দীপন ঘোষাল, রানাঘাট: কাঁখে করে কলসি বোঝাই জল নিয়ে যাচ্ছিলেন ঘরে। এই মানুষটিরই সরকারি নথিতে অস্তিত্ব নেই! রানাঘাট শহরের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর নাসরা এলাকার ৭০ ছুঁই ছুঁই ছায়ারানি রায় নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক তালিকায় অস্তিত্বহীন। ফলে এসআইআর ফর্ম আসেনি তাঁর বাড়িতে। অথচ শুধু সাম্প্রতিক অতীতে কেন, ২০০২ সালেও ভোটার ছিলেন তিনি। শহরের আদি বাসিন্দা হয়েও স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশনের পর তাঁকে কি ছুটতে হবে নাগরিকত্বের সন্ধানে? প্রশ্ন পরিবারের।
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০০২ সালে ছায়ারানির নাম ভোটার তালিকায় ছিল। তারপর প্রায় ২ দশক ধরে একাধিক নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন তিনি। সর্বশেষ ২০২২ সালের পুরসভা নির্বাচনেও বুথে গিয়েই ভোট দিয়েছেন। ব্যাস, এরপর থেকেই কার্যত নির্বাচন কমিশনের নথি থেকে যেন কর্পূরের মতো উবে গেলেন বৃদ্ধা ছায়ারানি। সাধারণত মৃত ভোটারের নাম বাদ যায় ভোটার তালিকা থেকে। জীবিত ছায়ারানি আজ কাগজেকলমে ‘মৃত’। পরিবারের অভিযোগ, নিশ্চয়ই ছায়ারানির নাম ভোটার তালিকা থেকে সরাতে ‘মৃত’ বলে চিহ্নিত করা হয়। এরপর একাধিক বার আবেদনেও আর নাম ওঠেনি। যার ফলে এসআইআর ফর্মও আসেনি ওই বৃদ্ধার। অথচ ২০০২ সালের ৮১ রানাঘাট পশ্চিম বিধানসভার ১০৬ নম্বর অংশের ৬৬০ ক্রমিক সংখ্যায় স্পষ্ট নাম রয়েছে তাঁর। ভোটার কার্ডের নম্বর, WB/12/081/312499। তিনি বলেন, কয়েক দশক ধরে বসবাস করছি রানাঘাটে। কিন্তু এখন নিজেই বুঝতে পারছি না আমি নির্বাচন কমিশনের কাছে জীবিত না মৃত! কেন আমার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, জানি না। আমি যথেষ্ট আতঙ্কে রয়েছি। এই বয়সে কি আমাকে এখন নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে?
বৃদ্ধা ছায়ারানির তিনটি বাড়ি পরেই থাকেন ওই বুথের বিএলও সরজিত বিশ্বাস তিনি বলেন, ছায়ারানি দেবী আমার প্রতিবেশী। এটা ঠিক যে, তিনি দীর্ঘদিন এখানকার বাসিন্দা। কিন্তু আমার কাছে ওঁর ফর্ম আসেনি। তাই দিতে পারিনি। ওঁর বাকি পরিজনদের এসেছে।
এদিকে, ইতিমধ্যেই এই ঘটনাটি ঘিরে রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে। রানাঘাট পুরসভার পুরপ্রধান তথা তৃণমূল নেতা কোশলদেব বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, ভিন্ন মতাদর্শের সমর্থকদের সুচিন্তিতভাবে বাদ দেওয়ার রাজনৈতিক চক্রান্ত চলছে। বহু জীবিত মানুষকে পরিকল্পনা করে মৃত বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং হবে বলে আমাদের আশঙ্কা। বিজেপি বৈধ ভোটারদের বাদ দিতে চাইছে। অপরদিকে, পাল্টা রানাঘাট উত্তর-পশ্চিমের বিজেপি বিধায়ক পার্থসারথি চট্টোপাধ্যায় দাবি করেন, এসআইআর পদ্ধতি চালু হওয়ার কারণেই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। পুরনো নথি প্রমাণ হিসেবে থাকলে আবার নাম উঠবে। কারও নাম বাদ যাবে না। তৃণমূলের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গিয়েছে। তাই আজেবাজে কথা বলছে। যদিও এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের প্রশ্ন, একবিংশ শতাব্দীর ডিজিটাল যুগে নাগরিকের পরিচয় নথি এত সহজে বদলে গেলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়। জেলা প্রশাসনের তরফে তদন্তের আশ্বাস মিললেও দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হলে এই ঘটনা বড়সড় প্রশাসনিক ব্যর্থতার উদাহরণ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছে নাগরিক সমাজ। ছায়ারানি রায়।-নিজস্ব চিত্র