সংবাদদাতা, ঘাটাল: বিশ বছরে বদলেছে অনেক কিছু। গঙ্গা দিয়ে বয়ে গিয়েছে অনেক জল। এই বিশ বছরেই মেদিনীপুরের খড়ার শহরের উদয়গঞ্জের বাসিন্দা নিতাই মাজির জীবনটা ওলট-পালট হয়ে গিয়েছে। এতগুলো বছর বাদে বাড়ি ফিরলেও সংসার তাঁকে আপন করে নিতে পারেনি। বাড়িতে ঠাঁই না হওয়ায় শেষমেশ রাস্তার পাড়ে যাত্রী প্রতীক্ষালয়ে দিন কাটাচ্ছেন সত্তরে পা দেওয়া নিতাইবাবু। গত ১৩ আগস্ট বাড়ি থেকে ওই বৃদ্ধকে বের করে দেওয়া হয়। এদিকে যাত্রী প্রতীক্ষালয়ের একাংশ দখল করে রয়েছেন বলে স্থানীয় লোকেরাও তাঁকে কটু কথা বলছেন।
দুপুরে মা ক্যান্টিনের পাঁচ টাকার ভাত, তরকারি ও পথচলতি লোকের দেওয়া মুড়ি-রুটি খেয়েই দিন কাটছে ওই বৃদ্ধের। যদিও নিতাইবাবুর পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, ভরা সংসার ছেড়ে দ্বিতীয় বিয়ে করে দীর্ঘদিন ধরে বেপাত্তা ছিলেন ওই ব্যক্তি। শেষে কোথাও ঠাঁই না পাওয়ায় পুরনো সংসারেই ফিরে এসেছেন। কিন্তু ওই ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ অভিভাবকের প্রতি ছেলে, মেয়ে, স্ত্রীর আর কোনও সহানুভূতি নেই।
স্থানীয় ও নিতাইবাবুর পারিবারিক সূত্রে জানা গিয়েছে, সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে নিতাইবাবুর এক সময় খড়ার শহর ও তার আশপাশের এলাকায় বেশ নাম-ডাক ছিল। সেই সময় তিনি ছাত্রছাত্রীদের গান শিখিয়েই সংসার চালাতেন। পরে খড়ারের পার্শ্ববর্তী গ্রাম ইড়পালায় কৃষ্ণা চট্রোপাধ্যাকে গান শেখাতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন নিতাইবাবু। পরে ছাত্রীকে বিয়েও করেন। প্রায় ৫০ বছর বয়সে বাড়িতে স্ত্রী, পুত্র, কন্যারা থাকা সত্ত্বেও ফের বিয়ে করার কারণে সংসারে প্রচুর অশান্তি হয়। নিতাইবাবুর কথায়, বাড়ি ছেড়ে কলকাতায় কৃষ্ণাকে নিয়ে চলে যাই। কিন্তু বছর পনেরো সংসার করার পরে কৃষ্ণা ব্রেনস্ট্রোকে মারা যান। এরপরও বছর পাঁচেক কলকাতায় একাই ছিলাম। বর্তমানে নিতাইবাবু সত্তর পেরিয়েছেন। বয়সজনিত কারণে গানও ভালো শেখাতে পারেন না। নানান রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। তাই তিনি কলকাতার সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে গত জুন মাসে উদয়গঞ্জে নিজের বাড়ি ফিরে আসেন। বর্তমানে নিতাইবাবুর ছেলে পেশায় ইঞ্জিনিয়ার, দুই মেয়েরও বিয়ে হয়ে গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাবার বাড়ি ফেরাটা পরিবারের সদস্যরা মেনে নিতে পারেননি বলেই পড়শিরা জানান। নিতাইবাবুর স্ত্রী চায়নাদেবী বলেন, গানের ছাত্রীকে বিয়ে করে ভরা পরিবারটা ভাসিয়ে দিয়ে দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো সবাইকে ছেড়ে দিয়ে চলে গিয়েছিলেন। সেই দিনগুলি কী করে কেটেছে, খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজনও মনে করেননি। তাই ওর সঙ্গে আর কোনও সম্পর্ক রাখতে চাই না।
এদিকে জীবনের উপান্তে এসে নিতাইবাবুর প্রতিক্রিয়া, আমার কৃতকর্মের জন্য ওদের লাঞ্ছনা মেনেই নিয়েছিলাম। কিন্তু মঙ্গলবার আমাকে বাড়ি থেকেই বের করে দেওয়া হয়েছে। বাড়ি ঢুকতে না পেরে বীরসিংহ-খড়ারে রাস্তার পাশে যাত্রী প্রতীক্ষালয়েই দিন কাটাচ্ছি। এখানেই হয়ত জীবনটা শেষ হয়ে যাবে। -নিজস্ব চিত্র