হিমাংশু সিংহ: বেশ বোঝা যাচ্ছে, বাংলার বিধানসভা নির্বাচন আর বেশি দূরে নেই। কারণে অকারণে উত্তাপ ছড়িয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা সেই কারণেই। মালদার মোথাবাড়ি থেকে শুরু করে মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ান, সামশেরগঞ্জ, সূতি হঠাৎই অশান্ত। মানুষে মানুষে অবিশ্বাসকে ঘৃণায় পরিণত করে সীমান্ত পেরিয়ে এতবড় চক্রান্ত হল, অথচ দেশের গোয়েন্দা বিভাগ আটকাতে পারল না। দিল্লির সরকারটা আছে কি শুধু ওয়াকফের মতো সংখ্যালঘু বিরোধী বিল পাশ করাতে? পুরনো প্রবাদ ‘চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে’র কায়দায় এখন মুর্শিদাবাদ কাণ্ডে ডাক পড়ছে এনআইএ’র। রাজ্যপাল ছুটে যাচ্ছেন। কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিরা আসছেন। কিন্তু যখন মানুষের প্রাণ গেল তখন কোথায় ছিলেন? তদন্ত হলে প্রথম খুঁজে বের করতে হবে বিএসএফ বাংলাদেশ থেকে আগত দুষ্কৃতীদের আটকাতে পারল না কেন? কেন রক্ত ঝরল ইতিহাসের শহরে? মানুষ বোকা নয়, তাঁরা অভিজ্ঞতা থেকে বেশ বুঝতে পারছেন, নির্বাচন এলেই যেমন এজেন্সির ধরপাকড়, তল্লাশি বাড়ে তেমনি সরকার বিরোধীরা আস্তিন গুটিয়ে গা ঘামায়। তা করতে গিয়ে বাংলার বদনাম এবং সর্বনাশ করতেও কেউ পিছপা নন।
বছর ঘুরলেই ভোট, স্বভাবতই ইস্যুরও অভাব নেই। একটা শান্ত হলেই অন্যটাকে আঁকড়ে বাঁচার চেষ্টা। খড়কুটোর মতো! মুখ্যমন্ত্রী এবং সর্বোচ্চ আদালত আশ্বস্ত করার পরও যোগ্য চাকরিহারাদের ক্রমাগত উস্কানির বন্যা। এবারের লক্ষ্য রাত দখল না ভোট দখল, কে জানে? আর জি কর কাণ্ড ঘিরে তিন-চার মাসের আন্দোলন ফ্লপ করার পরও মাঝে মাঝেই পুরনো আবেগ জাগিয়ে তুলে উত্তেজনা তৈরির প্রয়াস চলছে। এই প্ররোচনা দেওয়ার মাথা যাঁরা তাঁরা বাস্তবের মাটিতে হাঁটেন কম, চলাফেরা করেন ষোলোআনাই স্যোশাল মিডিয়ায়। আনন্দ, দুঃখ, সৌজন্য, সহমর্মিতা যখন রাজনৈতিক প্রয়োজনেই চালিত হয়, তখনই গোল বাধে। প্রশ্ন ওঠে, বিরোধীরা মন থেকে কি বঞ্চিতদের পাশে আছেন? নাকি তাঁরা আছেন শুধু নিজেদের দুর্বলতা ঢেকে এই মওকায় একটু প্রাসঙ্গিক হতে। তাই বামেরা বেমালুম সূচপুর গণহত্যা ভুলে যান। মানতেই চান না ‘চোরের ক্যাবিনেট’ বলে একদিন বামফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ছেড়েছিলেন ‘সৎ’ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। বিজেপিও ভুলে যায় ব্যাপম কেলেঙ্কারির কথা, গোধরার রক্তস্রোতের ঘটনা।
সব ভুলে ওরা আজ ঘোলা জলে ফায়দা লুটতে। বাংলাকে এলোমেলো করতে পারলেই কেল্লাফতে! মুর্শিদাবাদের অপ্রত্যাশিত হাঙ্গামা আঙুল তুলছে বহিরাগত শক্তির চক্রান্তের দিকেই। পিছনে কাদের মদত সামনে আসুক! পুলিসি ব্যর্থতাকে ছাপিয়ে গিয়েছে বিএসএফের সীমাহীন উদাসীনতা। কেন্দ্রের নয়া আইনে বর্ডারের এপারে ৫০ কিলোমিটার এলাকার শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব সীমান্তরক্ষী বাহিনীরই হাতে ন্যস্ত। বাংলাদেশিরা ঢুকে এতবড় হাঙ্গামা বাধাল আর কেন্দ্রের অতন্দ্র আধাসেনারা ঘুণাক্ষরেও জানতে পারল না? এটা কি বিশ্বাসযোগ্য!
খুব ছোটবেলা থেকেই কথাটা জানা। অর্থনীতিবিদরা যেমন দেশের আর্থিক নীতি নিয়ন্ত্রণ করেন না, তেমনি দ্রুত ছুটে চলা বিজ্ঞানের ভবিষ্যৎও নিরূপণ করেন না কোনও পদার্থবিদ বা রসায়ন শাস্ত্রের নামজাদা পণ্ডিত। প্রতিরক্ষা নীতির পিছনে থাকেন না কোনও অসমসাহসী সেনা কমান্ডারও। গণতন্ত্রে ভোটের দৌড়ে যা চিরকল্যাণকর, সভ্যতাকে নাড়া দেওয়া মহান সৃষ্টি, তার সুতো রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের হাতেই বন্দি। ৩৪ বছরের বাম আমলেও তাই ছিল, কংগ্রেস আমলেও তার অন্যথা হয়নি। দেশে গেরুয়া শাসনেও এখনও সেই ট্র্যাডিশনই চলছে। ভক্তিরসে ভাসতে কিংবা সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে বিভাজনের রশি ধরে টান মারতে গিয়ে প্রায়শই নানা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। ভোট ফুরোলেই ওদিকটায় আর কেউ নজর দেন না। রাখেন না কোনও হিসেবও। কিন্তু মধ্যিখান দিয়ে ততক্ষণে রক্তপাতে প্রাণ গিয়েছে বহু। এদিক ওদিক পড়ে মানুষের দেহ। ভস্মীভূত বাইক, পুলিসের গাড়ি, গৃহস্থের বাড়ি। আর তা দেখেই অসীম দুঃখকে বুকে চেপে একপক্ষ উল্লাসে মেতেছে, ভোট বাড়বে বলে। ভোটের স্বার্থে রাজনীতির এই ভয়ঙ্কর একপেশে আগ্রাসন চলতেই থাকে নিরন্তর। হিন্দু আর মুসলিম একই বৃন্তের দু’টি কুসুম। পাশাপাশি সহাবস্থানের মন্ত্র ছেড়ে তারা ভোট কেনাবেচার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হলে এই বাংলার কৃষ্টি সংস্কৃতি বাঁচতে পারে? বিজেপি কিন্তু সেই ভয়ঙ্কর পরিণতিটাই দেখতে চায়।
গত একমাসে দু’টি ঘটনা বাংলার পক্ষে ঠিক তেমনই। এক ধাক্কায় ২৬ হাজারের চাকরি গেলে সামাজিক পরিস্থিতি অশান্ত হতে বাধ্য। তা বলে জেলা থেকে রাজপথ, প্রধান সড়কের প্রতিটি বাঁকে চাকরিহারাদের দুঃখের সাতকাহনের বিপণনে মন দেবেন বাম-বিজেপির নেতানেত্রীরা! তাঁদের সুর এক, রং-টা শুধু আলাদা। ঠিকই তো, দশ বছর আগে চাকরি প্রার্থীদের জীবন যেখানে দাঁড়িয়েছিল তা তো বদলে গিয়েছে। অধিকাংশই সংসারী হয়েছে। বাচ্চাও এসেছে ঘরে। মা-বাবার বয়স বেড়েছে। তাঁদের জন্য চিকিৎসা বাবদ মস্ত খরচ। বিশেষত মোদি সরকারের সৌজন্যে দেশে বেকারের সংখ্যা যখন রেকর্ড ছুঁয়েছে তখন এ বিপর্যয় অপ্রত্যাশিত নয়। কিন্তু স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী যখন ওই অনিশ্চয়তা থেকে চাকরিহারাদের বাঁচাতে সুপ্রিম কোর্টের রায় ঘোষণার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বৈঠক করছেন, আশ্বস্ত করছেন, সর্বোচ্চ আদালতে রিভিউ পিটিশন দাখিলের কথা বলছেন, উল্টোদিকের বিরোধীরা তখন প্রকাশ্যে দুঃখের ভান করলেও আনন্দে মশগুল। কত ভোট আসবে রে! অন্তত ক্ষমতা দখল না হোক ২৬ হাজারের জন্য কুম্ভীরাশ্রু বর্ষণ করে যদি ‘টি-২০ নির্বাচন’-এর স্কোরটা বাড়ানো যায়! ভাবটা এমন, এবার বাগে পেয়েছি। এগারো সাল থেকে বারবার রিংয়ের বাইরে ছিটকে যাওয়ার হতাশা, প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাওয়ার অনিশ্চয়তার মধ্যে রাজ্যের বিরোধীরা এটাকে মওকা হিসেবেই দেখছেন। যদি ভেসে থাকা যায়। কিন্তু একটা জিনিস ভেবে দেখেছেন কি? আজ যেভাবে যোগ্য অযোগ্য ভাগ হচ্ছে, সিঙ্গুর কাণ্ডে তেমনি ইচ্ছুক অনিচ্ছুক দু’ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল ভুক্তভোগীরা। মায় গোটা সমাজ। কিন্তু সেদিন দেশজোড়া বিতর্কের মধ্যে জমি নেওয়ার পদ্ধতিগত ত্রুটির কথা সিপিএম স্বীকার করলেও বুদ্ধদেববাবুরা ইন্ডোর স্টেডিয়ামে বৈঠকে বসেননি। পাশে থাকার কোনও আশ্বাসও দেননি। অথচ সুপ্রিম কোর্ট ২৬ হাজারের প্যানেল পুরোটা বিসর্জন দেওয়ার পরপরই মমতা কিন্তু এক মুহূর্ত বিলম্ব না করেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর সেই অদম্য জেদের সামনেই সুপ্রিম কোর্ট ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত যোগ্যদের চাকরির ব্যবস্থা করেছে। এটা কিন্তু চাকরি খাওয়া ভট্টাচার্য কিংবা বিচারক থেকে আচমকা সংসদ সদস্য বনে যাওয়া বন্দ্যোপাধ্যায়রা সহজে মেনে নিতে পারবেন বলে মনে হয় না। তাঁরা পাল্টা কৌশলে শান দেবেনই। কারণ, ২৬ হাজারকে পথে বসিয়েই আগামী বিধানসভা ভোটে সরকার বিরোধী প্রচারের পটভূমি রচনার প্ল্যান চূড়ান্ত করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তাঁরা। সেই কারণেই দুই মহামান্য যুগপুরুষের মুখে চাকরি প্রার্থীদের ঢাকি সমেত বিসর্জনের হুঙ্কার শোনা গিয়েছে অহরহ। এখন তাঁরাই আবার মেকি কান্না জুড়ছেন। এতেও আগামী ভোটে বামেদের জামানত বাঁচবে না। আর বিজেপি এ রাজ্যে ছাগলের তৃতীয় সন্তান হয়েই দলবদলুদের হাতে বন্দি হয়ে থাকবে!
কিন্তু ওখানেই শেষ নয় চমকের। নির্বাচন যেহেতু আর এক বছরের মধ্যে এসে গিয়েছে তাই খোলা তলোয়ার আর হিন্দু-মুসলিম ভাইচারাকে নিমেষে হাঙ্গামার জাঁতাকলে ফেলে ভোটের কড়ি মেপে তোলার এই যে সুযোগ তা একটা শ্রেণির অজানা ছিল না। তাই হিসেব কষে সীমান্ত পার করে এক শ্রেণির দুষ্কৃতীদের মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ান, সামশেরগঞ্জ সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় ঢুকিয়ে বেছে বেছে বাংলাদেশের স্টাইলে হিন্দুদের উপর নির্মম অত্যাচারের ব্লু-প্রিন্ট তৈরি হয়েছে। বাড়ি থেকে বের করে কুপিয়ে খুন। দোকানে বাজারে ভাঙচুর, আগুন। রাজ্যজুড়ে একটা অশান্ত পরিবেশ তৈরির চেষ্টা। যে ঐতিহ্যের উপর বাংলার সহাবস্থানের সংস্কৃতির ধারা বহমান, তাকে ধ্বংস করার নারকীয় চক্রান্ত। সম্ভবত বাবরি সৌধ ধ্বংসের পর দুই গোষ্ঠীর এত বড় সংঘাত কিংবা খুনোখুনি বাংলা দেখেনি। বসিরহাট, ধূলাগড় থেকে শুরু করে হালের মোথাবাড়ি কিছু স্ফুলিঙ্গ দেখা গেলেও তা এত ব্যাপক আকার নেয়নি। গোধরা দাঙ্গার পর এই বাংলাই ঠাঁই দিয়েছিল কুতুবুদ্দিন আনসারিকে। সেই স্মৃতি আজও টাটকা। তবে সেদিন এই বাংলায় সাম্প্রদায়িক শক্তির এত বাড়বাড়ন্ত ছিল না। মানতেই হবে, গত দশ বছরে গোটা দেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গেও ধর্মীয় মেরুকরণের চিত্র আমূল বদলে গিয়েছে।
নতুন বাংলা বছর, ১৪৩২ সালের প্রথম রবিবার সমগ্র পাঠককুলের কাছে এক সাধারণ কলমচির একটাই প্রার্থনা, যে কোনও মূল্যে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিষ নজর থেকে সম্প্রীতির পশ্চিমবঙ্গকে রক্ষা করুন। সমস্যা হতেই পারে কিন্তু এই বাংলার মাটিতে হিন্দু মুসলিম শিখ খ্রিস্টান সবার সমান অধিকার। কিছু স্বার্থান্বেষীর কথায় কান দিয়ে সেই ঐতিহ্য ও পরম্পরাকে ধ্বংস করবেন না। গরিব খেটে খাওয়া মানুষের বাংলায় বামেরা যেমন আজ অপ্রাসঙ্গিক, তেমনি ধর্মের আড়ালে বিভাজনের বিষ ছড়ানোর বহিরাগত কারবারিদেরও রুখে দিতে হবে। বিগত একুশের ভোটে আগে অমিত শাহের ক্ষমতা দখলের ব্লু-প্রিন্টে একটাই কথা লেখা ছিল, ‘তৃণমূলকে ভাঙো’। কৌশল কাজে আসেনি। আর এবার তৃণমূল ভাঙা অসম্ভব বুঝে সম্প্রীতিকে নিলামে তুলে হাওয়া গরম করার পৈশাচিক ভাবনা। সঙ্গে বিনামূল্যে বদনাম বিতরণ। এই চক্রান্ত রুখবে গ্রামের সাধারণ মানুষ। শহরের শিক্ষিত এবং অবশ্যই সাড়ে চার কোটি মা-বোন। সবাই রুখে দাঁড়ালে, চক্রান্তকে হারিয়ে বাংলা জিতবেই।