নিজস্ব প্রতিনিধি, ঝাড়গ্ৰাম: জঙ্গলমহলের বৃহত্তম উৎসব আভড়াপুণেই। লক্ষ্মীর মতো স্ত্রী ও কার্তিকের মতো স্বামী পেতে কোজাগরী পূর্ণিমায় ব্রত রাখা হয়। আভড়াপুণেই বা আইবুড়া পূর্ণিমা জীবনসঙ্গী খুঁজে নেওয়ার উৎসব। পূর্ণিমার চাঁদ ওঠার পর ব্রত শেষ হয়। সুবর্ণরেখা নদীর দুই পারের জনপদ ও জঙ্গল লাগোয়া গ্ৰামের মানুষ ধুমধাম করে এই উৎসব পালন করেন।
জঙ্গলমহলের বিস্তীর্ণ এলাকার অবিবাহিত ছেলেমেয়েদের জন্য আভড়াপুণেই ব্রত পালন করা হয়। ওড়িশার ‘কুমার পূর্ণিমা’-র সঙ্গে আভড়াপুণেই উৎসবের মিল রয়েছে। সুবর্ণরেখা নদীর দুই পারের গ্ৰামে গ্ৰামে ধুমধাম করে এই উৎসব পালন করা হয়। কোজাগরী পূর্ণিমার দিন অবিবাহিত ছেলে ও মেয়েরা স্নান করে নতুন পোশাক পরেন। কোমরে ঘুনশি পরানো হয়। বাড়ির বয়স্ক মহিলারা অবিবাহিত ছেলেমেয়েদের কপালে চন্দনের টিপ পরিয়ে দিয়ে বলেন, ‘পো মেনেকার নিশ বাড়ু’, অর্থাৎ ছেলেদের গোঁফ বাড়ুক। ‘ঝি মেনেকার আইস বাড়ু’, অর্থাৎ মেয়েদের আয়ু বাড়ুক। একই সঙ্গে বলা বলা হয়, ছেলে যদি টাকা হয় মেয়েরাও কড়ির সমান। সন্তানরা যাতে পছন্দমতো জীবনসঙ্গী বা জীবনসঙ্গিনী পায় তার প্রার্থনা করা হয়। চাঁদ ওঠার পর ব্রত পালন শেষ হয়। ব্রত পালনকারীরা এদিন পোড়া জাতীয় খাবার বিশেষ করে মুড়ি খান না। বাড়িতে পায়েস, পিঠে, লুচি, সুজি, ক্ষীর সহ নানারকম নিরামিষ খাবার রান্না হয়। উৎসব পালনের প্রস্তুতি একদিন আগে থেকেই শুরু হয়ে যায়। ঝাড়গ্রাম তথা জঙ্গলমহলের মানুষের কাছে ছেলে ও মেয়ে সমান। আভড়াপুণেই পালনের মধ্যে দিয়ে বাবা-মায়েরা সন্তানের সমানাধিকারের বার্তা দেন। অরণ্য অধ্যুষিত জঙ্গলমহলের আদিবাসী ও জনজাতি পরিবারে ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে কোনও ফারাক করা হয় না। আঞ্চলিক গবেষকদের মতে, যার প্রভাব আভড়াপুণেই ব্রত পালনের মধ্যে দিয়ে ফুটে উঠেছে। গোপীবল্লভপুর এলাকার বাসিন্দা অনিমেষ সিংহ বলেন, সুবর্ণরেখা নদী অববাহিকার বাসিন্দাদের কাছে, আভড়াপুণেই এক বৃহৎ উৎসব। কোজাগরী পূর্ণিমার দিনে ঘরে ঘরে এই উৎসব পালন করা হয়। সাংস্কৃতিক এই ঐতিহ্য জঙ্গলমহলের মানুষ প্রাচীনকাল থেকে পালন করে চলেছে। গোপীবল্লভপুর-১ ব্লকের বাসিন্দা গোপাল মাহাত বলেন, কোজাগরী পূর্ণিমার দিন বাড়ির মহিলারা সুবর্ণরেখা নদীতে স্নান করে প্রথমে মন্দিরে পুজো দেন। বাড়ির উঠোনে হরিতলার সামনে প্রথা মেনে ব্রত পালন করা হয়। ব্রত সম্পন্ন হলে নিরামিষ খাবার খেতে হয়। আকাশের গোলাকার চাঁদ উঠলে ব্রত ভাঙা হয়। প্রার্থনা করা হয় বাড়ির ছেলেমেয়েরা যাতে তাদের পছন্দমতো জীবনসঙ্গী খুঁজে পায়। আঞ্চলিক গবেষক মধুপ দে বলেন, জঙ্গলমহলের মানুষের নিজস্ব এক সংস্কৃতি আছে। পুত্র ও কন্যাকে এখানে সমান চোখে দেখা হয়। আভড়াপুণেই উৎসবে সেই ছবি ফুটে ওঠে।