Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

স্বপ্ন আমার কবিতা

পরপর তিনটে ক্লাস শেষ হল। টিচারস রুমে এলেন সুমন দত্ত। নাইন, টেন আর ইলেভেনের ক্লাসে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল আর জীবনানন্দের কবিতা পড়িয়ে মনটা কাব্যময় হয়ে আছে।

স্বপ্ন আমার কবিতা
  • ১৪ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

মীনাক্ষী সিংহ: পরপর তিনটে ক্লাস শেষ হল। টিচারস রুমে এলেন সুমন দত্ত। নাইন, টেন আর ইলেভেনের ক্লাসে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল আর জীবনানন্দের কবিতা পড়িয়ে মনটা কাব্যময় হয়ে আছে। মনে পড়ল কলেজে পড়ার সময় নিজে কবিতা লেখা শুরু করেছিলেন। যেমন সব বাঙালি তরুণ-তরুণী কবিতায় নিমগ্ন হয়। নির্মাণ হয়, সৃষ্টি হয় না। তাই সবাই কবি নন, কেউ কেউ কবি।
এমএ পড়ার সময় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে, সবুজ ঘাসের মাঠে বসে বন্ধু-বান্ধবীদের সেই কবিতার আসর। স্মৃতি দূরবিনে চোখ দিয়ে দেখলেন তাঁর তিনজন এককালের সহপাঠী আজ কবি হিসেবে পরিচিত, খ্যাত। শ্যামল বসাক, তরুণ চৌধুরী আর একজন? থমকে দাঁড়াল স্মৃতি। ইউনিভার্সিটির করিডোরের একপাশে দাঁড়ানো শ্যাম কান্তিময়ী কোনও স্বপ্নমায়া। আশ্চর্য, আজ এই প্রান্তবেলায় এখনও স্বপ্ন, এখনও স্মৃতি এখনও কবিতা!
আজ বিশ্ব কবিতা দিবস। ছাত্ররা উদ্যোগ নিয়েছে টিফিনের পর আজ পাঠ নয়— কবিতা পাঠের আসর বসবে। নতুন প্রধান শিক্ষক কাব্যরসিক তিনি এই প্রস্তাবে সমর্থন জানিয়েছেন। সুমনবাবু সিনিয়র শিক্ষক-প্রবীণ। আগামী বছর অবসর নেবেন, তিনি সভাপতি হবেন। ছাত্রদের অনুরোধ। ছাত্ররা স্বরচিত কবিতা পাঠ করবে। সেই সঙ্গে একজন কবিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে প্রধান অতিথি রূপে।
ছাত্রদের ডাকে সভাগৃহে এলেন। দেখে ভালো লাগল সমবেত ছাত্রমণ্ডলী কবিতার আসর ভরিয়েছে। সহকর্মী শিক্ষকরাও এসেছেন। মঞ্চে আসীন প্রধান শিক্ষকের পাশে বসলেন সুমন স্যার। প্রধান অতিথিকে দেখে আনন্দ বিস্ময়ে চমৎকৃত। অতীতদিনের বন্ধু সহপাঠী আজকের বিশিষ্ট কবি শ্যামল বসাক। মুহূর্তে মন চলে গেল অতীতের সরণীতে। শ্যামলও পুরনো দিনের প্রিয় বন্ধুকে দেখে প্রীত। স্মৃতির সরণীতে মানসভ্রমণ শুরু হল দুই বন্ধুর।
প্রধান শিক্ষকের স্বাগত ভাষণ, প্রধান অতিথিকে বরণ করার পর সভার কাজ শুরু। সুমনবাবু সভাপতির আসন থেকে যেন হারিয়ে গিয়েছেন অতীতের পাঠকেন্দ্রে। মুহূর্তেই তাঁর কর্মক্ষেত্র এই স্কুল থেকে মন চলে গিয়েছে তিন দশক আগের ফেলে আসা ক্লাসরুমে— কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের দশ নম্বর ঘরে।
সেকালের বিখ্যাত অধ্যাপকমণ্ডলী ক্লাস নিচ্ছেন, নবীন ছাত্রছাত্রীরা নিবিষ্ট। মনে পড়ল সেযুগের বিখ্যাত কবি-অধ্যাপক শিবপ্রসাদ মিত্র ক্লাসে এসে ছাত্রছাত্রীদের কাছে কবিতা শুনতে চাইছেন। পিনপতনের নিস্তব্ধতার মাঝে শোনা গেল সুরেলা কণ্ঠের কবিতা— ‘শেষের কবিতা’র ‘পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি, / আমরা দুজন চলতি হাওয়ার পন্থী...।’ অধ্যাপক-কবির সস্নেহ প্রশংসায় অভিভূত ছাত্রীটি লজ্জাজড়িত স্মিত হাস্যে নীরব। স্বপ্না বসু সেদিন থেকেই বিশেষ পরিচয়ে চিহ্নিত হয়ে গেল। আবৃত্তির জন্য নয়, জানা গেল সেও নাকি কবিতা লেখে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়াল পত্রিকায় ছাপা হল স্বপ্না বসুর কবিতা, পরে তাদের মুদ্রিত পত্রিকা ‘একতা’-তেও। সেদিনের নবীন কবি যশঃ প্রার্থীদের মধ্যে ছিল আজকের শ্যামল বসাক, তরুণ চৌধুরী, সুমন দত্তও। তারপর—?
সভায় করতালির শব্দে বর্তমানে ফিরে এলেন সুমন স্যার। তাঁর ছাত্ররা কবিতা আবৃত্তি করছে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, বুদ্ধদেব বসুর নির্বাচিত কবিতার পাশাপাশি কিশোর ছাত্ররা স্বরচিত কবিতাও পাঠ করছে। তৃপ্তিতে ভরে উঠল সুমন স্যারের মন। তিনি পেরেছেন এই কিশোরদের মনে কবিতার রস সিঞ্চন করতে। নিজে কবি হিসেবে খ্যাতি পাননি, যদি এরা কেউ পারে—ভেবে তাঁর মন ভরে উঠল।
পাশে বসা পুরনো সহপাঠী, আজকের প্রধান অতিথি কবি শ্যামলের সঙ্গে মৃদু কণ্ঠে আলাপচারিতায় ভেসে এল অতীত দিনের স্মৃতি। চকিত চমকের মতো মনে এল বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে দাঁড়ানো এক শ্যাম কান্তিময়ী কোনও স্বপ্নমায়া। আর তখনই চমক ভাঙল এক ছাত্রের কবিতার উচ্চারণে—
‘স্মৃতি পিপীলিকা তাই পুঞ্জিত করে
অমার রন্ধ্রে মৃত মাধুরীর কণা
সে ভুলে ভুলুক কোটি মন্বন্তরে
আমি ভুলিব না আমি কভু ভুলিব না।’
—সুধীন্দ্রনাথ দলের ‘শাশ্বতী’ কবিতার অমোঘ চরণ। মুহূর্তে তিন দশকের স্মৃতি ফিরে এল।
সেই প্রথমদিনের স্বপ্নার কবিতার মতোই পথ বেঁধে দিয়েছিল— ‘বন্ধনহীন গ্রন্থি’। তারপর দিন, মাস, দু-বছর। কাল প্রবাহে ভেসে যাওয়া জীবন যৌবন।
স্বপ্না আর সুমন তখন বন্ধনহীন গ্রন্থিকে চিরন্তন বন্ধনে চিরায়ু করায় প্রয়াসী। ক্লাসরুম, রাখালদার ক্যান্টিন, কফি হাউস, গোলদিঘির ধারে কেটে গেল দিন।
‘সে কি তোমার মনে আছে,
তাই শুধাতে এলেম কাছে।’
মনে মনে উচ্চারণ করল সুমন, আজকের সুমন স্যার।
তারপর—? তাদের বন্ধনহীন গ্রন্থি একদিন আইনের বন্ধনে স্বীকৃতি পেল। ইউনিভার্সিটির ছোট্ট বন্ধু দলকে সাক্ষী করে স্বপ্না আর সুমনের নতুন পথচলা শুরু হল। সদ্য এমএ পাশ দু’জনের দুঃসাহস ছিল প্রেমের অভীমন্ত্রে, আর সেই মন্ত্রেই যুগল জীবনের যাত্রা শুরু হয়েছিল। সেদিন অভাব-অনটন ছিল, অনিশ্চয়তার ঝুঁকি ছিল— তবুও ভয়কে জয় করার দুঃসাহসে পথচলার অঙ্গীকার করেছিল তরুণ দম্পতি।
স্মৃতি দূরবিনে চোখ রেখে অনেক ঘটনাই ভেসে এল যুগল জীবনের সেই বাঁধন হারা আনন্দ, একসঙ্গে কবিতা পড়া, আর কবিতা লেখার প্রহর যেন কালের সাগর পাড়ি দিয়ে স্মৃতি তরঙ্গ করল। সুমন স্যার যেন এক অতীত স্বপ্নে মগ্ন। একের পর এক কবিতা পাঠ হচ্ছে, করতালি মুখরিত সভাগৃহে সভাপতি হারানো অতীতের স্বপ্ন সম্ভব চেতনায় আচ্ছন্ন। পাশে বসা কলেজ জীবনের বন্ধু শ্যামলকে দেখেই কি অতীত ফিরে এল? সেদিনের স্মৃতিপাঠে তো শ্যামলের স্বাক্ষরও ছিল। তাই বোধহয় এতদিন পরে এমন আকুলতা।
তাদের নবনীড়ে অভাব ছিল উপকরণের কিন্তু ভালোবাসা ছিল, ছিল স্বপ্ন দেখার সাধ। সারাদিন দু’জনে মিলে টিউশনে ব্যস্ত দিন শেষে ক্লান্ত হয়ে মুখোমুখি একান্তে সঙ্গ সুখ অনুভব।
অনেক চেষ্টার পরে বোলপুরের একটা স্কুলে সহশিক্ষকের পদে বহাল হল সুমন। স্বপ্নাকে ছেড়ে যাওয়ার ভাবনায় মন খারাপ দেখে স্বপ্নাই সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিল, ‘সপ্তাহ শেষে দেখা হবে তো!’ কখনও বা সপ্তাহান্তে বোলপুরে গিয়ে শান্তিনিকেতনের কবিতীর্থে দু’জনের আনন্দভ্রমণ। সেই দিনগুলো সোনার খাঁচায় রইল না! সংবাদ প্রথমে ছিল শুভ। কলকাতার এক পত্রিকা দপ্তরে কাজ পেল স্বপ্না। সেই আনন্দে সেবার শান্তিনিকেতন ভ্রমণ হয়ে উঠেছিল আনন্দ নিকেতন। বসন্ত উৎসবে দু’জনের সেই বাসন্তী পূর্ণিমার স্মৃতি অপার্থিব।

Advertisement

প্রবল করতালির শব্দে চমক ভাঙল সুমন স্যারের। একটি ছাত্র তখন আবৃত্তি করছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা—
‘কেউ কথা রাখেনি’
বুকের মধ্যে চমক— কেউ কথা রাখেনি।
বোলপুর আর কলকাতা— দূরত্ব কতখানি? বোলপুরের এক অনামী বেসরকারি বিদ্যালয়ের গ্রামীণ পরিবেশের পাশে কলকাতার সংবাদপত্রের ঝাঁ চকচকে অফিসের ব্যবধান আসলে অনেক অনেক বেশি। তাই সপ্তাহান্তের দেখাশোনা ধীরে ধীরে কমে এল দু’জনেরই কাজের চাপ, নানা ঝামেলা, ছুটি অপ্রতুল। আর তাই— ‘কাছে থেকে দূর রচিল কেন গো আঁধারে?’
কলকাতার পত্রিকা দপ্তরের নবীনা সাংবাদিক তখন কাব্য জগতেও ধীরে ধীরে আসন পাকা করে নিচ্ছে। তার কবিতা নানা লিটল ম্যাগাজিন, কখনও বা রবিবারের ক্রোড়পত্রে ছাপা হচ্ছে। কবিপক্ষে ডাক পড়ছে নবীনা কবির। তার গ্রাম্য স্কুলের বাংলার মাস্টারমশাই ব্যাকরণ পড়াতে পড়াতে কবিতার ছন্দ হারিয়ে ফেলছে।
সেবার শান্তিনিকেতনে এক উৎসবে স্বপ্না এসেছিল পত্রিকা অফিসের কাজ নিয়ে— সঙ্গে অফিসের কবি বন্ধু প্রদীপ পালিত। সেবার স্কুল বাড়ির ছোট কোয়ার্টারে স্বপ্না আর প্রদীপ তাদের স্বরচিত কবিতা যুগলে আবৃত্তি করে শুনিয়েছিল সুমনকে। সুমন কিন্তু তার অসমাপ্ত কবিতা শোনাতে পারেনি। তার কলম এখন ছাত্রদের ব্যাকরণ খাতার ভুল সংশোধন করছে— কেবল কবিতার চরণ খুঁজে পাচ্ছে না অন্তমিল।

কাব্যপাঠের সভা শেষ হল। এবার সভাপতির ভাষণ। সুমন স্যার তাঁর সুচারু সমাপ্তি ভাষণ দিলেন। কবি শ্যামল বসাককে নিয়ে মুগ্ধ ছাত্ররা অটোগ্রাফের খাতা ভরাচ্ছে।
যাওয়ার বেলায় শ্যামল অনেক পুরনো দিনের কথা মনে করিয়ে দিল— অনেক আধভোলা সেই কান্না হাসি। অনেক স্মৃতি রইল অনুক্ত। আজ সুমন গ্রামীণ বিদ্যালয় নয়, নামী সরকারি স্কুলের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক— কিন্তু কবিতা তার জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছে, হারিয়ে গিয়েছে স্বপ্ন দেখার প্রহর। নিঃসঙ্গ একক জীবনে সুমন যেন রবীন্দ্রনাথের ‘একরাত্রি’র সেই নায়ক, যার স্বপ্ন অধরা হয়ে রইল। যাওয়ার সময় শ্যামল বলল—
‘একটা খবর আছে। জানিস তো স্বপ্না এখন কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ওর নতুন বই এবার একটা সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছে। তার প্রকাশনা উৎসবের বিরাট আয়োজন করেছিল স্বপ্না ও প্রদীপ। বুঝতেই পারছিস বড় পত্রিকার সমর্থন আছে। জানিস তো ওরা দু’জনে এখন সেলিব্রিটি।’
মৃদু হেসে বন্ধুর দিকে তাকাল সুমন। ব্যাগ থেকে একটা বই বের করে শ্যামল তুলে দিল সুমনের হাতে—
‘তোর জন্য এনেছিলাম।’
হাতে ধরা সুমুদ্রিত কাব্যগ্রন্থ স্বপ্না বসু পালিতের— ‘হারানো সুর’। চমকে উঠলেন সুমন স্যার। মনে পড়ল প্রিয় কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার চরণ
‘সে মিলন অনবদ্য
এ বিরহ অনির্বচনীয়’
উৎসর্গ পত্রে থমকে গেল দৃষ্টি— ‘আমার হারানো দিনকে’ হারানো দিন মনে আছে স্বপ্নার? যা হারিয়ে গিয়েছে, তা আগলে বসেই তো সুমনের বসে থাকা? তাহলে স্বপ্নাও কি হারানো দিনের স্মৃতি নিয়ে কখনও আনমনা হয়? এক মধুর গভীর অনুভবে ভরে উঠল সুমন স্যারের যাপিত জীবনের নিরালা প্রহর। মনে এল এক নবীন কবির সদ্য পড়া কবিতা—
‘যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হতে পারে
সম্পর্ক বিছিন্ন হতে পারে
তবুও ভালোবাসা থেকে যায়
হয়তো আক্ষেপে
নয়তো অপেক্ষায়।’ 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ