অনিরুদ্ধ সরকার: ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন। সেই রাতে সংবিধানের ৩৫২ ধারা প্রয়োগ করে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। সঙ্গে সঙ্গে আরম্ভ হয় বিরোধী নেতাদের ধরপাকড়, গ্রেপ্তারি। রাস্তায় রাস্তায় টহলদারি বাড়ে। জনগণের মৌলিক অধিকার খর্ব হতে থাকে। সংবাদপত্র ও সিনেমায় শুরু হয় প্রি-সেন্সরশিপ। এমনই রাজনৈতিকভাবে অস্থির পরিস্থিতিতে মুক্তি পায় ‘শোলে’। সিনেমার শ্যুটিং শেষ হয়ে গিয়েছিল ১৯৭৫ সালের মাঝামাঝি। মুক্তির তারিখ ঠিক হয় সেবছরই ১৫ আগস্ট, ভারতের স্বাধীনতার ২৮তম বার্ষিকীতে।
সিনেমা রিলিজের দিন হলে কম দর্শক
১৫ আগস্ট, ১৯৭৫। ইমার্জেন্সি চলছে। কলকাতা, দিল্লি ও মুম্বইয়ের মতো মেট্রো শহরগুলিতে জরুরি অবস্থার কারণে বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচি ছিল। তার জেরে প্রেক্ষাগৃহে প্রথম দিন দর্শক সংখ্যা ছিল অতি নগণ্য। দর্শকদের অনেকেই সেদিন ইন্টারভ্যালের পর আর পর্দার সামনে ফিরে যাননি। কারণ, এত দীর্ঘ সিনেমা ও এই ধরনের সংলাপে অভ্যস্ত ছিলেন না তাঁরা। শোনা যায়, এক দর্শক নাকি প্রেক্ষাগৃহের বাইরে এসে সাংবাদিককে বলেছিলেন, ‘এটা সিনেমা নাকি একটা যুদ্ধ!’ অথচ এই ‘ফ্লপ’ শোলে অল্পদিনেই হয়ে ওঠে ‘হিট’। জরুরি অবস্থায় সিনেমা হলের টিকিটের দাম ছিল নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু টিকিটের চাহিদা আকাশচুম্বী হয়ে ওঠায়, শোলের জন্য অনেক হল মালিকই গোপনে অতিরিক্ত টাকা নিতেন।
বোম্বের থিয়েটারে ‘ডায়লগ বিতর্ক’
বোম্বের দেড় হাজার আসনের মিনার্ভা থিয়েটারে ছবিটি টানা পাঁচ বছর প্রদর্শিত হয়। তিন বছর নিয়মিত শো, দু’বছর ম্যাটিনি শো। এমনকী ২৪০তম সপ্তাহেও হলে ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। বিবিসি ইন্ডিয়ার অনলাইন সমীক্ষায় ‘সহস্রাব্দের সেরা চলচ্চিত্র’ নির্বাচিত হয়েছিল ‘শোলে’। ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের বিচারেও এটিই ‘সর্বকালের সেরা ভারতীয় চলচ্চিত্র’। মিনার্ভা থিয়েটারের দেওয়ালে গব্বরের ডায়লগ লেখা নিয়ে শোরগোল পড়ে যায়। সেই ঘটনায় তদন্তে নেমে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিস।
প্রথম দিনে যান্ত্রিক বিপর্যয় নাকি অন্তর্ঘাত?
শোলে মুক্তির প্রথম দিনে সাময়িকভাবে যান্ত্রিক বিপর্যয় ঘটেছিল। কেউ কেউ এই ঘটনাকে ‘অন্তর্ঘাত’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। ইমার্জেন্সির সময় এই সিনেমাটির একটি প্রিভিউ শো অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে হাজির ছিলেন সরকার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও আমলাদের নিয়ে। তাঁদের কেউ কেউ এই সিনেমাটি নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন। হয়তো তাঁরা চাননি শোলে রিলিজ করুক। মিনার্ভা থিয়েটারে মুক্তির প্রথম দিনেই প্রদর্শনের সময় স্ক্রিন হঠাৎ অন্ধকার হয়ে যায়। যে কোনও সিনেমার ক্ষেত্রে এমন বিপর্যয় খারাপ প্রভাব ফেলতে পারত। কিন্তু পরবর্তীতে তা সামলে নেন পরিচালক রমেশ সিপ্পি।
প্রিভিউ শো’তে ইন্দিরা ঘনিষ্ঠরা
‘শোলে’ সিনেমা প্রদর্শনীর আগে সরকার অনুমোদিত একটি প্রিভিউ শো করা হয়েছিল। সেই প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সাংসদ, রাজনীতিবিদ ও আমলা। জানা যায়, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ছবির ‘অতিরিক্ত হিংসা’ নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন। কারও মতে এই সিনেমাটি ছিল ‘নিছকই বিনোদন।’ অনেকের আবার মনে হয়েছিল, ছবিতে ‘একনায়কতন্ত্রের’ বিরুদ্ধে একটা অদৃশ্য প্রতিবাদ আছে, যে কারণে সিনেমাটি ব্যান করার কথা প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। ‘শোলে’কে ‘অতিরিক্ত হিংসাত্মক’ বলে আখ্যা দিয়েছিল তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক। উল্লেখযোগ্য বিষয়, কিন্তু কয়েক মাস পর কেন্দ্রীয় সরকারই এই ছবিকে ‘ভারতের চলচ্চিত্র শিল্পের সাফল্যের উদাহরণ’ বলে বিদেশে প্রদর্শনের অনুমতি দেয়।
শুরুতে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প ‘মাস্ট’
ইমার্জেন্সির সময়ে হলগুলিতে সিনেমার শুরুতে সরকারি প্রচারচিত্র চালানো ছিল বাধ্যতামূলক। শোলের সময়েও অন্যথা হয়নি। প্রতিটি শো শুরু হওয়ার আগে ইন্দিরা সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে কয়েক মিনিটের ফিল্ম দেখানো হতো।
‘কিতনে আদমি থে?’
সিনেমা হলের জবাব, ‘এক ইন্দিরা থি’
‘কিতনে আদমি থে?’ মুম্বইয়ের বেশ কয়েকটি প্রেক্ষাগৃহে যখন গব্বরের সংলাপ হতো, তার পরেই কিছু দর্শক মজা করে চিৎকার করে বলত, ‘এক ইন্দিরা থি।’ শোনা যায়, এই ধরনের মন্তব্য ক্রমেই বাড়তে থাকায় আসরে নামে পুলিস। হল মালিকদের বলা হয়, তাঁরা যেন এই ধরনের মন্তব্য আটকাতে তৎপর হন। নাহলে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হবে। কয়েকজন গ্রেপ্তার হতেই সিনেমাটি নিয়ে হল মালিকদের আতঙ্ক বাড়ে। অনেকেই ‘শোলে’ নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যান। তাঁরা বুঝতে পারছিলেন, ‘শোলে’ ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে। আবার এর বিভিন্ন সংলাপ ঘিরে শুরু হচ্ছে রাজনৈতিক বিতর্কও, যা সরকারের নজরে পড়লে হলের লাইসেন্স বাতিল হতে পারে।
ইমার্জেন্সির জন্য বদলে গেল ক্লাইম্যাক্স
শোলের ক্লাইম্যাক্স পরিবর্তনের নেপথ্যে ছিল সেন্সর বোর্ড! ছবির শেষ দৃশ্যে দেখা গিয়েছিল ঠাকুর (সঞ্জীব কুমার) গব্বরকে (আমজাদ খান) লাথি মারার চেষ্টা করছেন। ঠাকুরের হাতে গব্বরের মৃত্যু অনিবার্য। কিন্তু পুলিস এসে তাঁকে মনে করিয়ে দেয় যে শাস্তি দেওয়ার অধিকার রয়েছে শুধু আইনের। আসল ক্লাইম্যাক্স ছিল অন্য। সেখানে গব্বরকে হত্যা করেছিল ঠাকুর। কিন্তু সেন্সর বোর্ড তা দেখানোর অনুমতি দেয়নি। ফলে পরিচালক রমেশ সিপ্পিকে নতুন ক্লাইম্যাক্স শ্যুট করতে হয়। ২৬ দিনের মধ্যে শেষ করা হয় সেই শ্যুটিং। ইমার্জেন্সির আবহে যা ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। ফিল্ম সমালোচক অমৃতা প্রীতম এক সাক্ষাৎকারে বলেন—‘এই পরিবর্তন রাষ্ট্রের ভয়কেই প্রকাশ করে।’ এই মন্তব্যটি সেই সময়ে পত্রিকায় ছাপা হলেও, ইমার্জেন্সির সেন্সরের কারণে শেষ পর্যন্ত আর দিনের আলো দেখেনি।
ছাপা হতো না গব্বরের ডায়লগ
ইমার্জেন্সির সময়ে শুধুমাত্র সরকার অনুমোদিত খবরই ছাপা হতো সংবাদপত্রে। বিনোদনের পাতাতেও সরকারি নজর ছিল। ‘শোলে’র মুক্তির বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আগাম স্ক্রিপ্ট, পোস্টারের নকশা, এমনকী ট্যাগলাইনও জমা দিতে হয়েছিল। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের অনুমতির জন্য এগুলি ছিল অপরিহার্য। সেলিম-জাভেদের দেওয়া জনপ্রিয় ট্যাগলাইন—‘The greatest star cast ever assembled’ কেটে দেওয়া হয়েছিল। কারণ ‘greatest’ শব্দটিকে সেন্সর বোর্ড ‘অতিরঞ্জিত’ বলে ধরেছিল। পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় ‘A different kind of action film’। ইমার্জেন্সির সময়ে গব্বরের সুপারহিট সংলাপ ‘আব তেরা কেয়া হোগা, কালিয়া’ কাগজে ছাপায় নিষেধাজ্ঞা ছিল। কারণ, কাগজে ছাপলে তা জনসভায় বা রাজনৈতিক বক্তৃতায় ব্যবহার হতে পারে। যা রাজনৈতিকভাবে সরকারকে বিপদে ফেলতে পারে। গব্বরের আরও একটি সংলাপ—‘জো ডর গ্যায়া, সমঝো মর গ্যায়া’ নিয়েও বিতর্ক বাধে। এই সংলাপও সরকার বিরোধী স্লোগান হয়ে উঠতে পারে বলে অনেক যুক্তি খাড়া করে সেন্সর বোর্ড। অবশেষে সেলিম-জাভেদ বোঝাতে সক্ষম হন, এটি শুধুই বিনোদনের অঙ্গ! ইমার্জেন্সির সময়ে বিরোধী নেতাদের গ্রেপ্তারের প্রেক্ষিতে ‘আরে ও সাম্ভা, কিতনে আদমি থে?’ সংলাপটি রাজনৈতিক কার্টুন হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।
ইমার্জেন্সির কারণে আমাদের প্রচার করতে দেওয়া হয়নি : রমেশ সিপ্পি
জরুরি অবস্থার কারণে সংবাদপত্রে সিনেমার রিভিউ প্রকাশের আগেও সরকারের অনুমতি নিতে হতো। যে কারণে শোলে মুক্তির পর প্রথম সপ্তাহে বেশিরভাগ পত্রিকাই চুপ ছিল। রমেশ সিপ্পি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম ছবি ফ্লপ হবে। কারণ আমাদের তো প্রচারই করতে দেওয়া হয়নি।’ কিন্তু মুখে মুখে প্রশংসা ছড়িয়ে পড়ে আম জনতার মধ্যে। সেই জনপ্রিয়তাই ছবি হিটের অন্যতম কারণ।
জয়-বীরুর ‘মদ্যপান দৃশ্য’
ইমার্জেন্সির সময় মদ্যপান সংক্রান্ত দৃশ্য নিয়ে সরকারি নিষেধাজ্ঞা ছিল। জয়-বীরুর কাঁধে হাত রেখে গাওয়া ‘ইয়ে দোস্তি’ গানের শ্যুটিংয়ের আগে সেই দৃশ্যের একটি অংশে ধর্মেন্দ্র ও অমিতাভকে ‘রামগড়ের মদের দোকান’-এর বাইরে দেখানোর পরিকল্পনা ছিল। সেন্সর বোর্ড এই দৃশ্য বাদ দিতে বাধ্য করে। তাতে ‘সামাজিক নেতিবাচক বার্তা’ যাবে বলে দাবি করা হয়। অন্য দৃশ্যগুলি অবশ্য থেকে যায়।
চিঠি ও ডাকবিভাগেও ছিল নজরদারি
ইমার্জেন্সির সময়ে ডাকবিভাগও ছিল নজরদারির আওতায়। ‘শোলে’ নিয়ে পাঠানো অসংখ্য চিঠি, ফ্যান মেলের উপর ছিল সরকারি নজরদারি। পুলিস জানিয়েছিল, সেই সময় বেশ কিছু চিঠিতে ‘গব্বর’ শব্দটি দিয়ে সরকারি দমননীতি নিয়ে ব্যঙ্গ করা হচ্ছিল। এক চিঠিতে লেখা ছিল—‘আমাদের গ্রামেও এক গব্বর আছে, আর সে হল পুলিস।’ কেউ লিখত ‘ভারতের রাজনীতি তো গব্বরদেরই হাতে।’ কেউ লিখত, ‘গব্বররাই এদেশের আসল রাজা।’ এই ধরনের বিরূপ মন্তব্য সরকারকে বিপদে ফেলতে পারে। তাই সেখানেও ছিল সেন্সর। রাজনৈতিক নেতারাও শোলে আর শোলের ডায়ালগ নিয়ে সেসময় বেশ বিপাকে পড়েছিলেন।
ডাবিং রুমে ‘শব্দ শুদ্ধিকরণ’
ইমার্জেন্সির সময়ে সেন্সর বোর্ড শুধু দৃশ্য নয়, সংলাপের প্রতিটি শব্দও পরীক্ষা করত। শোলের মূল স্ক্রিপ্টে কিছু সংলাপে ‘সিস্টেম’, ‘বিচার’, ‘সরকার’ ইত্যাদি শব্দ ছিল। সেন্সরের নির্দেশে এসব বদলে দেওয়া হয় শোলে সিনেমায়। তার বদলে আসে সাধারণ কিছু শব্দ। যেমন, ‘দুনিয়া’, ‘ইনসাফ’, ‘তাকত’। ধর্মেন্দ্র নাকি পরে এক সাক্ষাৎকারে মজা করে বলেছিলেন, ‘ইমার্জেন্সিতে গব্বরের ভয় কম, সেন্সরের ভয় বেশি।’
পোস্টার বদল
শোলে সিনেমার প্রথম পোস্টারে ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল লাল-কমলায়। জরুরি অবস্থার সময়ে এই রংকে ‘রাজনৈতিক বিদ্রোহের প্রতীকী রং’ হিসেবে দেখা হতে পারে বলে আলোচনা শুরু হয়। সরকারি প্রচার বিভাগ মুক্তির আগে পোস্টারের ব্যাকগ্রাউন্ড পরিবর্তন করে নীল ও হলুদ রং করার জন্য নির্দেশ দেয়।
বাদ পড়া দৃশ্য নিয়ে ‘আনকাট শোলে’
‘শোলে’-৫০ বছর উপলক্ষ্যে ইতালির বোলোগনা শহরে ‘ইল সিনেমা রিট্রোভাটো’ উৎসবে বিশ্ব প্রিমিয়ার হয় ‘শোলে’র আনকাট সংস্করণের। ইউরোপের অন্যতম বৃহত্তম উন্মুক্ত মঞ্চ পিয়াজ্জা ম্যাগিওরে-তে এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। পঞ্চাশ বছর আগে ইমার্জেন্সি পর্বে মুক্তির সময় সেন্সর বোর্ডের আপত্তির কারণে যে যে দৃশ্যগুলি পরিবর্তন করা হয়েছিল, সেগুলি সংযোজন করে মূল সিনেমাটি দর্শকদের দেখানো হয়।
প্রতীকী রামগড়
শোলা নির্মাণের জন্য খরচে কোনও কার্পণ্য করেননি সিপ্পিরা। রীতিমতো নকল একটা গ্রাম বানিয়ে ফেলা হয়, পর্দায় যাকে আমরা রামগড় বলে জানি। শোলের কাল্পনিক রামগড় গ্রামটি আসলে ছিল কর্ণাটকের বেঙ্গালুরুর কাছাকাছি রামনগরমের একটা অঞ্চল। ইমার্জেন্সির সময় পুলিসের বিভিন্ন দমনপীড়ন, গ্রামবাসীদের উপর অত্যাচার, গ্রেপ্তারি—সব মিলিয়ে দর্শক যেন নিজেদের গ্রামে রামগড়ের ছায়া খুঁজে পেত। রামগড় হয়ে উঠেছিল বাস্তবে অত্যাচারিত ভারতের সমস্ত গ্রামের প্রতীক। রামগড় নামে শ্যুট করা সেই বিখ্যাত ল্যান্ডস্কেপ আজও ‘শোলে রকস’ নামে পর্যটকদের আকর্ষণ করে।



