সংবাদদাতা, কান্দি: কান্দি বিডিও অফিসে তখন তুমুল ভিড়। ২২৮ নম্বর বুথের শুনানি শুরু হয়েছে সকাল ১১টা নাগাদ। শুনানির ঘরের দরজা থেকে আঁকাবাঁকা দীর্ঘ লাইন কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে বোঝার উপায় নেই। সেই লাইনেই দাঁড়িয়েছিলেন হিজল পঞ্চায়েতের শ্রীকৃষ্ণপুর গ্রামের অশীতিপর বৃদ্ধা যুগলদাসি কাপাসিয়া। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী বয়স ৮৫ বছরের বেশি হলে তবেই বাড়িতে শুনানি হবে। যুগলদাসির বয়স ৮১ বছর, কাজেই তাঁকে আসেতই হয়েছে শুনানি কেন্দ্রে। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎই লুটিয়ে পড়লেন তিনি বিডিও অফিসের মেঝেতে। বৃদ্ধাকে ওইভাবে লুটিয়ে পড়তে দেখে মুহূর্তে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অন্যান্যরা বৃদ্ধাকে সুস্থ করে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকেন। ততক্ষণে সেখানে চলে এসেছে তৃণমূলের সাহায্যকারী টিমের সদস্যরা। তাঁরাই বৃদ্ধাকে কান্দি মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে কান্দির বিডিও তাপসকুমার মণ্ডল বৃদ্ধাকে দেখতে হাসপাতালে যান। তৃণমূল নেতা আইনাল হোসেন বলেন, বৃদ্ধাকে তড়িঘড়ি হাসপাতালে না নিয়ে গেলে কোনও খারাপ ঘটনা ঘটতে পারত। চিকিৎসকদের অনুরোধ করা হয়েছে ওঁর যথাযথ চিকিৎসা করার জন্য। হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, ওই বৃদ্ধার সেরিব্রাল অ্যাটাক করেছে। তবে ওঁর অবস্থা স্থিতিশীল। বৃদ্ধার ছেলে সুধীর কাপাসিয়া বলেন, মা কয়েকবছর ধরেই অসুস্থ। বয়সও আশি পেরিয়ে গিয়েছে। এই অবস্থায় মায়ের বয়স ৮০ পেরিয়ে গেলেও বিডিও অফিসেই শুনানিতে হাজির করতে বলা হয়েছিল। প্রশাসনকে মায়ের সমস্যার জানিয়েও কোনও লাভ হয়নি। এখন ডাক্তারবাবুরা বলছেন মায়ের স্ট্রোক হয়েছে।
কান্দিতে যখন এই অবস্থা তখন বড়ঞায় শুনানি কেন্দ্রের দোতলার সিঁড়ি বেয়ে দুই অসুস্থ বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে উঠতে হল নোটিস পেয়ে। মঙ্গলবার ওই দুই হৃদয় বিদারক চিত্র ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। কান্দির মহকুমা শাসক প্রদীপ্ত বিশ্বাস জানান, দু’টি ঘটনার কথা জানতে পেরেছি। কেন এমন হল খোঁজ নিয়ে দেখা হচ্ছে। বড়ঞা ব্লকের ডাকবাংলা কৃষক বাজারে করা হয়েছে শুনানি কেন্দ্র। সেটি আবার দোতলায়। সিঁড়ি বেয়ে উপরে যেতে হবে। ব্যবস্থা নেই কোনও সহায়কের কিংবা স্টেচারের। মঙ্গলবার ওই শুনানি কেন্দ্রে এসেছিলেন অশীতিপর মানোয়ারা বিবি। তাঁর বাড়ি ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বৈদ্যনাথপুরে। মানোয়ারা বিবির আত্মীয়রাই তাঁকে ধরাধরি করে সিঁড়ি দিয়ে তুললেন দোতলায়। বৃদ্ধাকে তাঁর নাতি ও ছেলে দু’ দিকে দুই হাত ধরে ধীরে ধীরে সিড়ি দিয়ে উপরে তুললেন। মানোয়ারা বিবির অশক্ত শরীর। শরীরের পুরো ভারই বলতে গেলে বইতে হচ্ছিল ছেলে ও নাতিকে। বৃদ্ধার নাতি আলাউদ্দিন শেখ বলেন, উপরে তুলতে গিয়ে আমরাই হাঁপিয়ে গিয়েছিলাম। ঠাকুরমা অসুস্থতার জন্য পাঁচদিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। প্রশাসনকে সমস্যার কথা জানিয়েও কোনও কাজ হয়নি। অসুস্থ অবস্থাতেই ওঁকে টোটো করে এখানে আনতে হয়েছে। অনেকেই এই দৃশ্য দেখে অব্যবস্থাকে দায়ী করলেন। ওই শুনানি কেন্দ্রেই এরকম আরও একটি হৃদয় বিদারক দৃশ্যের সাক্ষী রইলেন শুনানিতে আসা মানুষরা। অশীতিপর আরও এক বৃদ্ধ হারু শেখ, তাঁকেও একইভাবে সিঁড়ি দিয়ে তুলে দোতলায় শুনানি কেন্দ্রে হাজির করালেন তাঁর আত্মীয়রা। বৃদ্ধার ছেলে আজমের শেখ বলেন, হয়রানির শেষ নেই। প্রশাসনকে অসুস্থতার কথা জানিয়েও কোনও লাভ হল না। সামান্য নামের ভুলের জন্য আমাদের এই হয়রানি পোহাতে হল। এমন অবস্থায় খারাপ কিছু ঘটে গেলে নিজেদের ক্ষমা করতে পারতাম না। • অসুস্থ বৃদ্ধাকে কান্দি মহকুমা হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে। নিজস্ব চিত্র