শান্তনু দত্তগুপ্ত: আমাকে ক্ষমা কোরো মা... তোমাদের অনেক যন্ত্রণা দিলাম। এটাই ছিল নির্ভয়ার শেষ কথা। অমানুষিক নির্যাতন, দিনের পর দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই এবং হার মানা। সত্যিই কি কোনো দোষ ছিল নির্ভয়ার? যারা তাঁকে ধর্ষণ করেছিল, বিকৃত মানসিকতার একের পর এক ছাপ রেখেছিল তাঁর শরীরজুড়ে... কারা ছিল তারা? দোষ কি শুধু তাদেরও? ভুলে যাই, সেই প্রাণীরা আমাদের সমাজেরই অংশ। তারা লুকিয়ে থাকে আমাদেরই মাঝে। দেখা যায় তাদের আর জি কর হাসপাতালে, কখনো বারুইপুরে। এদের কোনো ধর্ম হয় না, জাত হয় না, রাজনৈতিক দল হয় না। তা সত্ত্বেও আমরা এই নৃশংসতায় রাজনীতি খুঁজি। প্রশাসনের দোষ হাতড়ে বেড়াই। তাহলে দোষটা কার?
দোষ এই সমাজের।
বারুইপুরের নাবালিকাকে যেভাবে গণধর্ষণের পর খুন করা হয়েছে, তার প্রত্যেকটা বিবরণ আমাদের আজ রক্ত গরম করে দিচ্ছে। শিউরে উঠছি আমরা। দোষ কি তারও ছিল? অপরাধ ছিল একটাই—বিশ্বাস করেছিল সে। পাড়ারই এক কাকুকে। বা দাদাকে। আমাদের সমাজের মধ্যে থেকেই তাই প্রশ্ন উঠছে, কেন বিশ্বাস করেছিল? কেন গিয়েছিল সে প্রভাসের সঙ্গে? কীসের লোভে?
দোষ আমাদের মানসিকতার।
কেন্দ্রের পরিসংখ্যান বলছে, ভারতে ২০২৪ সালে নথিভুক্ত ধর্ষণের সংখ্যা ২৯ হাজার ৫৩৬টি। এই তালিকায় প্রথম তিনেই রয়েছে উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান ও মহারাষ্ট্র। মনে রাখতে হবে, এই পরিসংখ্যান শুধুমাত্র এফআইআর হওয়া মামলার ভিত্তিতে। প্রতিদিন এমন বহু ঘটনা দেশের আনাচে কানাচে ঘটছে... যা থানা পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না। প্রভাব খাটিয়ে কখনো তা চেপে দেওয়া হচ্ছে, কখনো পরিবারই মেয়েকে বলছে, ‘চুপ, কাউকে বলিস না।’ অভিযুক্ত হয়তো সেখানে পরিবারেরই কেউ। যন্ত্রণা তখন সহ্য করে যেতে হয় মেয়েটিকেই। মুখ বুজে। প্রতিবাদ নয়। প্রতিরোধ নয়। প্রশ্ন নয়। তাহলে দোষী হয়ে যাবে সে-ই।
দোষ তাই পরিবারেরও।
আমরা দেখছি, শুনছি, সবই বুঝছি... কিন্তু একবারের জন্যও রুখে দাঁড়াচ্ছি না। আমাদের হাতেও মোমবাতি দেখা যাচ্ছে... যখন তার নেপথ্যে কোনো না কোনো রাজনৈতিক সমীকরণ থাকছে। যখন সেটা শহুরে ফেনোমেনা হচ্ছে। যখন সেটা সোশ্যাল মিডিয়ায় মাইলেজ দিচ্ছে। বারুইপুরে নাবালিকার জন্য মোমবাতির ব্যবসা এতটুকুও বাড়ল না। জয়নগরের জন্যও না। আমরা রাত দখল করলাম না শান্তিপুরের দু’বছরের মেয়েটির জন্য। কারণ, এই প্রতিবাদে আর কোনো রাজনৈতিক অঙ্ক নেই। আমাদের ‘অপছন্দের’ কারও বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার নেই। ‘আস্থাবান’ নেতানেত্রীরা আজ দিকে দিকে। তাঁদের বিরোধিতা করার মানসিকতাও নেই। কতগুলো ধর্ষণের বা নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে গত দু’মাসে? আমরা জানি না। কারণ, জানার ইচ্ছে রাখি না। আমরা আস্থা রাখায় এখন বেশি আগ্রহী। প্রচার? এখন আর নেই। প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমে এখন হয় চলছে নতুন সরকারের গুণকীর্তন, না হলে ‘আসল’ তৃণমূল বনাম ‘নকল’ তৃণমূলের কলতলার ঝগড়া। প্রচার হচ্ছে... স্থানীয় ইউটিউব চ্যানেলে, পোর্টালে। তারা সরকারি বদান্যতা পায় না। লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের জন্য স্ক্রিনে চোখ রেখে বসে থাকে না। আমরাও ‘আস্থা’য় মশগুল থাকি—এই তো সব সমস্যার সমাধান হয়ে গিয়েছে। এখন আমরা শুধু জমা-খরচের হিসাব কষছি। প্রভাস মণ্ডলের এনকাউন্টার হয়েছে। সে যেদিন ধরা পড়েছিল, সেদিনের ভিডিয়োতে দাবি করেছিল, আমি নির্দোষ। আমাকে লোভ দেখিয়ে শুধু মেয়েটিকে নিয়ে যেতে বলা হয়েছিল। এরপর পুলিশ সূত্রে অনেক কিছু জানা গিয়েছে। সে নাকি দোষ স্বীকার করেছিল। বাকি অভিযুক্তরাও স্বীকার করেছে। কিন্তু গভীর রাতে ঘটনার পুনর্নির্মাণের সময় সে পালানোর চেষ্টা করে। পুলিশের রিভলভার ছিনিয়ে নেয়। তাই তাকে গুলি করে মারা হয়েছে। আমরা তাতেই খুশি। অনেকেই বলছে, এই তো এতদিনে সঠিক সাজা হয়েছে। প্রভাস মণ্ডল সত্যিই অপরাধী ছিল কি না, জানা যায়নি। সে সত্যিই পালানোর চেষ্টা করেছিল কি না, সেটাও অজ্ঞাত। কারণ, ওই ঘটনার কোনো ভিডিয়োগ্রাফি রয়েছে বলে দাবি করা হয়নি। তারপরও আমরা খুশি। ‘খরচ’ হয়েছে বলে। কে খরচ হল? কেন হল? সে আর কোন ‘গোপন’ তথ্য ফাঁস করতে পারত? এই সব প্রশ্নের উত্তর জানার আগ্রহ নেই। আপাতত বিচার চলছে। মুখে মুখে। তথ্য-প্রমাণ সাজানো, চার্জশিট তৈরি, আদালত... ওসব পরে হবে। এখন শো টাইম। সোশ্যাল মিডিয়ায় তুফান। প্রত্যেকেই তদন্তকারী, প্রত্যেকেই বিশ্লেষক, প্রত্যেকেই আইনজ্ঞ। এটাই নতুন ভারত। নতুন বাংলা। নতুন সমাজ। একটা ন্যারেটিভ ছকে ফেলো। সেইমতো টিম বানাও। তারপর পুশ সেলের মতো সেই ন্যারেটিভ ছড়িয়ে দাও। যারা মাথা দুলিয়ে সায় দেবে, তারা সামাজিক। আর যারা দেবে না, তারা সমাজবিরোধী। দেশদ্রোহী। এই গোটা সিস্টেমের জনক কে? আমরা। এই সমাজ। যারা শ্রেণির নামে এখনও ভালো-মন্দ বিচার করে। জামাকাপড় দেখে স্টেটাস এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার সিলমোহর দেয় এবং মতামতের মধ্যে রাজনীতির রং খোঁজে। সেই মতো নির্ধারিত হয় বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। ‘ভালো-খারাপ’ স্টিকার তো আছেই সেঁটে দেওয়ার জন্য। ‘ভালো’ হওয়ার কিছু ক্রাইটেরিয়া আছে। সেগুলো মেনে চলতে হবে। তাহলে চুরিটুরি করলেও ‘জনরোষ’ আছড়ে পড়বে না। আর ক্রাইটেরিয়া মানতে না চাইলে? ডিম আছে, কেস-সুটকেস সব আছে। এখন আবার নতুন আইনও আছে। উর্দিধারীদের হাতে অসীম ক্ষমতাও। ‘ভালো’ শাসক বা বিরোধীদের বাইরে যারাই থাকুক, তাদের কাজ কারবার এতটুকু খারাপ মনে হলেই একুশে আইন। আমরা বলব, ‘ঠিক... ঠিক... ঠিক... এটাই তো চেয়েছিলাম।’ ধর্ষণ বন্ধ হবে না। খুন হবে। তোলাবাজিও। আমরা বলব, ‘উঁহু, মেয়েটির জামাকাপড় ঠিক ছিল না।’ কিংবা ‘কী দরকার ছিল অত রাতে বেরনোর?’ আগে মঞ্চ বেঁধে আন্দোলনের ঢেউ তোলা বিপ্লবীরা খুনের পর বলবে, ‘আস্থা আছে আমাদের।’ ব্যবসায়ীরা বলবে, ‘আগেও তোলা তুলত। এখনও তোলে। তবু আগের থেকে এই তোলাবাজি অনেক ভালো।’ এই সবাইকে মিলিয়েই যে সমাজ। মানব সমাজ। যে সমাজ এখনও স্রেফ প্রবৃত্তির উপর চলে। আর প্রবৃত্তি বা ইনস্টিংক্ট-এর সঙ্গে মানবিকতা বা বিবেচনার কোনো সম্পর্ক নেই। ধর্ষণ, খুন, এনকাউন্টার... আমরা তাই ভাগ হয়ে যাই। একভাগ বলে দারুণ হয়েছে। এটাই হওয়ার ছিল। আর একদল বলে, এটা সন্ত্রাস। প্রত্যেকেই নিজের নিজের মতামত এবং স্বার্থ প্রতিষ্ঠার খেলায় মেতে রয়েছি। একবারও বলি না, এর কোনোটাই হওয়া উচিত ছিল না। কোনোটাই মান এবং হুঁশের সঙ্গে খাপ খায় না। আমরা শিক্ষা নিই না ঘটনা বা দুর্ঘটনা থেকে। শেখাই না আমাদের নতুন প্রজন্মকে। বলি না যে, ফারাকটা দেখার ধরনে। ভাবনায়। প্রতিক্রিয়ায়। ছেলেদের শেখাই না... নজর ঠিক করো। সম্মান দিতে শেখো। উলটে মেয়েদের বলি, পোশাক ঠিক রাখো। স্বাধীনতা নিয়ে লেকচার দিই, কিন্তু তার ব্যবহারিক প্রয়োগের বেলায় মনের জানালা-দরজার শাটার টেনে দিই। আজ যে কোনো অপরাধ, অন্যায়ের জন্য প্রশাসনকে দায়ী করতেই পারি। কিন্ত আমরা মনে রাখি না, এই প্রশাসন, সরকারকে আমরাই বসিয়েছি। আমাদের মধ্যেরই কেউ প্রতিনিধিত্ব করছে। আমাদেরই কারওকে শাসক বলে বেছে নিয়েছি... আমরাই। তারা যা করছে, তা করার ছাড়পত্র দিয়েছি আমরাই। সরকারি অফিসার ঘুষ নিলে তার দায় যতটা... আমরা যারা ঘুষ দিয়ে থাকি, দোষ তাদের আরও বেশি। নারী নির্যাতনকারী যদি দোষী হয়ে থাকে, তাহলে সমানভাবে দায়ী আমরাও। কারণ, আমরা সেই দোষীদের ওভাবেই তৈরি করেছি। কাদায় পা ফেলতে দেখেও চোখ ঘুরিয়ে নিয়েছি। বাধা দিইনি। ভেবেছি, পরের ছেলে পরমানন্দ...। কিন্তু ভাবিনি, কাল মেয়েটা আমার হতে পারে। দায় যদি কারও থেকে থাকে, তাহলে তা আমার। আপনার। শিক্ষাহীনতার। সচেতনতা শব্দটিকে কফিনবন্দি করে রাখার।
স্বামী বিবেকানন্দ বলতেন, বড়ো হতে গেলে কোনো জাতির তিনটি বিষয় আগে দরকার। সাধুতার শক্তিতে বিশ্বাস, হিংসা ত্যাগ, আর যারা সৎকাজ করতে চায়, তাদের সহায়তা। বাঙালি এখন এই সবই ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছে। বড়ো তারা আজও... শুধুই মুখে। তাই দোষী খুঁজতে হবে নিজেদের অন্তরে। বাইরে নয়। শোধরাতে হবে। নিজেদের। মনকে, মানসিকতাকে। তবেই বদলাবে সমাজ। ধীরে হলেও।