সংবাদদাতা, কাটোয়া: দাঁইহাট শহরে রাসপূর্ণিমায় মা শবশিবার পুজো ঘিরে উদ্দীপনা তুঙ্গে বাসিন্দাদের।
সংবাদদাতা, কাটোয়া: দাঁইহাট শহরে রাসপূর্ণিমায় মা শবশিবার পুজো ঘিরে উদ্দীপনা তুঙ্গে বাসিন্দাদের।
প্রায় চারশো বছর আগে শবশিবা মায়ের পুজো শুরু হয়। শোনা যায়, কোচবিহারের রাজবংশী সম্প্রদায় একটা সময়ে ব্যবসার জন্য নদীয়া জেলার নবদ্বীপে আসে। সেখান থেকে রাজবংশী সম্প্রদায়ের একটা বড় অংশ ইন্দ্রানী নগর বা দাঁইহাট শহরে চলে আসে। কারণ সে সময়ে দাঁইহাট শহর ছিল বাণিজ্য কেন্দ্র। ভাগীরথীর তীরে দাঁইহাটকে বলা হত বারো হাট তেরো ঘাট। জলপথকে কেন্দ্র করে শহরে গড়ে উঠেছিল কাঁসা পিতল ব্যবসা। আর এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন নবদ্বীপ থেকে আসা রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষ। শহরের ৬ নম্বর ওয়ার্ডেই একটি বটগাছের নীচে তন্ত্র সাধক ভগীরথ সিংহ শবশিবা মায়ের সাধনা করতেন। ভগীরথ সিংহ একটি প্রস্তর যন্ত্রে সাধনা করতেন। পরবর্তীকালে শবশিবা মাতার মৃন্ময়ী মূর্তি পুজো শুরু হয় রাস পূর্ণিমায়। শবশিবা এক বিচিত্র তান্ত্রিক মূর্তি। ‘শব’ শব্দের অর্থ মৃতদেহ। শবদেহের উপর শিব, তাঁর উপরে দণ্ডায়মান মা কালী। গবেষকদের মতে, এটি নাকি কালীর বিপরীত রতি বা সঙ্গমের রূপ। কালিকাপুরাণ অনুসারে প্রেতবৎ শিবের সঙ্গে কালী রমণ করেছিলেন।
দাঁইহাটে শবশিবার কাঠামো পুজো হয় ভাতৃদ্বিতীয়ার দিনে। প্রতি পূর্ণিমায় দেবীর বিশেষ পুজো হলেও রাসপূর্ণিমায় বাৎসরিক পুজো হয়। দাঁইহাট ছাড়াও মাটিয়ারি এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামের অসংখ্য মানুষ আসেন পুজোতে। ভিনরাজ্য থেকেও মানুষ আসেন। দাঁইহাট শহরের ক্ষেত্র সমীক্ষক অশেষ কয়াল বলেন, সেই সময় রাজবংশী সম্প্রদায়রা এই পাড়ায় বাস করতেন৷ তখন পাড়ার নাম ছিল রাজবংশী পাড়া। পরবর্তীকালে পাড়ার নামই হয়ে যায় শবশিবাতলা পাড়া। এখন রাস পূর্ণিমায় শহরের বাসিন্দাদের আবেগ মা শবশিবা।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু দাঁইহাটের উপর দিয়ে কাটোয়ায় সন্ন্যাস গ্রহণ করতে গিয়েছিলেন। তারপরই শাক্ত ও বৈষ্ণব ধর্মের মিলনক্ষেত্র হয়ে ওঠে দাঁইহাট। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগে ওলন্দাজরা এসেছিল দাঁইহাটে। এখানে বর্গি হামলার কথাও জানা যায়। তখন এই অঞ্চলের নাম ছিল ইন্দ্রাণী পরগনা। ইন্দ্রাণী পরগনা ছিল কাটোয়া গঙ্গা তীরবর্তী অঞ্চল থেকে অগ্রদ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত। তখন ছোট ছোট গ্রাম নিয়ে ছিল এই ইন্দ্রাণী নগর। দাঁইহাটের রাস আসলে ছিল পট পূর্ণিমা। মানে পটে ছবি এঁকে পুজো হতো। পরের দিকে বানানো হতো দেবীমূর্তি। মা শবশিবা, মা বড় কালী, উগ্রচণ্ডী এই সব জাগ্রত দেবীর আরাধনা হতো। পাশাপাশি কৃষ্ণকালী, রাইরাজা, বকাসুর বধ, মাতঙ্গীমাতা প্রভৃতি পুজো শুরু হয় শাক্ত বৈষ্ণবের মিলনক্ষেত্র দাঁইহাটে।
দাঁইহাটের শবশিবা মাতা।-নিজস্ব চিত্র