Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

পুরুলিয়ায় সোশ্যাল মিডিয়ার যুগেও ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে প্রচার করেন প্রৌঢ় তরণী কালিন্দী

‘স্বাস্থ্য পরীক্ষায় বিশেষ শিবির হবে, উপস্থিত থাকবেন একাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।’ কিংবা,‘আসন্ন রাস উৎসবকে কেন্দ্র করে সন্ধ্যায় বৈঠক বসবে’— আজও গ্রামের পথে পথে ঘুরে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে এধরনের প্রচার করেন প্রৌঢ় তরণী কালিন্দী।

পুরুলিয়ায় সোশ্যাল মিডিয়ার যুগেও ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে প্রচার করেন প্রৌঢ় তরণী কালিন্দী
  • ৫ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া: ‘স্বাস্থ্য পরীক্ষায় বিশেষ শিবির হবে, উপস্থিত থাকবেন একাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।’ কিংবা,‘আসন্ন রাস উৎসবকে কেন্দ্র করে সন্ধ্যায় বৈঠক বসবে’— আজও গ্রামের পথে পথে ঘুরে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে এধরনের প্রচার করেন প্রৌঢ় তরণী কালিন্দী। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাদ্যযন্ত্রে কিছুটা বদল হলেও বংশ পরম্পরায় রাজ আমলের রেওয়াজ অক্ষুণ্ণ রেখেছেন তরণীবাবু। তাঁর ঢ্যাঁড়া পেটানোর শব্দে আজও গ্রামাঞ্চলের প্রতিটা মোড়ে ভিড় জমে। আট থেকে আশি সকলেই কান পাতেন তাঁর ঘোষণায়। তরণীবাবু বলেন, বংশ পরম্পরায় এই পেশায় জড়িয়ে রয়েছি। ১৫ বছর বয়সে কাকার কাছে হাতেখড়ি। তারপর থেকে পথচলা শুরু। বেগুনকোদর এলাকার প্রতিটি প্রান্তে যে বার্তা পৌঁছে দিতে আজও আমার ডাক পড়ে। যতদিন সামর্থ্য রয়েছে ততদিন ঢ্যাঁড়া পিটিয়েই সকলের দুয়ারে যে কোনও বিজ্ঞপ্তি পৌঁছে দেব।

Advertisement

একটা সময় রাজা-বাদশাদের ফরমান প্রজাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে একমাত্র ভরসা ছিল ঢ্যাঁড়া। কাঁধে ঢ্যাঁড়া ঝুলিয়ে ঘোষক গ্রামের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ছুটে বেড়াতেন।সেইসঙ্গে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে রাজা-বাদশার ফরমান গ্রামবাসীদের পড়ে শোনাতেন। তবে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজপাটের অবসান ঘটেছে। হাইটেক যুগে সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনও ফরমান ও বিজ্ঞপ্তি জনমানসে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে একাধিক মাধ্যম ভরসাযোগ্য হয়ে উঠেছে। যার মধ্যে সোশ্যাল মাধ্যম অনন্য ভূমিকা পালন করে। তবে এই হাইটেক যুগেও ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে যে কোনও ফরমান ও বিজ্ঞপ্তি জনমানসে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রচলন রয়েছে পুরুলিয়া জেলার ঝালদা-২ ব্লকের বেগুনকোদর গ্রামে। 
স্থানীয় এলাকার বাসিন্দা তরণীবাবু আজও খালি পায়ে ঘুরে বেড়ান। পরণে সাদা ধুতি আর ফুল হাতা সাদা জামা। গলায় ঝুলে থাকে অত্যাধুনিক বাদ্যযন্ত্র 'ড্রাম'। তাঁর এক হাতে থাকে কাঠি অন্য হাতে ঘোষণাপত্র। নির্দিষ্ট সংস্থা কিংবা উদ্যোক্তাদের তরফে বাতলে দেওয়া তথ্য সেই ঘোষণাপত্রে লেখা থাকে। প্রথমেই তিনি গ্রামের প্রতিটা মোড়ে দাঁড়িয়ে একনাগাড়ে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে লোক জড়ো করেন। তারপরই সকলের সামনে ঘোষণাপত্র পাঠ করেন তারস্বরে। এভাবেই সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যায়। চলে ঢ্যাঁড়া পেটানোর কাজ। দিনশেষে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা আয় হয়।
রাজা-বাদশাদের আমলের এই রেওয়াজ বজায় রাখার ক্ষেত্রে তরণীবাবুর পাশাপাশি স্থানীয় একাধিক ক্লাব ও কমিটিও যথেষ্টই উদ্যোগী। স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা সমাজ মাধ্যমে যে কোনও বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিবর্তে তা লিখিতভাবে তরণীবাবুর হাতে তুলে দেন। বেগুনকোদর সর্বজনীন রাস মহোৎসব কমিটির কোষাধ্যক্ষ সুরজ সিংহ বলেন, একসময়ে এখানে রাজাদের বাস ছিল। রাজ নিয়মেই এলাকায় সব কাজ হতো। বর্তমানে রাজপাট নেই, কিন্তু রাজ আমলের সেই রেওয়াজে আমরা আজও বিশ্বাসী। তাই যে কোনও বিষয় জনসমক্ষে তুলে ধরতে হলে সোশ্যাল মাধ্যমের পরিবর্তে আমরা ঢ্যাঁড়া পেটানোর ওপরই ভরসা রাখি। স্থানীয় শুভ্র পান বলেন, পুরনো রীতিতেই আমরা বিশ্বাসী। সেই রেওয়াজ এখনও আমাদের গ্রামে অক্ষুণ্ণ রয়েছে। 
 ঢ্যাঁড়া পেটাচ্ছেন তরণী কালিন্দী। -নিজস্ব চিত্র

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ