নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: গত বছর পটপরিবর্তন হয়েছে বাংলাদেশে। হাসিনা প্রশাসনের পতনের পর তদারকি সরকারের দায়িত্ব নিয়েছেন মহম্মদ ইউনুস। অভিযোগ, তারপর থেকে পদ্মাপারে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের বহর বেড়েছে। বাদ যায়নি শারদোৎসবও। একাধিক মন্দির ও পুজো প্যান্ডেলে হামলা চলেছিল। তাতে মুখ পোড়ে ইউনুস প্রশাসনের। এবার তাই ড্যামেজ কন্ট্রোলে তৎপর বাংলাদেশের তদারকি সরকার। তড়িঘড়ি পুজোর অনুদান প্রায় ১কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। পুজোর সংখ্যা বৃদ্ধির পরিসংখ্যানও ভাবমূর্তি বাঁচানোর হাতিয়ার করছে তারা। কিন্তু তাতেও আশ্বস্ত হতে পারছেন না হিন্দুরা। কিন্তু, কেন? স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি মন্দির ও মণ্ডপে প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে উদ্বেগ বাড়িয়েছে ‘সম্প্রীতি যাত্রা’ নামে এক সামাজিক প্ল্যাটফর্মের রিপোর্ট। তারা জানিয়েছে, রাজধানী ঢাকা সহ ৫টি জেলা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এবং বিপদের গন্ধ রয়েছে রয়েছে ২৪টি জেলায়। কীসের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে এই রিপোর্ট? সদস্যদের বক্তব্য, ২০১৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনের একাধিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত পুজো ও অন্যান্য সময়ে পুজোমণ্ডপ, শোভাযাত্রার রুট বা সংখ্যালঘু বাড়িঘরে হামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে এই ঝুঁকির মানচিত্র তৈরি হয়েছে। ফলে এবারের শারদোৎসব কতটা শান্তিপূর্ণ হবে তা নিয়েও রয়েছে সংশয়।
গত শনিবার দুর্গাপুজোর নিরাপত্তা, অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর এবং ‘বৈষম্যমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণে রাষ্ট্রের করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করেছিল বাংলাদেশ সনাতন পার্টি। সেখানে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সুমনকুমার রায় বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর এ দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বৈষম্যমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, অতীতের যে কোনও সরকারের চেয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংখ্যালঘুদের উপর নির্মম অত্যাচার বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে পুজোয় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সহ তিন দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণার দাবি জানান সুমন। বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের শীর্ষকর্তা পলাশকান্তি দে বলেন, কয়েক দিনের মধ্যে ছ’টি জেলায় দুর্গাপ্রতিমার উপর আক্রমণ হয়েছে। কিন্তু, সরকার নীরব। এই আবহে দোষীদের শাস্তির দাবি তুলেছেন ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু বিষয়ক সম্পাদক মকবুল হোসাইন। তাঁর মতে, পুজোমণ্ডপে কেউ অশান্তি করলে তাদের শাস্তি দিতে হবে। সুর চড়িয়েছেন ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষক ফোরামের সভাপতি মহম্মদ নাসিরউদ্দিন খানও। বলেন, পুজোয় নিরাপত্তার বিষয়টি দাবি নয়, এটি অধিকার। বর্তমান পরিস্থিতি বদলাতে গণতন্ত্র ফেরানোর বার্তা দিয়েছেন হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান তপন চন্দ্র মজুমদার।
উৎসবের মরশুমে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়লেও সরকার অনুদান বৃদ্ধির ঢালাও প্রচার করছে। ইউনুস সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের উপদেষ্টা জাহাঙ্গির আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, এ বছর দুর্গাপুজোর অনুদান ৪ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ কোটি করা হয়েছে। অন্যদিকে, পুজোর সংখ্যা বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশ পুজো উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর। তিনি জানান, এ বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৩৫৫টি মণ্ডপ ও মন্দিরে দুর্গাপূজা আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্যে ঢাকা শহরে ২৫৮টি মণ্ডপ ও মন্দিরে মাতৃআরাধনা হচ্ছে। তারপরও প্রশ্ন থাকছে, সবকিছু শান্তিপূর্ণ হবে তো? ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’, শেখ হাসিনার সেই স্লোগান কি আর শোনা যাবে?