সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: ঝোড়ো হাওয়ায় তখন দাঁড়িয়ে থাকা দায়। উপর থেকে নীচের দিকে তাকালে সবকিছু যেন ছোট দ্বীপের মতো মনে হচ্ছে। চারপাশে বরফ আর বরফ। একটু ভুলচুক হলেই মৃত্যু নিশ্চিত। কিছুক্ষণ আগেই মৃতদেহ টপকে চূড়ায় আসতে হয়েছে। পদে পদে প্রতিবন্ধকতা। এত কিছুর পরও মনে ভয় নেই। এই লড়াই জিততেই হবে। এই অঙ্গীকার নিয়ে যে পথ চলা তিনি শুরু করেছিলেন, তাঁকে হারাবে এমন সাধ্যি কার? লড়াই জিতেছেন বর্ধমানের সৌমেন সরকার। এভারেস্টের চূড়ায় দেশের পতাকা তুলে তবেই তিনি বাড়ি ফিরেছেন। ঘরে ফেরার আনন্দে এখন তিনি আত্মহারা। রবিবার বর্ধমান স্টেশনে নেমে তিনি আবেগতাড়িত হয়ে বলেন, এই লড়াই সহজ ছিল না। আর্থিক প্রতিকূলতা ছিল। কয়েকজন বন্ধু সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। বাকি টাকা জোগাড় করতে লোন নিতে হয়েছে। স্ত্রীর শরীরও তখন ভালো ছিল না। সব প্রতিবন্ধকতা এড়িয়ে মনের জোরে এভারেস্ট জয় করতে এগিয়ে গিয়েছিলাম।
দীর্ঘপথ অতিক্রম করে এলেও তাঁর মধ্যে ক্লান্তি নেয়। আবার নতুন এক লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এদিন বিকেলে ফোনেই তিনি শোনাচ্ছিলেন এভারেস্ট জয়ের অভিজ্ঞতা। তিনি বলেন, দিনের দিকে তেমন অভিযান হতো না। রাত ৮টা থেকে পথচলা শুরু হতো। অন্ধকারে আলোর সন্ধান পেতে মাথায় টর্চ বাঁধতে হয়েছিল। সেই আলোতেই এগিয়ে যেতাম। পথ চলতে চলতে অনেকের সঙ্গেই দেখা হয়েছে। তাঁরা কেউ আমাদের দেশের, আবার কেউ বিদেশ থেকে এসেছেন। কিছুটা পথ যাওয়ার পর ‘ব্যালকনি’ বলে একটা জায়গা রয়েছে। সেখানে মানুষের ‘ট্রাফিক জ্যাম’ লেগেই থাকে। পরপর পর্বত আরোহীরা আসছেন। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিচ্ছেন, আবার পথ চলা শুরু করছেন। এরপর এল হিলারি স্টেপ। সেখানে পা ফেলতে গিয়ে দেখি একটি মৃতদেহ পড়ে রয়েছে। গাইড বললেন, গত বছর এক বিদেশির অভিযান বিফলে গিয়েছিল। তিনি বরফের মধ্যেই চিরশায়িত রয়ে গিয়েছেন। মৃতদেহ টপকেই চূড়ার দিকে এগিয়ে গেলাম। তিনি আরও বলেন, চূড়ায় ওঠার পর মন থেকে সব ভয় উধাও হয়ে গেল। এখানে ওঠা বহুদিনের স্বপ্ন ছিল। স্বপ্নপূরণ হলে কার না ভালো লাগে। তবে চূড়ায় ওঠার পাশাপাশি নামার পথও বন্ধুর। নামতে গিয়েও বিপদ হতে পারে। অনেকেই মারা গিয়েছেন।
এদিন বিকেলে সৌমনবাবু ঘরে ফিরতেই তাঁর আপনজনরা বরণ করে নেন। তাঁকে সংবর্ধনাও দেওয়া হয়। অনেক আগে থেকেই বন্ধুরা তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ট্রেন থেকে নেমেই তাঁদের দেখে এগিয়ে আসেন সৌমেনবাবু। তিনি বলেন, এভারেস্টের চূড়ায় দাঁড়িয়ে এই মুখগুলির কথাই বারবার মনে পড়ছিল। এরপরের অভিযানেও এভাবেই তাঁদের ভালোবাসা, সহযোগিতা পাব। নিজস্ব চিত্র