প্রীতেশ বসু কলকাতা
প্রীতেশ বসু কলকাতা
বঞ্চনায় স্বস্তি নেই, এবার হেনস্তাও! কেন্দ্রের নির্দেশ মেনে, সেইমতো প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করার পরও চূড়ান্ত অসম্মানের মুখে পড়তে হল বাংলার অফিসারদের। আর তাও ভার্চুয়াল বৈঠকে, গোটা দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে।
এর সূত্রপাত কোথায়? মঙ্গলবার আবাস সহ বেশ কিছু গ্রামোন্নয়ন প্রকল্পে নয়া অর্থ বরাদ্দ ব্যবস্থা ‘এসএনএ-স্পর্শ’ চালু নিয়ে সব রাজ্যের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করে অর্থমন্ত্রক। এই ব্যবস্থাপনায় প্রকল্প বাবদ বরাদ্দের টাকা রাজ্যের হাতে (স্টেট নোডাল অ্যাকাউন্টে) না দিয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মাধ্যমে সরাসরি খরচ হবে। মোদি সরকারের এই শর্ত মেনে নিয়ে ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করে দিয়েছে নবান্ন। প্রধানমন্ত্রী আবাস সহ সংশ্লিষ্ট সব প্রকল্পের জন্যই রিজার্ভ ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খোলা হয়ে গিয়েছে। অথচ, আশ্চর্যজনকভাবে ২২ জুলাইয়ের বৈঠকে কেন্দ্রের শর্ত মেনে বাংলার এই কাজের তথ্য স্রেফ চেপে যাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। উল্টে কেন্দ্রের রিপোর্টে দেখানো হয়েছে, আবাস প্রকল্পের জন্য আরবিআই’তে কোনও অ্যাকাউন্টই খোলেনি পশ্চিমবঙ্গ! কেন্দ্রের এই অদ্ভুত দাবির প্রতিবাদ করতেই অর্থমন্ত্রকের অতিরিক্ত সচিব সজ্জন যাদবের নেতৃত্বাধীন আধিকারিকরা তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন বলে অভিযোগ। রীতিমতো কটূ মন্তব্য করে ঝাঁঝিয়ে তাঁরা বলেন, ‘...হোয়াট ইজ স্পেশাল ইন বেঙ্গল? হোয়াট ইজ স্পেশাল ইন ইউ?’ রাজ্যের অফিসারদের উদ্দেশে বারবার এই একই প্রশ্ন তুলে হেনস্তা করা হয় গোটা দেশের প্রতিনিধিদের সামনে। সেইসঙ্গে বাংলার উপর আরও আর্থিক সীমাবদ্ধতা আরোপের হুঁশিয়ারিও দেন তাঁরা। এখানেই শেষ নয়। আবাস প্রকল্পে পর্যায়ক্রমে প্রতিটি রাজ্যে এই ব্যবস্থাপনা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কেন্দ্র। সেই অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গকে ‘এসএনএ-স্পর্শ’ ব্যবস্থাপনায় ২০২৬ সালের মার্চ মাসে যুক্ত বা ‘অনবোর্ড’ করা হবে বলে গত ১৮-১৯ জুলাই দিল্লিতে গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের পারফরম্যান্স রিভিউ কমিটির বৈঠকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু মঙ্গলবারের বৈঠকের পর গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের পাঠানো একটি তালিকায় দেখা যাচ্ছে—পশ্চিমবঙ্গের জন্য নির্দিষ্ট হওয়া এই ‘সময়সীমা’ সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এই গোটা ঘটনায় চরম ক্ষুব্ধ রাজ্যের প্রশাসনিক মহল। কেন্দ্রের যাবতীয় শর্ত মেনে নেওয়া সত্ত্বেও সারা দেশের সামনে এই হেনস্তা মেনে নিতে নারাজ রাজ্য। ফলে কঠোর মনোভাবের সঙ্গেই বিষয়টি দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী প্রদীপ মজুমদার। তিনি বলেন, ‘রাজ্যকে বঞ্চনা করার ছুতোয় এটি নয়া সংযোজন। যা কোনওভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’
রাজনৈতিক মহলের ব্যাখ্যা, ১০০ দিনের কাজ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রেখে তৃণমূল শাসিত বাংলাকে ভালোরকম টাইট দেওয়া গিয়েছে বলে ভেবে নিয়েছিল কেন্দ্র। কিন্তু হাইকোর্টের গুঁতোয় বাংলায় ১০০ দিনের কাজ চালুর সময়সীমা ১ আগস্ট বেঁধে দেওয়া হয়েছে। তৃণমূলের দাবি, এই নির্দেশই আঁতে লেগেছে মোদি সরকারের। জুলাই মাস শেষ হতে এক সপ্তাহও বাকি নেই। অথচ, এখনও ১০০ দিনের কাজ চালু নিয়ে একটা শব্দও খরচ করেনি কেন্দ্র। উপরন্তু যে কোনও সুযোগে বাংলাকে হেনস্তার পথ বেছে নিয়েছে তারা। পাশাপাশি ভাতে মারার ফিকির খোঁজাও চলছে। কারণ, ‘এসএনএ-স্পর্শ’ ব্যবস্থাপনা চালু না হলে ভবিষ্যতে আবাস প্রকল্পের একটি টাকাও পাওয়া যাবে না। সেটা জেনেই কেন্দ্রের সব শর্ত মেনে কাজ এগচ্ছে নবান্ন। সেই সব বিস্তারিতভাবে দিল্লিকে জানানোও হয়েছে। তারপরও পশ্চিমবঙ্গের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা কেন সরিয়ে দেওয়া হল? প্রশ্ন হল, ভবিষ্যতে অন্য প্রকল্পের জন্য একই কৌশল নেওয়া হবে না তো?