সুকান্ত বসু, কলকাতা: পৌরাণিক মতে, নীলকণ্ঠ পাখি দশমীর দিন কৈলাসে মহাদেবের কাছে গিয়ে বার্তা জানায়, ‘মা দুর্গা মর্ত থেকে শ্বশুরবাড়ির পথে রওনা হয়েছেন।’ কিন্তু এর বাইরেও ধর্মীয় ও শাস্ত্রবিদরা মনে করেন, মহাদেবের বার্তাবাহক নীলকণ্ঠকে দেখলে মনস্কামনা পূর্ণ হয়। ঘটে পাপমুক্তি। কিন্তু এখন সে পাখি ওড়ানো নিষিদ্ধ। তাই দুর্গার নিরঞ্জনের সময় প্রতীক হিসাবে মাটির অথবা শোলার তৈরি নীলকণ্ঠ পাখি দুর্গার নিরঞ্জনে জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। শাস্ত্রবিদদের মতে, ওই প্রতীক নীলকণ্ঠ দর্শনেও ইচ্ছাপূরণ ঘটে। সংসারে শুভ প্রভাব পড়ে। অবশ্য শাস্ত্রবিদরা এ বিষয়ে নানারকম মত প্রকাশ করেন।
স্বামী জ্ঞানলোকানন্দ জানিয়েছেন, নীলকণ্ঠ পাখির মাহাত্ম্য অসীম। কথিত, রামচন্দ্র স্বয়ং রাবণ বধের আগে সে পাখি দর্শন করেছিলেন। তারপর তাঁর জয় হয়। তাই আমরা এই পাখিকে শুভযাত্রার প্রতীক হিসাবে চিহ্নিত করে থাকি।’ স্বামী সারদাত্মানন্দ জানান, দশেরা ও দশমীর দিন নীলকণ্ঠ দর্শনে শুভফল মেলে। আদিকাল থেকে এই ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে আজও মানুষ প্রতীকরূপে হলেও নীলকণ্ঠ দর্শন করেন। হিন্দু পুরাণ বলে, এ পাখি বিজয় ও শুভকামনার প্রতীক। শিক্ষাবিদ দীপক দাশগুপ্তের মতে, নীলকণ্ঠকে অনেকে শুভযাত্রার প্রতীকও বলে থাকেন। একসময় গ্রামবাংলায় দুর্গাকে বিসর্জন দেওয়ার পর নীলকণ্ঠ পাখি উড়িয়ে তবেই বাড়ির মেয়েরা সিঁদুর খেলায় মাততেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, এতে সংসারের মঙ্গলসাধন হয়।
গাছ নিয়েই যাঁর কাটে দিনের একটা দীর্ঘ সময় সেই গাছ পাগল সত্যরঞ্জন দলুই বলেন, ‘একসময় শহরের বিভিন্ন গাছে নীলকণ্ঠ পাখির দর্শন মিলত। কিন্তু নগরোন্নয়নের নামে চারদিকে এখন কংক্রিটের জঙ্গল। ফলে সে পাখির দেখা আর মেলে না। তাই দুর্গার নিরঞ্জনের জন্য পুণ্যলাভের আশায় বনেদি বাড়িগুলি পটুয়াদের কাছ থেকে মাটির নীলকণ্ঠ তৈরি করান।’ শিক্ষিকা রাবেয়া সরকার বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি নীলকণ্ঠ দর্শনে শুভ ফল পাওয়া যায়। কিন্তু আক্ষেপ এখন আর এ পাখি দেখতে পাই না। এই পাখি ঘিরে আছে নানা গল্প। তাই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে মাটির নীলকণ্ঠ দর্শন করি কোনো বনেদি বাড়িতে গিয়ে। সেখানেই নিবেদন করি নিজেদের আশা‑প্রত্যাশা।’