দীপন ঘোষাল, রানাঘাট: ভূগর্ভ থেকে মুক্তি পেতে চাইছে শত শত বছরের চাপা পড়ে থাকা ইতিহাস। খোঁড়াখুঁড়ি করলেই বেরিয়ে আসছে আশ্চর্য দর্শন মাটির পাত্র, টেরাকোটার মূর্তি। নদীয়ার গাংনাপুর এলাকার সেই গড় দেবগ্রাম প্রাচীন ইতিহাসের খনি! যেখানে আদি মধ্যযুগের উন্নত নগর সভ্যতার উপস্থিতির প্রবল সম্ভবনা রয়েছে বলে মনে করছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ।
রানাঘাট শহর থেকে মেরেকেটে ১৬ কিলোমিটার দূরে গাংনাপুরের দেবগ্রাম। জঙ্গলঘেরা ভূখণ্ডের নীচেই হয়তো লুকিয়ে রয়েছে আদি মধ্যযুগীয় বঙ্গের সমৃদ্ধশালী ইতিহাস। যা এতদিন সুপরিকল্পিত ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের অভাবে অনালোচিতই থেকে গিয়েছে। অথচ বছরের পর বছর ধরে সেখানকার মাটির তলা থেকে উঠে আসে বিভিন্ন ধরনের প্রত্নসামগ্রী। যার সঙ্গে সপ্তম থেকে ত্রয়োদশ শতকের সভ্যতার প্রত্ন সামগ্রীর বিস্তর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। স্থানীয় মানুষ অঞ্চলটির নাম দিয়েছেন, দেবল রাজার গড় বা দেবলগড়। এতদিন কার্যত একার উদ্যোগেই প্রত্নক্ষেত্রটি নিয়ে কাজ করেছেন ভূ-প্রত্ন গবেষক তথা ভূগোলের অধ্যাপক ডঃ বিশ্বজিৎ রায়। পাল যুগের একটি প্রভাবশালী প্রাদেশিক রাজধানী ছিল এই দেবগ্রাম বলেই তাঁর অনুমান। এবার ব্যক্তি উদ্যোগের বৃত্ত পেরিয়ে দেবগ্রামের প্রত্নক্ষেত্র আগ্রহী করে তুলেছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগকে। গত এক সপ্তাহ ধরে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের একটি বিশেষ দল সরেজমিনে অনুসন্ধান এবং পর্যবেক্ষণ চালায়। যার নেতৃত্বে ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ডিপার্টমেন্ট হেড ডঃ রজত সান্যাল নিজে। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তাঁরা সংগ্রহ করে নিয়ে যান পরবর্তী গবেষণার জন্য। জানা গিয়েছে, কয়েকদিনের অনুসন্ধানে আদি মধ্যযুগের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক সামগ্রী মিলেছে। বিষয়টি নিয়ে ডঃ রজত সান্যাল বলেন, আমরা বেশ কয়েকদিন অনুসন্ধান এবং পর্যবেক্ষণ চালিয়েছি। তাতে এতটুকুই বলা যায়, অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি প্রত্নক্ষেত্র এই দেবগ্রাম। সপ্তম থেকে ত্রয়োদশ শতক সময়কালীন উন্নত নাগরিক জীবনের সাক্ষ্য এখানে রয়েছে। বাকি আমরা পরবর্তী বিবেচনার মধ্যে রাখছি।
কী সম্ভাবনা রয়েছে? ভূ-প্রত্নতত্বের গবেষক গবেষক ডঃ বিশ্বজিৎ রায় বলেন, পাল রাজা রামপাল কৈবর্ত বিদ্রোহ দমনের জন্য যে যে প্রাদেশিক রাজাদের সাহায্য নিয়েছিলেন শক্তি জোট গঠনের জন্য, তার মধ্যে একজন দেবগ্রামের রাজা বিক্রম। অর্থাৎ পালযুগেই এই অঞ্চল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাদেশিক রাজধানী ছিল তা বলাই যায়। হয়তো তার বহু শতাব্দী আগেই এখানকার সভ্যতা পল্লবীত হয়েছিল। শুধু তাই নয়, আমি এবং আমার সহকর্মীরা এখান থেকে এমন কিছু প্রত্নসামগ্রী পেয়েছি যা গুপ্ত পূর্ববর্তী যুগের। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ডঃ রজত সান্যালের নেতৃত্বে যে অনুসন্ধান চলেছে তার ফলে হয়তো আরও অনেক তথ্য উঠে আসবে। -নিজস্ব চিত্র