Bartaman Logo
১৫ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

দরকার আরও পরীক্ষা নিরীক্ষার

ভারতে ই-২০ জ্বালানি ব্যবহারে গাড়ির মাইলেজ ৩-৫% কমবে। সরকারের দাবি ও বিতর্কের মধ্যে কি সত্যি আছে? বিস্তারিত জানুন।

দরকার আরও পরীক্ষা নিরীক্ষার
  • ১৪ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

পোশাকি নাম ই-২০। আসলে ৮০ শতাংশ পেট্রল ও ২০ শতাংশ ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি। ভারতে পেট্রলচালিত গাড়িতে এই জ্বালানি ব্যবহারের কথা ছিল ২০৩০ সাল থেকে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার তার পাঁচ বছর আগেই, গত বছরের নভেম্বর থেকে তড়িঘড়ি দেশের এক লক্ষ পেট্রল পাম্প থেকে এই জ্বালানি বিক্রি চালু করে দিয়েছে। যেহেতু আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় ভারতে অপরিশোধিত তেল আসা প্রবলভাবে ধাক্কা খেয়েছে এবং এদেশের প্রয়োজনীয় জ্বালানির ৯০ শতাংশই আমদানি নির্ভর, তাই পরিস্থিতি সামাল দিতে ই-২০ গত নভেম্বরেই চালু করে দেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এই নিয়ে শুরুতে তেমন কোনো কথা শোনা না গেলেও খুব সম্প্রতি বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছে। কারণ, গত জুন মাসে সুপ্রিম কোর্টে এক মামলায় কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে জানানো হয়, ই-২০ ব্যবহার ভালো না খারাপ, তা এখনও জানা যায়নি। পেট্রলে ইথানল মেশানো এখনও পরীক্ষার স্তরে রয়েছে। ফলাফল জানা যাবে আগামী বছর। অথচ ঘটনা হল, গত নভেম্বরেই ইথানল মিশ্রিত পেট্রল বিক্রি শুরু হয়ে গিয়েছে! এই বিতর্কে ঘি ঢেলেছে তিন দিন আগে কেন্দ্রীয় পেট্রলিয়াম মন্ত্রকের এক স্বীকারোক্তি। তারা জানিয়েছে, ই-২০ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারে গাড়ির মাইলেজ ৩-৫ শতাংশ কমে যায়। অর্থাৎ বিশুদ্ধ পেট্রল চালিত গাড়ি প্রতি লিটারে যত পথ যাবে, ই-২০ তে তার চেয়ে ৩ থেকে ৫ কিলোমিটার কম যাবে। এই ক্ষতি সত্ত্বেও বিশুদ্ধ পেট্রল ও ই-২০ তেলের দাম একই রয়েছে। কেন? 

Advertisement

এই বিতর্কের সঙ্গে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তিও ছড়িয়েছে বিস্তর। বিভ্রান্তির কারণ, ই-২০ জ্বালানি ব্যবহারের পক্ষে সরকার জোরদার সওয়াল করলেও এবং এর থেকে পিছিয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই জানিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও গাড়ি উৎপাদনকারী সংস্থাগুলি ক্রেতাদের আশঙ্কা কাটাতে কার্যত টু শব্দ করছে না। ভারতের বাজারে মূলত ২০২৩ পর্যন্ত কেনা গাড়িগুলি ই-২০ পেট্রল ব্যবহারের উপযুক্ত কি না তা নিয়ে কেন্দ্রের অভয়বাণী আর গাড়ি প্রস্তুতকারী বিভিন্ন সংস্থার নীরবতা এই বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিতর্ক। জ্বালানির পেট্রলের সঙ্গে ইথানলের মিশ্রণে গাড়ির আয়ু ও কর্মক্ষমতা কমে কি না সেই বিতর্ক ভারত ছাড়িয়ে আমেরিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মধ্যে জারি থেকেছে। ফলে অন্যান্য দেশে এই মিশ্রিত জ্বালানি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা সহজ হয়নি। এই কাজ অত্যন্ত ধীর গতিতে চালু হলেও পেট্রলে ৫ বা ১০ শতাংশের বেশি ইথানল মিশ্রণ করা হয়নি। অথচ মোদি সরকার তড়িঘড়ি ই-২০ চালু করে দিয়েছে এবং তা গাড়ির মালিককে কোনো ‘অপশন’ না দিয়েই। বিরোধীদের অভিযোগ অন্তত তেমনই। অর্থাৎ এক্ষেত্রে কেন্দ্রের তরফে একটা চাপিয়ে দেওয়ার মানসিকতা কাজ করেছে।
ই-২০ জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে একাধিক ক্ষতির সম্ভাবনার কথা শোনা যাচ্ছে। যেমন, গাড়ির মাইলেজ কমে যাওয়া ছাড়াও ইথানল ব্যবহারের ফলে হোসপাইপ, গ্যাসকেট, সিল ও রিং-সহ রাবারের জ্বালানি ব্যবস্থার যন্ত্রাংশ ক্ষয়ে যায়! ক্ষতি হয় ইঞ্জিনেরও। এই ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদি ও খরচসাপেক্ষ। তাছাড়া এ দেশে চলাচলকারী দুই ও চার চাকার গাড়ির একটি বড়ো অংশ ই-২০ জ্বালানি ব্যবহারের উপযুক্ত নয়। প্রশ্ন উঠেছে, ইথানল উৎপাদনের সঙ্গে কৃষিক্ষেত্রের সম্পর্ক নিয়েও। ইথানল উৎপাদিত হয় মূলত আখ ও ভুট্টা থেকে। গরিব মানুষের খাদ্য সংকটের দেশে আখ ও ভুট্টার মতো খাবার জ্বালানির কাজে ব্যবহার বাড়তে থাকলে অন্য সমস্যা দেখা দেবে না তো? তাছাড়া এই খাদ্যদ্রব্যগুলির চাহিদা বেড়ে গেলে দাম বাড়ার আশঙ্কাও থাকে, যা আরও দুশ্চিন্তার দিক। অনেকের মতে, আখ একটি জলনির্ভর ফসল। দেশের খরাপ্রবণ এলাকায় এই কৃষিপণ্যের অতিরিক্ত ব্যবহার কতটা সম্ভব ও সংগত? সরকারের অবশ্য দাবি, একমাত্র মাইলেজ সামান্য কমে যাওয়া ছাড়া বাকি সব আশঙ্কার কোনো যুক্তি বা ভিত্তি নেই। ই-২০ জ্বালানি হল অনেক বেশি দক্ষ, গুণগত মানসম্পন্ন ও পরিবেশবান্ধব। এই জ্বালানি ব্যবহারে ক্ষতির কোনো প্রমাণই নাকি মেলেনি। আসলে সরকারের দাবি ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের বিভ্রান্তি-আশঙ্কার মধ্যে একটা বড়োসড়ো ফাঁক থেকে যাচ্ছে। গাড়িতে জ্বালানি হিসাবে সিএনজির মতো ইথানলের ব্যবহারও অস্বীকার করা যায় না। সে জন্য দু’ চাকা, তিন চাকা, চার চাকার চলমান ৩৬ কোটি গাড়িকে আগে এই জ্বালানি ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে হবে। কোথায় কী? আর যেসব গাড়ি এই জ্বালানির উপযুক্ত নয়, তার কী করা হবে—স্পষ্টভাবে সরকারকে তা জানাতে হবে। সরকারের দায়িত্ব হল, যাবতীয় শঙ্কার নিরসন ঘটানো। আর দেশের জ্বালানির ভবিষ্যতের পাশাপাশি জনস্বার্থের দিকটিও সমান গুরুত্ব দিয়ে সরকার বিবেচনা না করলে এবং উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে না পারলে এই বিতর্ক, আশঙ্কা থামার নয়। সরকার কী চায়?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ