সংবাদদাতা, কৃষ্ণনগর: ছোটবেলায় বাবা-মায়ের হাত ধরে মাটির কাজ শেখা। তখন হয়তো ভাবেননি, জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও সেই মাটিই হয়ে উঠবে সংসার চালানোর অন্যতম ভরসা। স্বামীর মৃত্যুর পর যখন সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে কাঁধে, তখন আর পিছনে ফিরে তাকাননি। ছোটবেলায় শেখা সেই কাজকেই পেশা হিসেবে আঁকড়ে ধরেছিলেন। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মাটির হাঁড়ি তৈরি করে সংসার সামলানোর পাশাপাশি ছেলে-মেয়েদের মানুষ করেছেন কৃষ্ণনগরের সতীশ নগরের ৭৫ বছরের আরতি পাল। বয়সের ভারে শরীর আগের মতো সঙ্গ না দিলেও আজও থামেনি তাঁর মাটির কাজ।
আরতি দেবীর কথায়, ‘‘প্রায় ১০ বছর বয়স থেকেই মাটির কাজ শিখেছি। বাবা-মা মাটির কাজ করতেন। তাঁদের কাছ থেকেই কাজ শেখা। বিয়ের পর সেই ভাবে কাজকে পেশা হিসেবে নিইনি। কিন্তু স্বামী মারা যাওয়ার পর সংসার চালাব কী করে, সেই চিন্তা থেকেই আবার মাটির কাজ শুরু করি। তারপর থেকে এই কাজই আমার ভরসা।’’
দীর্ঘ জীবনের স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলেন, ‘‘ছোটবেলা থেকেই মাটি নিয়ে পড়ে আছি। দেখতে দেখতে জীবনের এতগুলো বছর কেটে গেল। এখনও মাটির হাড়ি বানিয়ে চলেছি। এই কাজ করেই ছেলে-মেয়েদের মানুষ করেছি।’’ তাঁর কাছে মাটির কাজ শুধু উপার্জনের মাধ্যম নয়, জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা এক দীর্ঘ অভ্যাস এবং ভালোবাসা।
মাটির হাড়ি তৈরির প্রক্রিয়াটিও যথেষ্ট শ্রমসাধ্য। প্রথমে মাটির দলা নিয়ে গোল করে একটি চাকতির সাহায্যে রুটির মতো আকার দিতে হয়। এরপর নির্দিষ্ট ডাইসে দিয়ে হাড়ির পিছনের অর্ধেক অংশ তৈরি করা হয়। একইভাবে হাড়ির মুখের ছাঁচে সামনের অংশ তৈরি করতে হয়। পরে দুটি অংশ জুড়ে নিখুঁতভাবে তৈরি হয় মাটির হাড়ি। এরপর সেই কাঁচা হাড়ি রোদে শুকিয়ে নেওয়া হয়। যাঁরা হাড়ি আগুনে পুড়িয়ে তৈরি করেন, তাঁরা আরতি দেবীর কাছ থেকে কাঁচা হাড়ি কিনে নিয়ে যান। পরে সেগুলি পোড়ানোর পর বাজারে ও বিভিন্ন দোকানে বিক্রি করা হয়।
তবে বয়সের ভারে এখন আর আগের মতো দীর্ঘ সময় কাজ করা সম্ভব হয় না। তাই ধীরে ধীরে, অল্প অল্প করে হাড়ি তৈরি করেন তিনি। আরতি দেবী বলেন, ‘‘এখন আর সেই শক্তি-সামর্থ্য নেই। তাই যতটা পারি, অল্প অল্প করে বানাই। এতে কিছু টাকা আয় হয়। কাজ করতে পারছি, সেটাই ভালো লাগে।’’
সংসারের কঠিন সময়ে যে মাটি তাঁকে আশ্রয় দিয়েছিল, ৭৫ বছর বয়সেও সেই মাটির সঙ্গেই তাঁর সম্পর্ক অটুট। স্বামীর মৃত্যুর পর জীবনের অনিশ্চয়তার মধ্যে ছোটবেলায় শেখা কাজকেই আঁকড়ে ধরে নিজের এবং পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। সময় বদলেছে, শরীরের শক্তি কমেছে, কিন্তু মাটির প্রতি ভালোবাসা আর কাজের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা আজও একই রয়ে গিয়েছে। তাঁর হাতে তৈরি প্রতিটি মাটির হাঁড়ি যেন শুধু একটি সামগ্রী নয়, বরং সংগ্রাম, আত্মনির্ভরতা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা মৃৎশিল্পের এক জীবন্ত গল্প।