Bartaman Logo
১৫ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

রাজনীতি যেন ছায়া না ফেলে!

গুন্ডা দমনে নতুন আইন কার্যকর হয়েছে, তবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের আশঙ্কা। বিরোধীদের অধিকার নিয়ে উদ্বেগ। বিস্তারিত পড়ুন।

রাজনীতি যেন ছায়া না ফেলে!
  • ১৫ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

গুন্ডা দমন সর্বদা স্বাগত। কিন্তু গত সোমবার কার্যকর হওয়া নতুন আইন হাজারো প্রশ্নও তুলে দিয়েছে জনমানসে। মিথ্যা মামলার অভিঘাতে বিরোধীদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হবে না তো? সমাজবিরোধীদের কঠোর শাস্তি হোক, নাগরিক সমাজের শান্তি শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হোক সবাই মনেপ্রাণে চায়। খুন ধর্ষণ রাহাজানি বাড়লে সমাজের সুস্থিতিই নষ্ট হতে বাধ্য। যাঁরা সকাল-সন্ধে কাটমানি খেয়েছেন, বান্ধবীর বাড়িতে কেজি কেজি সোনা দানা গচ্ছিত রেখে ফুলে ফেঁপে উঠেছেন, নদীর চর বুজিয়ে সম্পত্তি বাড়িয়েছেন, কাফে খুলেছেন, সরকার পরিচালনায় গোরু বালি পাচারকেই ধ্যানজ্ঞান করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা হোক। কিন্তু একইসঙ্গে এও সত্যি, মতবিরোধ থাকলেও আদালতে বিচারের আগে কাউকে কোমরে দড়ি বেঁধে প্রকাশ্যে ঘোরানো কিংবা তিন তলার জানলায় দাঁড়ানো কোনো মহিলা এমপিকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া মোটেই সমর্থনযোগ্য কাজ নয়। বিচারের আগেই কাউকে অপরাধী বলে দেগে দেওয়াও অপরাধই। গত দু’মাসে এমন অযাচিত অবাঞ্ছিত ঘটনাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে অহরহ। ডিম ট্রায়াল কোনো সভ্য সমাজে শাস্তির বিধান হতে পারে না। পুলিশও নির্বিকার দর্শক থাকতে পারে না।

Advertisement

নয়া আইন নিয়ে উদ্বেগ এই কারণেই। ভোট রাজনীতিতে জয় পরাজয় ঘুরে ঘুরে আসে যায়। গতকালের বিরোধীই আজকের শাসক। কোনো আইন যদি নিছক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয় তখন তার উদ্দেশ্য নিয়েই সংশয়ের উদ্রেক হওয়া স্বাভাবিক। সব জমানাতেই পুলিশ দলদাস! তার শাসকমুখী আচরণের বিশেষ তারতম্য হয় না। তাই শাসক বললেই সৎ মানুষকে গুন্ডা আর প্রকৃত গুন্ডাকে সাধু বানাতে আইনের রক্ষকদের বিশেষ সময় লাগার কথা নয়। বাম আমলেও আমরা তা প্রত্যক্ষ করেছি। বিগত দেড় দশকে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। এখন আড়াই মাসের গেরুয়া জমানাতেও তার বিশেষ তারতম্য দেখা যাচ্ছে বলে মনে হয় না। সবে শুরু, শেষটা বলবে ভবিষ্যৎ। সেই কারণেই বিনা বিচারে কাউকে এক বছর পর্যন্ত আটকে রাখার যে আইন কার্যকর হয়েছে তা নিঃসন্দেহে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। কারণ এই আইনে গুন্ডার সংজ্ঞা স্পষ্ট নয়। গুন্ডা-সমাজবিরোধীদের প্রসঙ্গে আমরা ওরা কোনো সুস্থ সমাজে কাম্য নয়। তাদের রাজনৈতিক বিভাজনও চলতে পারে না। পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর সামনে তিনতলার জানলার ফাঁক দিয়ে পরপর ছুটে আসছে ঢিল আর ডিম! চোখেমুখে একরাশ বিরক্তি নিয়ে এক বিরোধী মহিলা এমপি সাহেবা তা ভিডিয়ো করছেন। তিনি গেরুয়া মুখাপেক্ষী হলে এমন হত? নিঃসন্দেহে দৃশ্যটা বাংলার সংস্কৃতির পক্ষে মোটেই সুখকর হতে পারে না। আক্রোশ যতই তীব্র হোক পরিবর্তনের বাংলায় এটা খুব ভালো বিজ্ঞাপন হতে পারে না। ডিম ছোড়াও সমান অপরাধ। তাহলে ডিম যারা ছুড়ছে তাদের সবাই গ্রেপ্তার হচ্ছে না কেন? পুলিশের উপর কি কোনো নির্দেশ আছে? মনে রাখতে হবে অভিযুক্তেরও মানবাধিকার আছে। সেই অধিকার আদালত ও আইন স্বীকৃত। 
কড়া আইন এসেছে গুন্ডা দমনে। ভোট পর্ব শেষ হয়ে সরকারের দু’মাস অতিবাহিত হওয়ার পরপরই তা কার্যকরও হয়েছে। এই আইন বলে সন্দেহ হলেই যেকোনো ব্যক্তিকে আটক করতে পারবে পুলিশ। এক বছর গ্রেপ্তার করে রাখা যাবে বিনা বিচারে। জামিন মিলবে না। যেকোনো জায়গায় তল্লাশি চালাতে বাধা থাকবে না। বিপজ্জনক মনে করলেই তাঁকে নির্দিষ্ট এলাকা থেকে বহিষ্কারও করা যেতে পারে। অর্থাৎ স্রেফ সন্দেহের বশে অপরাধ সংগঠিত হওয়ার আগেই যেকোনো ব্যক্তি বিনা বিচারে এক বছরের সাজা ভোগ করতে বাধ্য থাকবেন। একথা ঠিক, যেকোনো অঙ্গরাজ্যে সমাজবিরোধী দমন নির্বাচিত সরকারের অবশ্যকর্তব্য। কিন্তু গুন্ডা দমনের নামে যেন বিরোধী দমনের কুনাট্য মঞ্চস্থ না হয়। আশঙ্কা সেখানেই। উত্তরপ্রদেশ এবং গুজরাতে আগেই এই কঠোর আইন কার্যকর হয়েছে। এনকাউন্টারে ৩০০ সমাজবিরোধীকে নিকেশ করা হয়েছে। কিন্তু অপরাধ বন্ধ হয়নি। শুভেন্দুবাবু যে শান্ত ও নিরাপদ ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলা গড়ার কাজে মনোনিবেশ করেছেন তা স্বাগত। কিন্তু এটা গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষ। এখানে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, ধরনা দেশ ও সংবিধানের পরতে পরতে। তাই স্রেফ সন্দেহ আর প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে যদি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আইন ব্যবহার হয়, বিরোধীদের জব্দ করা, বিশেষ করে একটি সম্প্রদায়কে শায়েস্তা করার লক্ষ্যে যদি এই আইনের ব্যবহার হয় তাহলে তার ফল হবে সুদূরপ্রসারী। গুন্ডা দমনের নামে বিরোধী দমন এদেশ, এই বাংলা কোনোদিন মেনে নেয়নি, মেনে নেবেও না। ইন্দিরা জমানার মিসার বিরুদ্ধেও বাংলা একসময় উত্তাল হয়েছিল। মিসা ছিল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের শায়েস্তা করতে তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের কালা আইন। সেই ইতিহাস শমীকবাবুদের নিশ্চয়ই মনে করিয়ে দিতে হবে না। শাসকের আইনকে বিদায় দিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা তখনই সম্ভব যদি তা নিরপেক্ষভাবে ব্যবহার হয়। অন্যথায় আবার পশ্চিমবঙ্গ ‘পুলিশ স্টেট’- এ পরিণত হবে। মানুষ কিন্তু চোখ বন্ধ করে নেই, সব দেখছে!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ