Bartaman Logo
২২ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

মহারাষ্ট্রের এলিফ্যান্টা গুহায়

ভান্ডারদারা, মালসেজঘাট, মাথেরন ঘুরে কাল রাতেই এসেছি রাজধানী শহর মুম্বইয়ে। এখানকার লোকাল সাইট সিয়িং ছাড়াও দেখে নেব বিখ্যাত এলিফ্যান্টা গুহা।

মহারাষ্ট্রের এলিফ্যান্টা গুহায়
  • ২২ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ইতিহাসের সন্ধানে ঘুরে দেখতে পারেন এলিফ্যান্টা গুহা। একে ঘিরে রয়েছে প্রাচীন গল্পগাথাও।

Advertisement

কীভাবে যাবেন:  হাওড়া থেকে দুরন্ত, গীতাঞ্জলি অথবা মুম্বই মেলে মুম্বই পৌঁছতে হবে। বিমানেও যেতে পারেন। মুম্বইয়ের গেট ওয়ে অফ ইন্ডিয়া থেকে সমুদ্র সফরে এলিফ্যান্টা যেতে হবে। সোমবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে।

ভান্ডারদারা, মালসেজঘাট, মাথেরন ঘুরে কাল রাতেই এসেছি রাজধানী শহর মুম্বইয়ে। এখানকার লোকাল সাইট সিয়িং ছাড়াও দেখে নেব বিখ্যাত এলিফ্যান্টা গুহা। এলিফ্যান্টা সম্পর্কে অনেক গল্পগাথা শুনেছি। তাই দেখার ইচ্ছাটা আগে থেকেই মনের গভীরে লালিত ছিল। পরদিন পরিকল্পনামাফিক ব্রেকফাস্টের পরই বেরিয়ে পড়লাম। একটা লোকাল ট্যাক্সি ধরে পৌঁছে গেলাম গেট ওয়ে অব ইন্ডিয়ায়। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে প্রিন্স অফ ওয়েলসের ভারত আগমনের সৌজন্যে নির্মিত হয়েছিল এই ঐতিহাসিক তোরণ। বহু হিন্দি সিনেমার সৌজন্যে অবশ্য জায়গাটা অতি পরিচিত মনে হল। এই চত্বর জুড়ে যেন মেলার পরিবেশ। লোকে লোকারণ্য। কাছেই তাজ হোটেল চোখে পড়তেই ২৬/১১ স্মৃতি মনের কোণে ভেসে উঠল। লক্ষ করলাম সাগরের বুকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বিভিন্ন আকৃতির একাধিক ছোটো বড়ো ট্রলার, লঞ্চ ও জাহাজ। ঝটপট জেটিঘাট থেকে টিকিট কেটে উঠে পড়লাম লঞ্চে। উত্তাল সাগরের বুকে ভেসে চলেছে লঞ্চ। পিছনে ছোটো হতে থাকে গেট ওয়ে অব ইন্ডিয়া, তাজসহ অন্যান্য হোটেলের সারি ও জনবহুল মুম্বই শহর।
জল কেটে এগিয়ে চলেছে লঞ্চ। উপর নীচে মিলিয়ে লঞ্চে পর্যটকদের ভিড় বেশ ভালোই। যাত্রাপথে ভারতীয় নৌবাহিনীর রণতরী ও পণ্যবাহী জাহাজের সারি নজরে পড়ল। লঞ্চে বসেই দেখে নিলাম একটা ছোট্ট আইল্যান্ড। যেখানে পরমাণু গবেষণা কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। 
যাত্রাপথে নজরে এল কাছে দূরে আরও বেশ কয়েকটি ছোটো বড়ো দ্বীপ। প্রায় ১১ কিলোমিটার জলপথ অতিক্রম করতে সময় লাগল প্রায় ঘণ্টাখানেক।
এলিফ্যান্টা জেটিঘাটে এসে আবার এক রাউন্ড লাইন দিতে হল। টয় ট্রেনের টিকিট কাটতে হবে যে! গুহার দূরত্ব অবশ্য সামান্যই। কিন্তু বাচ্চা বুড়ো সকলেই সোৎসাহে খেলনা ট্রেনের মজা নিতে চাই। মাত্র সাত মিনিটেই কিন্তু মজার সফরের সমাপ্তি। এবার পায়ে পায়ে পাথুরে সিঁড়ি অতিক্রম করার পালা। ১২৫টি খাড়াই সিঁড়ি টপকাতেই নাজেহাল অবস্থা! সিঁড়ির দু’দিকে আবার হরেক দোকানের হাতছানি। তাতে রকমারি পসরার বাহার। তবে গিফট আইটেমই বেশি নজর কাড়ে। অনেক খাবারের দোকানও দিয়েছে স্থানীয়রা। সিঁড়ির সিরিজ শেষে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের টিকিট কাউন্টার। সেখান থেকে টিকিট কেটে সোজা গুহা দর্শনে চললাম।
এককথায় এলিফ্যান্টা হল পাহাড় কাটা গুহা মন্দিরের সমষ্টি। ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত গুহা মন্দিরগুলো মূলত শিবের নামে উৎসর্গীকৃত। ভাবতেই শিহরন জাগে যে পাহারকাটা এক গুহা শিল্প জগতে প্রবেশ করছি। যেখানে লুকিয়ে রয়েছে খোদাই শিল্পের এক আশ্চর্য সম্ভার। যেখানে শিল্পস্রষ্টা কারিগরদের হাতের কাজের শ্রেষ্ঠত্বের জন্য অফুরান কুর্নিশ করতে ইচ্ছে করে। কোনোরকম উৎকীর্ণ লিপি আবিষ্কৃত না হওয়ায় এলিফ্যান্টা গুহার সঠিক নির্মাণ কাল নিয়ে মতান্তর রয়েছে। তবে মনে করা হয় এই গুহামন্দিরগুলি পঞ্চম থেকে সপ্তম শতকের মধ্যে নির্মিত হয়েছিল। আবার শিবগুহা ভাস্কর্যে অষ্টম শতাব্দীর রাষ্ট্রকূট রাজাদের নির্মাণশৈলীরও নিদর্শন পরিলক্ষিত  হয়। অনেকেই সাদৃশ্য খোঁজেন ইলোরার কৈলাস মন্দিরের সঙ্গে। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় ব্যাসল্ট পাথর কেটে এই অনুপম শিল্প নিদর্শনের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন অবশ্যই তৎকালীন রাষ্ট্রকূট নৃপতিবর্গ। তাছাড়া গুহায় পাওয়া ত্রিমূর্তি রাষ্ট্রকূট রাজাদের রাষ্ট্রীয় প্রতীক ছিল বলে কোনো কোনো ইতিহাসবিদ মত ব্যক্ত করেন। অনেকে আবার কলচুরি রাজাদের দ্বারা নির্মাণের কথা উল্লেখ করেছেন। কেউ কেউ আবার তাদের বক্তব্যে বলেন এটা আসলে গুপ্ত চালুক্য শিল্পের অন্যতম অনুকরণ। সপ্তম শতাব্দীর একটি শিলালিপি অনুযায়ী দ্বিতীয় পুলকেশীর সময়কালে এই গুহাগুলির নির্মাণ হয়েছিল নাবিকদের আশ্রয়ের জন্য। পরবর্তীতে এই গুহাগুলি বিভিন্ন নান্দনিক ভাস্কর্যে পূর্ণতার মাধ্যমে মন্দিরে পরিণত হয়।
শোনা যায়, ষোড়শ শতকে এই দ্বীপটি গুজরাতের সুলতানের অধীনে ছিল। কিন্তু ঘটনাচক্রে গুজরাতের সুলতানকে হারিয়ে দিয়ে পর্তুগিজরা এই দ্বীপটি দখল করে নেয়। দ্বীপে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল এই বিস্ময় উদ্রেককারি গুহা মন্দিরগুলো। এই হিন্দু স্থাপত্যের প্রতি তাদের বিন্দুমাত্র আবেগ বা শ্রদ্ধা ছিল না। কিন্তু বিভিন্ন মূর্তিগুলো হয়ে উঠেছিল তাদের বন্দুকের চাঁদমারি স্পট। একটি হিন্দু গুহাকে তারা পর্তুগিজ চার্চে রূপান্তরিত করেছিল বলে অনেকে মনে করেন। সেইসময় গুহা সম্মুখে কালো প্রস্তর নির্মিত দু’টি বিশাল হাতির মূর্তি ছিল। তারা হাতির মূর্তি দেখে এই দ্বীপের নামকরণ করে এলিফ্যান্টা দ্বীপ। এর আগে এই দ্বীপের নাম ছিল ‘ঘরাপুরিচি লেনি’। যার অর্থ হল ‘গুহার শহর’। অবশ্য অন্যান্য মূর্তির সঙ্গে এই হাতির মূর্তিগুলোকেও পর্তুগিজরা ক্ষতিগ্রস্ত করে। একটি হাতি ভাঙাচোরা অবস্থায় দীর্ঘদিন এখানেই পড়েছিল। পরবর্তীতে ইংরেজদের হাতে এই দ্বীপ আসার পর মূর্তিটি তুলে এনে মুম্বইয়ের ভিক্টোরিয়া গার্ডেনে প্রতিস্থাপন করা হয়। বর্তমানে যা মুম্বইয়ের জিজামাতা উদ্যানে সংরক্ষিত।
এখানে ছোটো বড়ো মিলিয়ে মোট সাতটি গুহা রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি হিন্দু গুহা, দুটি বৌদ্ধ গুহা। শিবগুহার অভ্যন্তরে ঢুকলেই স্তম্ভ এবং মণ্ডপের অলংকরণ সকল পর্যটককে অবাক করে দেবে। গুহায় প্রবেশের তিনটি পথ রয়েছে। তার প্রতিটি গুহাদ্বারের কাছে রয়েছে দ্বারপালের মূর্তি। গুহাজুড়ে একটা আলো আঁধারি পরিবেশ। এই খোদাই শিল্পকর্ম মূলত শৈব, শক্তি ও বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সমন্বযের বার্তা দেয়। এখানে বিষ্ণু, শিব, ব্রহ্মা, দুর্গা ইত্যাদি দেবতাদের প্রতিভূ দেওয়ালে স্থান পেয়েছে। ভগবান শিবের বিভিন্ন অবতার ও তাকে নিয়ে বিভিন্ন পৌরাণিক ঘটনাবলি খোদাই করা হয়েছে। শিবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় মূর্তিটি হলো ত্রিমূর্তি। যা একদম দেওয়ালের শেষ প্রান্তে অবস্থান করছে। মূর্তির গায়ে ফেলা হয়েছে মৃদু আলো। এই মূর্তিকে ব্রহ্মা ,বিষ্ণু ও মহেশ্বরের সমন্বয় বলা হয়। বর্তমানে মহারাষ্ট্র পর্যটন দপ্তরের লোগোতেও এই ত্রিমূর্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। এখানেই পর্যটকদের ছবি তোলার হিড়িক। এই মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের অস্তিত্বের তুচ্ছতা উপলব্ধি করায়। মনে এনে দেয় এক শান্তির পরিবেশ। অনেকে আবার এই ত্রিমূর্তিকে পঞ্চমুখ শিব বা সদাশিব বলে উল্লেখ করেন। সবমিলিয়ে এই ত্রিমূর্তি ১৭ফুট বা ৫.৪৫ মিটার উঁচু এবং এক মিটার উঁচু প্ল্যাটফর্ম এর উপর অধিষ্ঠিত। ত্রিমূর্তির ডানদিকের প্যানেলে গঙ্গাবতরণের দৃশ্য এবং বাঁদিকে অর্ধনারীশ্বর শিবের মূর্তি বিরাজমান। আর এক প্যানেলে রয়েছে শিব পার্বতীর পাশা খেলার মূর্তি। সবমিলিয়ে গুহার দেওয়ালের পরতে পরতে পুরাণকাহিনির অনন্য খোদাই ভাস্কর্য। গুহার অভ্যন্তরে কিছু ভাঙাচোরা মূর্তি ছাড়া রয়েছে একটি শিবলিঙ্গ। তাতে প্রদক্ষিণের পথও বর্তমান। এবার চললাম স্তূপ হিলের দিকে। পূর্বদিকের পাহাড়ে রয়েছে পাশাপাশি দু’টি বৌদ্ধ গুহা। সঙ্গে আর একটি ইটের তৈরি বৌদ্ধস্তূপও দেখা গেল। তবে গুহাদু’টির একটা অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। দু’টি গুহাতেই তেমন কোনো ভাস্কর্য চোখে পড়ল না। অন্যান্য গুহাতেও সেরকম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন দেখলাম না। গুহার বাইরে অনেকটা ফাঁকা জায়গা। সেখানে রয়েছে কয়েকটা থাচ আমব্রেলা। পর্যটকরা অনেকেই সেখানে বিশ্রাম নিচ্ছেন। এদিকটা গাছগাছালিতে ঘেরা একটা নিরিবিলি পরিবেশ। কানে আসছে পাখিদের কলকাকলি। তবে সেইসঙ্গে হনুমানদের হল্লাবাজিও মেনে নিতে হচ্ছে। এখানে বসে আরব সাগরের একটা সুন্দর ভিউ চোখে লেগে থাকে। 
দূরে উঁচু পাহাড়টা ক্যানন হিল। পর্তুগিজরা ওই পাহাড়ের মাথাতেই কামান বসিয়েছিল। অনেকেই হাইকিং করে ওঠে। এখানে রয়েছে একটা ছোট্ট মিউজিয়াম।
এবার ফেরার পালা। সিঁড়ির মুখে এক রেস্তরাঁয় পাওভাজি আর চা খেয়ে নিলাম। খেলনা ট্রেন ধরে আবার চলে এলাম জেটিঘাটে। জলপথে ফিরব মুম্বই শহরে। সমুদ্রের সফেন নীলাভ জলরাশির প্রতিটি ঢেউ জানাচ্ছে আবার আসার আহ্বান।
মানস মুখোপাধ্যায়

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ