তামিম ইসলাম, ডোমকল: সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে। নাকে-মুখে গামছা বেঁধে শাঁখ কেটে চলেছেন কারিগররা। বছর পঞ্চাশের এক অভিজ্ঞ কারিগরের হাতের ছোঁয়ায় শাঁখার গায়ে ফুটে উঠছে বাহারি নকশা। চারদিকে ম ম করছে সামুদ্রিক শঙ্খের ঝাঁঝালো গন্ধ। কিছুদিন বাদেই দুর্গাপুজো। আর তার আগেই পুজোর বাজার ধরতে এখন থেকেই ব্যস্ততা তুঙ্গে ডোমকলের বাজিতপুর, লক্ষীনাথপুর, জিতপুরের শাঁখা-শঙ্খের পাড়াগুলিতে। সম্প্রীতির মেলবন্ধনে তৈরি হচ্ছে উমাকে সাজানোর শাঁখা। তৈরি হচ্ছে ঠাকুরঘর, মন্দির কিংবা প্যাণ্ডেলে বাজানোর শঙ্খ। ধর্মমত নির্বিশেষ হাত ধরাধরি কাজ করছেন সকলেই। পুজোয় ব্যবসা বাড়ার আশায় বুক বাঁধছেন ডোমকলের শাঁখারিরা।
‘অশান্তি-বিস্ফোরণের মুলুক’ হিসেবে বদনাম রয়েছে ডোমকলের। তবে, শাঁখারি অধ্যুষিত পাড়াগুলিতে বছরের সারা সময় থাকে অন্য ছবি। পুজো এলে সেই ছবি বদলে যায় চূড়ান্ত ব্যবস্থায়। বাজিতপুর, লক্ষ্মীনাথপুর ও জিতপুরে বসবাসকারী শাঁখারিদের হাত ধরেই এলাকায় গড়ে উঠেছে শতাব্দী প্রাচীন শাঁখা-শঙ্খ শিল্প। বর্তমানে ওই এলাকার বহু পরিবারই এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁদের হাতের কাজেই টিকে রয়েছে শিল্প। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, ডোমকলের তৈরি শাঁখা-শঙ্খ এখন শুধু জেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি দেশের একাধিক জায়গাতেও যায়। এমনকী নেপাল ও বাংলাদেশের বিভিন্ন ঠাকুরঘরেও পৌঁছয় ডোমকলের শঙ্খ। সময়ের সঙ্গে এই পেশায় নতুন অনেক পরিবারও যুক্ত হয়েছে।
তবে ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, গত কয়েক বছরে নানা কারণে ব্যবসায় কিছুটা মন্দা দেখা দিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, কম দামে নিম্নমানের সামগ্রী বাজারে আসায় এলাকার তৈরি শাঁখা-শঙ্খের বাজারে প্রভাব পড়ছে। অসৎ ব্যবসায়ীদের একাংশ গুণমানের সঙ্গে আপস করে কম দামে সামগ্রী বিক্রি করায় সামগ্রিকভাবে এলাকার শিল্পের নামও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে দাবি তাঁদের। সামনে দুর্গাপুজো। আর ঘুরে দাঁড়াতে পুজোর মরশুমই এখন শাঁখারি পরিবারগুলির ভরসা। পুজোর সময়ে মণ্ডপ মণ্ডপ মুখরিত হয় শঙ্খের ধ্বনিতে। সঙ্গে ঘরে ঘরে বধূর হাতে শোভা পায় নতুন নতুন শাঁখার জোড়া। এবারও সামনে পুজো। হাতে আর মাত্র কয়েকটা সপ্তাহ। তাই এখন থেকেই পুজোয় লাভের আশায় কোমর বেঁধে নাওয়া খাওয়া ভুলে শাঁখা-শঙ্খ তৈরিতে নেমে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। পাড়াজুড়ে শুরু হয়েছে কর্মব্যস্ততা। ক্ষতির কথা ভুলে লাভের আশায় কোমর বেঁধে কাজে নেমে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলছে শাঁখ কাটা, ঘষা, পালিশ ও নকশা তৈরির কাজ।
শঙ্খশিল্পী তথা ব্যবসায়ী আইনুল ইসলাম বলেন, ‘বেশ কিছু কারণে আগের থেকে ব্যবসায় কিছুটা ভাটা পড়েছিল। এখন পুজোর মরশুম। এই সময়ে শাঁখার চাহিদা ভালোই থাকে। শঙ্খের চাহিদাও বেশ ভালোই। তাই, ব্যবসা বৃদ্ধির আশায় রয়েছি সকলেই।’ শিল্পী শিশুতোষ পাল বলছিলেন, ‘আমরা সবাই মিলে শিল্প সৃষ্টিতে মগ্ন থাকি। এবার পুজোয় ভালো সাড়া পাচ্ছি। তবে, দুর্যোগ একটু চিন্তায় রেখেছে।’ তামিলনাড়ু ও চেন্নাইসহ দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলি থেকে ডোমকলে আসে শঙ্খ। এরপর শুরু হয় প্রক্রিয়াকরণ। প্রক্রিয়াকরণ শেষে শঙ্খ কেটে তার আকার দেওয়া, ঘষে মসৃণ করা, পালিশ এবং শেষে শিল্পীর হাতে নকশা তৈরির পর তা পৌঁছে যায় মণ্ডপে মণ্ডপে, ঘরে ঘরে।