স্বপন দাশগুপ্ত: ভারত। বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ। কিন্তু এই দীর্ঘ যাত্রাপথ কখনওই বিশেষ মসৃণ ছিল না। ইংরেজ শাসন থেকে মুক্তির কয়েক বছর পর ভারতের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি ভালোভাবে খতিয়ে দেখে এক প্রখ্যাত ব্রিটিশ গবেষক লিখেছিলেন—‘নির্বাচন এমন একটা বিষয়, যেটা ভারতীয়রা বেশ ভালোই করতে পারে।’ মন্তব্যটি শুধুমাত্র কৌতুকবশত বলা হয়নি। ভারতের ভোটব্যবস্থা তখন গণতান্ত্রিক সমাজ জীবনের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছিল। গণতন্ত্রের এই প্রধান স্তম্ভের প্রতি সেই বিশ্বাসকে আরও পোক্ত করে ১৯৭৭ সালের নির্বাচন। প্রায় দু’বছর ধরে চলা জরুরি অবস্থার পর বহু মানুষের মনে আশঙ্কা ছিল, ভারতীয় গণতন্ত্র আর ফিরবে কি না। কিন্তু ভারতীয় ভোটাররা সকল দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দূর করে ভোটের মাধ্যমে একটি স্বৈরাচারী সরকারকে সরিয়ে দিল। তাদের এই সাহসী সিদ্ধান্ত পৃথিবীকে মনে করিয়ে দিল—ভারতে জনগণের রায়ের উপরে আর কিছুই নেই।
ভারতের মতো বিশাল ও বৈচিত্র্যময় দেশে নির্বাচন পরিচালনা করা যে কতটা কঠিন, তা ভাবলেই বোঝা যায়। পাহাড়-জঙ্গল-নদী পেরিয়ে নির্বাচন কমিশনের কর্মীরা যেভাবে ভোটারদের কাছে পৌঁছোন, বিশ্বের আর কোনও গণতন্ত্রে তা দেখা যায় না। স্বাধীনতার সাত দশকে ভারতের নির্বাচন কমিশন বারবার প্রমাণ করেছে যে, দেশের মানুষের পছন্দের জনমতকে তারা সঠিকভাবে তুলে ধরতে সক্ষম। ব্যতিক্রমী ঘটনা যে ঘটেনি, তেমনটা নয়। এই প্রসঙ্গে ১৯৭২ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ও ১৯৮৭ সালের জম্মু-কাশ্মীর নির্বাচনের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই দুই নির্বাচনে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। যা ভারতের গণতন্ত্রকে কিছুটা ধাক্কা দিয়েছিল। কিন্তু সামগ্রিকভাবে এদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রাসঙ্গিকতাকে বজায় রেখেছে। তবে নির্বাচনী পরাজয়ের পর অবিশ্বাস ও অদ্ভুত কিছু অভিযোগ অবশ্য নতুন কিছু নয়। ১৯৭১ সালে কেউ কেউ বলেছিলেন, সোভিয়েত দেশে তৈরি ‘অদৃশ্য কালি’র সাহায্যে বিপুল ভোটে জিতেছেন ইন্দিরা গান্ধী! এই একই ধরনের বিস্ময়কর একটি দাবি শোনা যায় ২০০৯ সালের নির্বাচনের পর। বলা হয়, উপগ্রহের মাধ্যমে নাকি ইভিএম নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।
আগে একটা সময়ে এই ধরনের সমস্ত জল্পনাকে নিছক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বলে উড়িয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এই প্রবণতা রাজনীতির মূলধারায় ঢুকে পড়েছে। বিশেষ করে যখন নিজের দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের কথায় অতি-উৎসাহী হয়ে, জনমতের সম্পূর্ণ উলটো দিকে গিয়ে ভোটার তালিকা নিয়ে স্বয়ং বিরোধী দলনেতাই সংশয় প্রকাশ করেন। এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে একটা দাবি ঘিরে তুমুল চর্চা শুরু হয়েছে। কী সেই দাবি? বলা হচ্ছে, স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশনের (এসআইআর) মধ্যে দিয়ে নির্বাচন কমিশন সংখ্যালঘু ভোটারদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে পারে। কেন? এই সংখ্যালঘু ভোটাররা ‘সম্ভবত’ ভারতীয় নন, এমন কারণে। আর এনিয়েই বাংলায় চরমে উঠেছে রাজনৈতিক তরজা। যার প্রভাব পড়তে পারে অসম সহ উত্তর-পূর্বের অন্যান্য রাজ্যেও।
সংবিধানের ৩২১ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং জনপ্রতিনিধিত্ব আইন কমিশনকে ভোট পরিচালনা করার পূর্ণ ‘স্বাধীনতা’ দিয়েছে। এই ‘স্বাধীনতা’ শুধু ক্ষমতা নয়, বরং এক ধরনের দায়িত্ব—যাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই দেশবাসীর ইচ্ছা নির্বাচনী ফলাফলে প্রতিফলিত হয়। এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী আচরণবিধি। ভোটের প্রচারের সময় বিপক্ষ দলের প্রার্থীর উদ্দেশে অশালীন মন্তব্য, সরকারি সুবিধা ব্যবহারের মতো অপ্রীতিকর রাজনৈতিক আচরণের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার ক্ষেত্রে আচরণবিধি অত্যন্ত কার্যকরী। এরপরেই তালিকায় আসে ইভিএম ও ভিভিপ্যাট। এই প্রযুক্তি ব্যালটে ছাপ্পা ও জাল ভোট কমিয়েছে। কিছু রাজনৈতিক দল ইভিএম নিয়ে প্রশ্ন তুললেও এর নির্ভরযোগ্যতা ইতিমধ্যেই স্বীকৃত। ভোটের আগে এলাকায় এবং ভোটের দিন বুথে বুথে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতি ভোটারদের নিরাপত্তা ও আস্থা বাড়িয়েছে। সঙ্গে রয়েছে সিসি ক্যামেরার মতো প্রযুক্তি ব্যবহার। বুথে বুথে ক্যামেরা বসানোর ফলে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ার উপর নজরদারি সহজ হয়েছে। ভোটকর্মী ও ভোটারের উপর চাপ বা হুমকি দেওয়ার মতো ঘটনাও কমেছে। তবে এটাও সত্যি যে, কোনও ব্যবস্থাই সম্পূর্ণ নিশ্ছিদ্র নয়। এতসবের পরেও কিছু সীমাবদ্ধতা থেকেই যায়। স্থানীয় স্তরে অনেক সময়েই পেশিশক্তির প্রয়োগ বা রিটার্নিং অফিসারের অনিয়ম গণনাকেন্দ্রের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। কিছু অঞ্চলে মৃত ব্যক্তির নামে ভোট পড়া বা ডুপ্লিকেট এন্ট্রি এখনও একটি বড় সমস্যা। চলতি শীতকালীন অধিবেশনে যখন সংসদে নির্বাচনী সংস্কার নিয়ে আলোচনা হবে, তখন আরও বহু অভিযোগ সামনে আসতে পারে।
ভারতের গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ নির্বাচন কমিশন। কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন নির্বাচন কমিশনকে অপমান করে, সরকারি আধিকারিকদের হুমকি দেয়, তখন গণতন্ত্রের ভিত্তিই নড়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গে স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) চলাকালীন রাজ্যের শাসকদলের এহেন আচরণ অত্যন্ত লজ্জাজনক।
গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে নির্ভুল ভোটার তালিকা ন্যূনতম প্রাথমিক শর্ত। দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষদের ভোটকেন্দ্রে দিতে যেতে না দেওয়া হলে ক্ষোভ বাড়ে, প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। তার কারণও সহজবোধ্য। কিন্তু যখন বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ যায় বা কোথাও দু’বার, কোথাও তিনবার ভুয়ো ভোটারের নাম তালিকায় যোগ হয়, তখন সেভাবে কোনও প্রতিবাদ হয় না। যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। এই অনিয়মগুলিও সমান উদ্বেগের বিষয় হওয়া উচিত। কারণ এই ধরনের ঘটনাগুলি ভোটের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। ভোটার কার্ড ও ছবি ব্যবহার করে এই জালিয়াতির বিষয়ে ইতিমধ্যে সরব হয়েছে নির্বাচন কমিশন। তারপরেও বহু এলাকায় এখনও মৃত ব্যক্তির নামে ভোট পড়ে। স্থায়ীভাবে অন্যত্র চলে গিয়েছেন, এমন অনেকের নামে ভোটের দিন ঠিক ভোট পড়ে যায়। সারা দেশেই এই ধরনের অভিযোগ ওঠে। পূর্ব ভারতে আরও একটি বাড়তি সমস্যা রয়েছে—নথি জালিয়াতি করে ভোটার তালিকায় অনুপ্রবেশকারীদের নাম ঢুকে যাওয়া।
আর এখানেই স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশনের (এসআইআর) প্রয়োজনীয়তা। নির্বাচন কমিশন যে প্রথমবার এমন কোনও কাজ করছে, তা নয়। তবে স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশনের (এসআইআর) জন্য কোনও নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই। সাধারণত ১০-১২ বছর অন্তর এটা হয়ে থাকে। নির্দিষ্ট সময় অন্তর এটা প্রয়োজন। একটি বিস্তারিত ‘ভোটার অডিট’ ছাড়া কখনও সঠিক জনমত প্রতিফলিত হতে পারে না।
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের কথা। আয়ারল্যান্ড নিয়ে তখন একটা কথা ভীষণ প্রচলিত ছিল—‘ভোট আর্লি অ্যান্ড ভোট অফেন’। আদতে শুনলে মনে হবে, এর মধ্যে দিয়ে বোধহয় মানুষজনকে ভোট দিতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। ‘ভোট আর্লি’-র মাধ্যমে ভোটারদের আগেভাগে গিয়ে ভোট দিতে বলা হচ্ছে। আর ‘ভোট অফেন’-এর মাধ্যমে দরকার পড়লে বারবার ভোট দিতে বলা হচ্ছে। মানে ছোটোখাটো সমস্ত নির্বাচনে যাতে ভোটাররা ভোট দেন। যদিও বাস্তবে এই বাক্যবন্ধটি ব্যবহার হত ব্যঙ্গার্থে। ‘ভোট আর্লি অ্যান্ড ভোট অফেন’-এর মধ্যে দিয়ে আসলে বোঝানো হত, ‘তাড়াতাড়ি গিয়ে ভোট দিন। প্রয়োজনে একই নির্বাচনে বার বার ভোট দিন।
ভারতের কিছু এলাকায় এখনও বাস্তব চিত্রটা কিছুটা সেই রকমই বটে। কোথাও নির্বাচনের দিন মৃত ভোটাররা এসে ঠিক ভোট দিয়ে যান, কোথাও এক প্রার্থীর ভোট চলে যায় প্রতিপক্ষের ঝুলিতে, কোথাও আবার একই ব্যক্তি একাধিক পরিচয়ে ভোট দেন। ভোট এলেই দেশের নানান প্রান্তে এই ধরনের নানা ঘটনার সাক্ষী থাকি আমরা। এসব ঘটনা এখনও ইতিহাস নয়। এসআইআরের মধ্যে দিয়ে হয়তো রাজনীতির এই সমস্ত অভিনব কাণ্ডকারখানা পুরোপুরি বন্ধ হবে না। কিন্তু সমগ্র বিশ্বের কাছে একটি বিষয় জোরের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করা যাবে যে, ভারতে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন হয়। আর এই সব কিছুর নেপথ্যে লক্ষ্য একটাই, যাতে ভবিষ্যতে কোনও রাজ্য বা কোনও অঞ্চল সম্পর্কে কখনও বলা না হয়—‘ওখানে নির্বাচন হয় না, ম্যানেজ হয়।’
লেখক রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ।
মতামত ব্যক্তিগত