Bartaman Logo
২ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

হাতির শুঁড় প্রকৃতির বিস্ময়

আফ্রিকার বিস্তীর্ণ তৃণভূমি সাভানায় সূর্য তেজ তখন প্রখর। মাটি ফেটে চৌচির, বাতাসে ধুলো উড়ছে। চারপাশে কোথাও জলের চিহ্নমাত্র নেই।

হাতির শুঁড় প্রকৃতির বিস্ময়
  • ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০

হাতির শুঁড় কোনও সাধারণ অঙ্গ নয়। শুঁড়ের সাহায্যে কীভাবে এই বৃহদাকার প্রাণীটি প্রকৃতিকে জয় করে জানালেন উৎপল অধিকারী

Advertisement

আফ্রিকার বিস্তীর্ণ তৃণভূমি সাভানায় সূর্য তেজ তখন প্রখর। মাটি ফেটে চৌচির, বাতাসে ধুলো উড়ছে। চারপাশে কোথাও জলের চিহ্নমাত্র নেই। তৃষ্ণায় কাতর হস্তীশাবকগুলো মায়েদের শরীরের সঙ্গে লেগে কোনওক্রমে হাঁটছে। হঠাৎ পালের অভিজ্ঞ হাতি থেমে যায়। সে শুঁড় উঁচিয়ে বাতাস থেকে কী একটা টেনে নেয়। কয়েক মুহূর্ত পর তারা ধীরে ধীরে হাঁটা শুরু করে নতুন এক দিকে। গোটা হস্তীপাল তাকে অনুসরণ করে। বেশ কিছু সময়ের ক্লান্তিকর পথ পেরিয়ে দেখা গেল মাটির গভীরে লুকোনো এক জলাধার। যার গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে ছিল বেশ কয়েক মাইল দূরে! এই অসাধারণ জলসন্ধানী ক্ষমতা হাতির শুঁড়টিকে করেছে অনন্য।
হাতির শুঁড় কোনও সাধারণ অঙ্গ নয়। এটি একাধারে নাক, উপরের ঠোঁট ও হাতও বটে। মানুষের গোটা দেহে থাকে প্রায় ৬০০ পেশি। আর হাতির শুঁড়ে থাকে প্রায় ৪০ হাজার পেশি। হাড় নেই, কিন্তু নমনীয়তায় অনন্য। শুঁড়ের ডগায় আছে ছোট আঙুলের মতো প্রসারিত অংশ যার সাহায্যে হাতি ঘাসের একটি তৃণ তুলতে পারে আবার চাইলে বিশাল গাছও উপড়ে ফেলতে পারে। শুঁড় দিয়ে হাতি শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়, জল পান করে, ধুলো ছিটায়, আওয়াজ করে এবং সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হল গন্ধ নেয়। বিজ্ঞান বলছে, হাতির ঘ্রাণেন্দ্রিয় অত্যন্ত শক্তিশালী। মানুষের তুলনায় প্রায় দশ গুণ বেশি ঘ্রাণ রিসেপ্টর জিন রয়েছে হাতির শরীরে। ফলে তারা বাতাসের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র গন্ধও সহজেই অনুভব করতে পারে। যেমন বারো মাইল দূরের জলাশয়ের গন্ধ, মাটির আর্দ্রতা, বাতাসে ভেসে থাকা জলীয় বাষ্প কিংবা অন্য প্রাণীর উপস্থিতি। এই ক্ষমতার কারণেই শুষ্ক আবহাওয়ায় তারা তাদের পুরো দলকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।
বিজ্ঞানীরা আফ্রিকা ও এশিয়ার সংরক্ষিত এলাকায় হাতিদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন যে, হাতিরা বাতাসের দিক বোঝে তারপর সেই অনুযায়ী গন্ধের উৎস খুঁজে পায়। শুঁড়ের সংবেদনশীলতা এত বেশি যে, তারা ভূগর্ভস্থ জলের গন্ধও ধরতে পারে। প্রয়োজনে দাঁত ও শুঁড় দিয়ে মাটি খুঁড়ে জল বের করে আনে। এইভাবে এক হাতির আবিষ্কৃত জল শুধু তার পরিবারই নয়, আশপাশের জঙ্গলের জেব্রা, হরিণ, এমনকী ক্ষুদ্র প্রাণীর জীবনও বাঁচায়।
শুধু জল খোঁজা নয়, হাতি তাদের শুঁড় দিয়ে সামাজিকতাও তৈরি করে। শাবককে আদর করা, বন্ধু হাতিকে স্বাগত জানানো কিংবা রাগ দেখানো— সবই হয় এই শুঁড় দিয়ে। মায়েরা শাবকের গন্ধ তাকে চিনে নিতে পারে, গন্ধে নিয়ে অপরিচিত হাতিকেও শনাক্ত করতে পারে। এমনকী শত্রুর উপস্থিতিও তারা অনেক দূর থেকে বুঝে ফেলতে পারে।
হাতির এই ঘ্রাণেন্দ্রিয় শুধু তাদের নিজেদের টিকিয়ে রাখে না, বরং গোটা পরিবেশকেও সাহায্য করে। তারা জল খুঁজে বের করলে আশপাশের অসংখ্য প্রাণীও উপকৃত হয়। তাদের তৈরি কূপে জমে থাকা জল অনেক সময় পাখি, শেয়াল, এমনকী পোকামাকড়দেরও জীবন বাঁচায়। তাই হাতিকে বলা হয় কিস্টোন প্রজাতি অর্থাৎ যাদের উপস্থিতি পুরো বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করতে ও ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে।
হাতির শুঁড় কেবল একটা অঙ্গ নয়, এটি প্রকৃতির আশ্চর্য এক প্রকৌশলও। ১২ মাইল দূরের জলের গন্ধ শনাক্ত করার ক্ষমতা কল্পনার মতো শোনালেও বিজ্ঞান বলছে এটাই সত্য। এই ক্ষমতা ছাড়া হয়তো আফ্রিকার সাভানা কিংবা এশিয়ার জঙ্গলে হাতির পালের অস্তিত্ব এত দীর্ঘকাল টিকত না। যখন আমরা হাতি দেখি, তখন তার বিশাল দেহ, লম্বা দাঁত বা শান্ত দু’টি চোখে মুগ্ধ হই। কিন্তু আসল বিস্ময় লুকিয়ে আছে তার শুঁড়ে। যেখানে মিশে আছে শক্তি, সূক্ষ্মতা আর বেঁচে থাকার এক মহাকৌশল।

সম্পর্কিত সংবাদ