সংবাদদাতা, কাটোয়া: বনেদি বাড়ির পুজোর সঙ্গে হামেশাই জুড়ে থাকে নানা অবাক করা প্রথা ও কাহিনি। তেমনই এক পুজো কাটোয়ার ঘোড়ানাশ গ্রামের রায়বাড়ির পুজো। এখানে মা দুর্গাকে মন্দিরের পিছনে গাছের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। বিসর্জনের সময় পাটকাঠির মশাল জ্বেলে পাশের আমডাঙা গ্রামে বুড়োশিবের সঙ্গে দেখা করাতে চার কিমি দৌড়ে নিয়ে যাওয়া হয় প্রতিমাকে।
কাটোয়া-২ ব্লকের জগদানন্দপুর পঞ্চায়েতের অন্তর্গত ঘোড়ানাশ গ্রামে বাস রায়েদের। রায়বাড়ির কর্তা ভবানন্দ রায় ছিলেন নবাব আলিবর্দি খাঁর দেওয়ান। তিনিই ঘোড়ানাশের জমিদার। সেই ভবানন্দ রায়ই বাড়িতে দুর্গাপুজো শুরু করেন। রায়বাড়ির দুর্গা ‘খেপিমা’ নামে পরিচিত। তবে কেন মাকে এই নামে ডাকা হয়, তা পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের অজানা। তাঁরা জানান, নবাব আলিবর্দি খাঁয়ের আমলে ১৭৫১ খ্রিস্টাব্দে এই পুজোর শুরু। সেই সময়ে নাকি নবাব আলিবর্দি খাঁ স্বয়ং গ্রামে এসেছিলেন। প্রায় ৩০০ বছর ধরে খেপিমা নামেই রায়বাড়ির দুর্গা পূজিত হয়ে আসছেন। এই পুজোর অনেক অবাক করা প্রথা রয়েছে। রায়বাড়ির সদস্য প্রবীণ সেবাইত মহিমচন্দ্র রায় শোনালেন সেইসব কাহিনি।
তিনি জানান, পুজোর শুরু থেকে দেবীকে দড়ি দিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখার রীতি ছিল না। বাংলার ১৩৪৯ বঙ্গাব্দ ও ইংরাজির ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে নাকি একবার পুজোর সময় ঝড় হয়। তখন তালপাতার ছাউনি দেওয়া মন্দির ছিল। ঝড়ে যাতে কোনও ক্ষতি না হয়, তারজন্য প্রতিমাকে দড়ি দিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখার আদেশ দিয়েছিলেন দেবী স্বয়ং। সেই সময়ে মন্দিরের পিছনে একটি ডুমুর গাছ ছিল। মায়ের বেদির পিছনে মন্দিরের দেওয়ালে একটি ছিদ্র দিয়ে দড়ি ঢুকিয়ে সেই গাছের সঙ্গে প্রতিমা বেঁধে রাখা হতো। সেই ডুমুর গাছ আজ আর নেই। বদলে একটি দেবদারু গাছের সঙ্গে প্রতিমাকে বেঁধে রাখা হয়। পুজো শুরু হয় প্রতিপদ থেকে। সেদিন থেকেই ঘট এনে ছাগবলি দিয়ে পুজো শুরু হয়ে যায়। মায়ের ভোগ বানাতে ব্যবহার করা হয় মন্দিরের পিছনের পুকুরের জল। তবে মায়ের ঘট ভরা হয় লক্ষ্মীসাগর পুকুর থেকে। মায়ের ভোগে দেওয়া হয় চিংড়ি, পুঁই ভিজে ভাত সহযোগে। আর থাকে বলির পাঁঠার মেটে চচ্চড়ি দিয়ে। এটাই নাকি রীতি। খেপিমার বিসর্জনেও আছে নানা নিয়ম। পাটকাঠির মশাল জ্বেলে চার কিমি দ্রুতগতিতে ছুটে গ্রামের দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত ব্রাহ্মণী নদীতে বিসর্জন দেওয়া হয়। তবে তার আগে পাশের আমডাঙা গ্রামে বুড়োশিবের সঙ্গে মাকে দেখা করানো হয়। মায়ের গায়ের রং শিউলি ফুলের বোঁটার রঙে করতে হয়। ঘোড়ানাশ গ্রামে খেপিমার পুজো দেখতে ভিড় করেন আশপাশের বহু গ্রামের মানুষ। -নিজস্ব চিত্র