না। বরং ছিল কাঁটায় পরিপূর্ণ। রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা বাড়িতে বলতেই প্রচণ্ড বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে। অগ্নিমিত্রার স্বামী সহ শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা শিল্পোদ্যোগী। উচ্চবিত্ত পরিবার। সেই বাড়ির বউ রাজনীতি করবে, তাও আবার সেই দলে, যে দল রাজ্যে ক্ষমতার বৃত্ত থেকে বহু দূরে! যে কোনো ব্যবসায়ীর পক্ষে সরকারে আসীন রাজনৈতিক দলের বিরোধিতা করা আত্মহত্যার শামিল। আর তাছাড়া রাজনীতির জটিল আবর্তে ঢোকার কী দরকার বাপু! ফ্যাশন ডিজাইনিং নিয়ে তো ভালোই আছ। দেশজোড়া নাম। টলিউড, বলিউড সর্বত্র তোমার অবাধ গতি। রাজনীতি-ফাজনীতি কেন! এটাই ছিল পরিবারের অন্য সদস্যদের মনোভাব। তাঁরা কেউই মেনে নিতে পারেননি বাড়ির বউয়ের এই সিদ্ধান্ত। মেনে নিতে পারেননি অগ্নিমিত্রার বাপের বাড়ির সদস্যরাও। তাঁর জন্ম আসানসোলে। বাবা ডাক্তার। বাড়ির বাকি সদস্যরাও শিক্ষা জগতের সঙ্গে যুক্ত। তাঁরাও মেয়ের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। দুই পরিবারের বিরোধিতা সামলেই রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন অগ্নিমিত্রা। বছরটা ২০১৯। তারিখ ২৩ মার্চ।
কিন্তু নিশ্চিন্ত, নিরাপদ জীবনযাপন, ফ্যাশন ডিজাইনারের মতো ঝকমকে প্রফেশন ছেড়ে হঠাৎ রাজনীতিতে কেন?
‘মন টিকছিল না। ওই গ্ল্যামার, পার্টিসর্বস্ব জীবন একঘেয়ে লাগছিল। লোরেটো কনভেন্টে পড়াশোনা, যাদবপুর ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ ডিগ্রি, ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে ডিপ্লোমা— অর্থাৎ অ্যাকাডেমিক কেরিয়ার ছিল বেশ ঈর্ষণীয়। শ্রীদেবী তাঁকে প্রথম বলিউডের রাস্তা দেখান। তাঁর ব্যক্তিগত পোশাক বানিয়েছিলেন অগ্নিমিত্রা। তারপর ‘কোই মেরে দিল সে পুছো’, ‘ভায়া দার্জিলিং’ ইত্যাদি হিন্দি ছবির কস্টিউম ডিজাইনিং। মিঠুন, শ্রীদেবী থেকে শুরু করে কে কে মেনন, বিনয় পাঠক, এষা দেওলদের পোশাক পরিকল্পনা করেছেন তিনি। প্রাক্তন মার্কিন ফার্স্ট লেডি হিলারি ক্লিন্টনের জন্যও ব্ল্যাঙ্কেট ডিজাইন করেছিলেন অগ্নিমিত্রা। শুরু করেছিলেন নিজের ফ্যাশন লেবেল ‘ইঙ্গা’। কিন্তু মন মানে না... ।
একদিন মনে হল, গ্ল্যামারসর্বস্ব দুনিয়ার বাইরে যে মানুষগুলো খুব কষ্টে বেঁচে আছে তাঁদের জন্য কিছু করলে কেমন হয়! শুরু হল অন্য পথে চলা। কখনও পাচার হয়ে যাওয়া মেয়েদের নিয়ে ফ্যাশন শো, কখনও সুন্দরবনের অকালবিধবা মহিলাদের সেলাই শেখানোর ব্যবস্থা। নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের জন্য ‘প্রণাম’ উদ্যোগে শামিল হওয়া। এসব করতে করতেই অগ্নিমিত্রার মনে দাগ কেটেছিল একটি নাম— নরেন্দ্র মোদি। তখন তিনি গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী। তারপর ২০১৪ সালে তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হলেন। তারও পাঁচ বছর পর ২০১৯ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি যখন তৃণমূলকে কড়া টক্কর দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে সেবছরই আনুষ্ঠানিক ভাবে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন অগ্নিমিত্রা। পরের বছরই বিজেপি মহিলা মোর্চার সভাপতি পদ পান। তারপর দলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক। ২০২১ সালে আসানসোল থেকে জিতে লোকসভার সদস্য। পরে অবশ্য হারের মুখও দেখতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু এই পথে চলতে গিয়ে প্রবল ঝড়ঝঞ্ঝার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
শুধু পরিবার থেকেই নয়, রাজনৈতিক বিরোধিতার চাপও সহ্য করতে হয়েছে। পথে নেমে লড়তে হয়েছে। রাজ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর মাথায় এখনও ২৩ টা মামলা ঝুলে রয়েছে। তার মধ্যে খুনের মামলাও রয়েছে। একদফা অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিরোধী দলের নেত্রী থেকে রাজ্যের মন্ত্রী হয়েছেন। এবার তাঁকে ফের অগ্নিপরীক্ষা দিতে হবে— মন্ত্রী হিসেবে সফল হওয়ার। অগ্নিমিত্রা সেই লক্ষ্যে অবিচল। মানুষকে ভালো রাখতে হবে। তার জন্য প্রতিদিন তিনি ছুটে বেড়াচ্ছেন রাজ্য জুড়ে। রাজনীতির অগ্নিপরীক্ষায় অগ্নিমিত্রার জন্য রইল শুভেচ্ছা।