অভিষেক পাল, বহরমপুর: ক’দিন আগেও গমগম করত শিবুর মিষ্টি দোকান। দল বেঁধে কচুরি, সিঙাড়া খেতেন স্থানীয়রা। বেশ সাজানো-গোছানো দোকান। কাচের শোকেসে থরে থরে সাজানো থাকত হরেক মিষ্টি। চোখ ধাঁধানো এলইডি লাগানো ছিল দোকানের ভিতর-বাইরে। সে সব আজ শুধুই স্মৃতি। তিনটি দেওয়াল ছাড়া আর কিছুই নেই। কিন্তু, শিবু কি পারবেন সেই স্মৃতি পুনরুদ্ধার করতে? চেষ্টা করছেন ধুলিয়ানের দীর্ঘ বছরের এই মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী। লক্ষ্মীবারে দোকানের পুনর্নির্মাণের কাজ করতে করতে বিড় বিড় করে শিবু বলছিলেন, ‘কারা ভাঙল, কেন ভাঙল, কিসের স্বার্থে এমন তাণ্ডব? কিছুই বুঝলাম না! তবে, আমাদের তো ঘুরে দাঁড়াতেই হবে। আবার সবকিছু নতুন করে শুরু করতে হবে। ধুলিয়ান এখনও সম্প্রীতির শহর, এটাই আমাদের বড় ভরসা।’
ধুলিয়ান শহরে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের একজন প্রতিনিধি মাত্র। তাঁর মতো অনেক দোকানদার, ব্যবসায়ী এখন ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে হাহাকার করছেন। সবকিছু কবে ঠিকঠাক হবে, স্বাভাবিক হবে। রুজিরুটিতে টান পড়েছে সবার। সেটাই স্বাভাবিক। এক সপ্তাহ হতে চলল এখনও শহরকে পূর্বের অবস্থানে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। জীবন যাত্রা ছন্দে ফিরলেও ব্যবসাপত্র জমছে না। দোকানপাট না থাকলে জমবেই বা কী করে? কপালে চিন্তার ভাঁজ ব্যবসায়ী মহলের। সবার দাবি, ধুলিয়ানের দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া অর্থনীতি ফেরাতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিক প্রশাসন।
শুধু দাবি তুলেই হাত গুটিয়ে বসে নেই ব্যবসায়ীরা। পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হতেই জীবনের চাকা ঘোরাতে মরিয়া চেষ্টা সকলের। কেউ ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছেন। কেউ বা সরিয়ে ফেলেছেন। কেউ কেউ কাঠের ফার্নিচার বানাচ্ছেন। নতুন শাটারও লাগাচ্ছেন। কোথাও চলছে ক্ষতের যন্ত্রণা ভুলতে ও ভোলাতে রঙের কাজ। কিন্তু, ঘুরে দাঁড়ানোর এই চেষ্টায় বাধ সাধছে অর্থ। দোকান তো আর পুনর্নির্মাণ করলেই ব্যবসা হবে না। নতুন করে মালপত্রও কিনতে হবে। ব্যবসায়ীরা বলছিলেন, ইতিমধ্যেই স্বল্প সঞ্চয় ফুরিয়ে গিয়েছে। ধার-দেনা করতে হচ্ছে আত্মীয়দের কাছ থেকে। এবার মালপত্র দোকানে ঢোকাবো কী করে সেটা ভেবে পাচ্ছি না। ধুলিয়ানের আর এক মিষ্টির দোকানের মালিকের কথায়, ‘দোকান মেরামত করে সবকিছু নতুনভাবে শুরু করতে প্রায় তিন চার লক্ষ টাকা খরচ হবে। প্রশাসন যদি সাহায্য করে তাহলে খুব উপকার হয়।’
এদিন চোয়াল শক্ত করে নিজের দোকানকে নতুন করে গড়ছিলেন রামকৃষ্ণ সিং চুন্নুর। তিনি বলছিলেন, ‘অনেকেই ভাবছে, এই ঘটনার পর আমাদের হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি নষ্ট হবে। সেটা ভুল ধারণা। আমরা আবার পুরনো জায়গায় ফিরব।’ জঙ্গিপুরের তৃণমূল সাংসদ খলিলুর রহমানও বলছিলেন, আমার মনে হয়, এটা একটা পরিকল্পনামাফিক ষড়যন্ত্র। ধুলিয়ানে আমরা যে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ব নিয়ে চলছিলাম, সেটাই ফিরিয়ে আনতে হবে। উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এটা শুনতেও ভালো লাগে না, দেখতেও ভালো লাগেনা। খুবই যন্ত্রণাদায়ক। রাজনীতির ঊর্ধ্বে গিয়ে মানুষ হিসেবে আসুন আমরা একে অপরের পাশে দাঁড়াই।’ ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আপনাদের মধ্যে এতদিন যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল, সেটা যেন আগামীদিনেও অটুট থাকে। মনে রাখবেন দিনের শেষে ভালোবাসারই জয় হয়। হিংসার নয়। সবাইকে বলব, আপনারা নির্ভয়ে দোকানপাট খুলুন।’
জঙ্গিপুরের এসডিও একাম জে সিং বলেন, ‘সামশেরগঞ্জের বেতবোনা, দাসপাড়া, ঘোষপাড়া, জাফরাবাদসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ সামগ্রী দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসীর পাশে প্রশাসন সর্বতোভাবে থাকার চেষ্টা করছে। যাদের দোকানে ভাঙচুর হয়েছে, তাদের পাশেও দাঁড়ানো হবে।’