সভ্য সমাজে প্রিয়জনের হাতে চকচকে কাগজের মোড়কে উপহার তুলে দেওয়ার চল রয়েছে। নরেন্দ্র মোদির সরকার তেমনই ঝকঝকে পাতাজোড়া বিজ্ঞাপন দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে শুক্রবার থেকে গোটা দেশে চারটি শ্রম কোড চালু করার মধ্য দিয়ে এক নতুন যুগের সূচনা হল। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে একসময় চালু ছিল ৪৪টি শ্রম আইন। তার মধ্যে ১৫টি আগেই বাতিল হয়ে গিয়েছিল। বাকি ২৯টি আইনকেই এক ছাতার তলায় এনে চারটি শ্রম কোড তৈরি করা হয়েছে। যা আসলে ভারতের নতুন শ্রম আইন হিসাবে কার্যকর হল। মোদি জমানায় নোটবন্দি কিংবা কৃষি আইন তৈরির সময়েও এই ‘নতুন’ যুগের সূচনার কথা শোনা গিয়েছিল। এসবের পরিণতি কী হয়েছে, তা সকলেরই জানা। শ্রম কোড কার্যকর করতে গিয়েও এমন সব গ্যারান্টির কথা বলা হয়েছে যা শুনলে মনে হতে পারে, স্বাধীন ভারতে এর চেয়ে ভালো শ্রমিক স্বার্থরক্ষাকারী সরকার আগে আসেনি। এক্স হ্যান্ডেলে প্রধানমন্ত্রী লিখেওছেন, স্বাধীন ভারতে কর্মীদের জন্য সবথেকে দৃষ্টান্তমূলক সংস্কার হল এই নতুন শ্রম কোড। কী সেই সংস্কার? কেন্দ্রের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক জানিয়েছে, নতুন শ্রম কোড-এ সকলের জন্য ন্যূনতম ও সময়মতো মজুরি, বাধ্যতামূলক নিয়োগপত্র, মহিলাকর্মীদের সমান সুযোগ ও বেতন, ৪০ কোটি শ্রমিকের নিশ্চিত সামাজিক সুরক্ষা, নির্দিষ্ট মেয়াদের চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের এক বছর কাজের পরেই গ্র্যাচুইটি, ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পে শ্রমিকের ১০০ শতাংশ স্বাস্থ্যসুরক্ষার ব্যবস্থা ইত্যাদি রয়েছে। এ সবই নাকি বেসরকারি শিল্প-সংস্থার মালিকরা দিতে বাধ্য থাকবেন।
কিন্তু এ আসলে মোদি সরকারের নতুন ফাঁদ। ঘুরপথে মালিকশ্রেণির হাতে শ্রমিক-কর্মচারীর ন্যূনতম অধিকার ও সুরক্ষা ইচ্ছেমতো কেড়ে নেওয়ার আইনি সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। কীরকম? এই শ্রম কোড তৈরি হয়েছে অসংগঠিত শ্রমিকদের বাদ রেখে, যাঁরা দেশের মোট শ্রমিকদের ৯২ শতাংশ। এ দেশে রোজগেরে মানুষদের ৪৬ শতাংশ স্বনিযুক্তি কর্মী, ১৫ কোটি কৃষি মজুর, অন্তত ৫ কোটি গৃহশ্রমিক। শ্রম কোডে এঁদের কথা সেভাবে নেই। এছাড়াও দোকান, শোরুমে কর্মরত কয়েক কোটি নারী-পুরুষ নতুন শ্রম কোডে উপেক্ষিত। শ্রম কোডে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের অধিকার, ত্রিপাক্ষিক আলোচনা, শ্রমিক সুরক্ষার হাল পরিদর্শনের ব্যবস্থা শিথিল করা হয়েছে। আবার, ৩০০ জন কর্মীর উৎপাদন সংস্থায় লকআউট ঘোষণা বা ব্যবসা গোটাতে আর সরকারের সায় লাগবে না। সংখ্যাটা আগে ছিল ১০০। পুরোনো আইনে কাজের সময় ছিল ৮ ঘণ্টা। এখন ১২ ঘণ্টা কাজের পথ খোলা হয়েছে। পুরোনো আইনে শ্রমিক বলতে কারখানা, খনি, পরিবহণ, নির্মাণ, পরিষেবা, কৃষিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করা কর্মীদের স্বীকৃতি দেওয়া হতো। নতুন শ্রম কোডে বলা হয়েছে, যদি কোনও কর্মীর মাসিক বেতন ১৮ হাজার টাকার বেশি হয়, তাহলে সে আর ‘শ্রমিক’ থাকবে না। তাঁকে ‘সুপারভাইজার’ হিসাবে চিহ্নিত করা হতে পারে। ফলে এঁরা শ্রম-সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হবেন। সবচেয়ে বড়ো কথা হল, তাঁদের ন্যূনতম বেতন কত হবে— তা মালিকপক্ষের মর্জির উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
ফলে আগেই এই শ্রম কোড মানতে রাজি হয়নি পশ্চিমবঙ্গ সহ কেরল, তামিলনাড়ু, কর্ণাটকের মতো একাধিক রাজ্য। এ রাজ্যের সরকার আগেই জানিয়ে দিয়েছিল, সংবিধানে শ্রম রয়েছে যুগ্ম তালিকায়। অর্থাৎ কেন্দ্রের পাশাপাশি যে কোনও রাজ্য শ্রম-সংক্রান্ত আইন তৈরি করতে পারে। আর শ্রম কোড তৈরি করতে হলে সব রাজ্যের ঐকমত্য দরকার। তা না করে গোটা দেশের জন্য নতুন ব্যবস্থা কী করে কার্যকর হতে পারে? আসলে মোদি সরকার কোনও নিয়মেরই তোয়াক্কা করছে না! রাজ্যের বক্তব্য, শ্রম কোডে সুনিশ্চিত বেতনের কথা বলা হলেও ন্যূনতম বেতন গত আট বছর সংশোধনই হয়নি। কর্মী-শ্রমিকদের বেতন ঠিক করার ভিত হল ‘ফ্লোর ওয়েজ’। বর্তমানে যা দৈনিক ১৭৮ টাকা। মাসে পাঁচ হাজার টাকারও কম। এতে কোনও পরিবার চালানো সম্ভব নয় জেনেও মোদি সরকার ন্যূনতম বেতন বাড়ায়নি। শুধু এ রাজ্যের সরকার নয়, দেশের প্রায় সব বিরোধী কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নও চার শ্রম কোডের তীব্র বিরোধিতা করেছে। প্রতিবাদে একাধিকবার দেশজুড়ে শিল্প ধর্মঘট হয়েছে। আগামী ২৬ নভেম্বর ফের আন্দোলনের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন হল, এইসব বিরোধিতায় সরকার কি আদৌ পিছু হটবে? সম্ভাবনা কম। কারণ দেশের বেশিরভাগ রাজ্য ইতিমধ্যে শ্রম কোড অনুযায়ী রুল তৈরি করে ফেলেছে। তাছাড়া কৃষি আইনের প্রতিবাদে গোটা দেশে আন্দোলনের যে ঝাঁঝ দেখা গিয়েছিল, শ্রম কোড বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে তা এখনও অনুপস্থিত। ফলে কেন্দ্র আন্দোলনের চাপে তিন কৃষি আইন বাতিল করতে বাধ্য হলেও শ্রম কোড বাতিলের সম্ভাবনা কম। কেন্দ্রের মনোভাবেই স্পষ্ট, যতই আপত্তি থাক, এক্ষেত্রে তারা ‘আইন’ মানতেও নারাজ। তাই ঐকমত্য না হওয়া সত্ত্বেও রাজ্যগুলির উপর তা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হল। সুতরাং নতুন আইনে শ্রমিকদের যতই সর্বনাশা হোক, নরেন্দ্র মোদি সরকার তার লক্ষ্যে অবিচল।