নিজস্ব প্রতিনিধি, চুঁচুড়া: বাঙালির প্রাণের উৎসব দুর্গোৎসব। তাই অনেক জায়গাতেই পুরাণ নয়, প্রাণের টানেই শতাব্দীর পর শতাব্দী পার করে দুর্গা পুজো পেয়ে আসছেন। ফলে দেবীকে ঘিরে বিভিন্ন ব্যাখ্যাহীন ঘটনার ঘনঘটা। হুগলির ভাঙন কবলিত গঙ্গাপাড়ের বলাগড়ের সেনবাড়ির দুর্গাপুজো ঘিরেও আছে তেমনই নিবিড় কথকতা। জনশ্রুতি, মনসার স্বপ্নাদেশে শুরু হয়েছিল জিরাটের সেনবাড়ির পুজো। প্রায় ৩৩১ বছর আগে সেই স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন সেনদের পূর্বপুরুষ অশ্বিনী সেন। তাঁকে দেবী মনসা বলেছিলেন, আমার বোন ও দিদিদের পুজো করতে হবে। তারপর মনসার মন্দিরে শুরু হয় সপরিবার দুর্গার পুজো।
দেবী লক্ষ্মী বা সরস্বতীর মনসার বোন হওয়া তাও সম্ভব, কিন্তু দুর্গা? না তিন শতাব্দী পার করে আসা ইতিহাসের সেই বিরল লগ্নের নিখুঁত তথ্য আজ মেলে না। শুধু মিহিন চাদরের মতো ভেসে থাকে জনশ্রুতি-স্বপ্নাদেশ আর এক প্রাণবন্ত পুজো। সন্দেহ নেই, একদা বণিক পরিবারের সেই পুজোর সাবেক জৌলুস আজ অস্তমিত। কিন্তু পুজো আছে বহাল তবিয়তে। আছে নিষ্ঠার অমলিন স্বাদ, ঝুরি মেলে আছে অসংখ্য কাহিনি। সেনবাড়ির উত্তরপুরুষ পার্থ সেন বলেন, আমাদের দেবীমণ্ডপ ছিল মনসার। তারই স্বপাদেশে সেই মন্দিরে চালু হয়েছিল দুর্গার পুজো। বংশপরম্পরায় সেই কাহিনি আমরা শুনে আসছি। আজ জনশ্রুতি ও স্বপ্নাদেশের থেকে বেশি জাগ্রত হয়ে আছে নিয়মনিষ্ঠার এক পুজো। সাবেক গাম্ভীর্যকে পুজোর চারদিন আমরা সর্বোতভাবে ধরে রাখি।
বাঙালির উমাপুজোতে নানা বিরলের সমাহার আছে। জিরাটের সেনবাড়ির পুজোকে তেমনই বিরল তালিকায় রাখেন অনেক পুজো গবেষক। তাঁদের মতে, মনসার নির্দেশে দুর্গাপুজোর পৌরাণিক যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা মেলে না। কিন্তু উমা বাঙালির ঘরের মেয়ে। তাই নানা সাজে তিনি সেজে এসেছেন বাঙালির ঠাকুরদালানে। চুঁচুড়ার আঞ্চলিক ইতিহাসের চর্চাকার সপ্তর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বলাগড়ের জিরাটের বেনজির পুজোকেও তাই সেই ধারাতেই ধরা উচিত। কারণ বাঙালির কাছে দুর্গোৎসব আবেগের স্বাভাবিক প্রকাশ।
১১১০ বঙ্গাব্দের কোনো এক সকালে শুরু হয়েছিল জিরাটের বেনজির দুর্গাপুজোর সলতে পাকানো। সেদিন ভোরে গঙ্গাস্নানে গিয়েছিলেন জিরাটের ধনাঢ্য বণিক অশ্বিনী সেন। সেই আধো অন্ধকারে গঙ্গার বহতা প্রবাহে পেয়েছিলেন শিলাখণ্ড। কিছু একটা ভেবে সেই শিলাখণ্ড তিনি সঙ্গে নিয়ে আসেন। রাতেই আসে মনসার স্বপ্নাদেশ। গড়ে ওঠে মন্দির। তারপর ফের স্বপ্নাদেশ। এবারও দেবী মনসা। তিনি অশ্বিনী সেনকে বলেন, আমার বোন ও দিদি’দের পুজো করতে হবে। সেই শুরু এক বিরল দুর্গাপুজোর। বলাগড়ের গঙ্গা গত ৩০০ বছরে বহুবার বাঁক বদল করেছে। কিন্তু সেনবাড়িতে দেবী উমার ভদ্রাসন বদল হয়নি। নিজস্ব চিত্র