সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: শান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় অঞ্চলে আবহাওয়ার পরিবর্তন এখন এক ভয়াবহ জলবায়ু সংকটের চেহারা নিয়েছে। বিশ্বজুড়ে আবহাওয়াবিদ ও বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ গভীর করে সমুদ্রপৃষ্ঠের এই উষ্ণায়ন এবার রূপ নিতে চলেছে ‘সুপার এল নিনো’তে। মার্কিন সংস্থা ‘ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ এবং বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা ইতিমধ্যে সতর্কবার্তা জারি করে জানিয়েছে, ২০২৬-২৭ সালের শীতকালীন মরশুমে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। এই জলবায়ু পরিবর্তনের আঁচ শুধুমাত্র দূরবর্তী কোনো সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেই পড়বে, এমনটা নয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিশ্বজুড়ে। বিশেষ করে ভারতে।
সাধারণভাবে, ‘এল নিনো’ হল প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় অঞ্চলের জলের একটি প্রাকৃতিক উষ্ণায়ন চক্র, যা প্রতি দুই থেকে সাত বছর অন্তর দেখা যায়। স্বাভাবিক সময়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমে বয়ে যাওয়া নিয়ত বায়ু বা ‘ট্রেড উইন্ড’ যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন সমুদ্রের উষ্ণ জলরাশি এশিয়ার উপকূল থেকে লাতিন আমেরিকার দিকে ফিরে যেতে শুরু করে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী বায়ুপ্রবাহ এবং বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ছন্দ সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। যখন এই সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দীর্ঘকালীন গড় থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি বৃদ্ধি পায়, তখন তাকে ‘সুপার এল নিনো’ বলা হয়। ১৯৫০ সালের পর থেকে মাত্র তিনবার (১৯৮২-৮৩, ১৯৯৭-৯৮ এবং ২০১৫-১৬) বিশ্ব এই চরম তীব্রতার মুখোমুখি হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বজুড়ে যে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত তাপ জমা হয়েছে, তাকে জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করে এই ‘সুপার এল নিনো’ আরও বিধ্বংসী হয়ে উঠছে।
২০২৬ সালের শুরু থেকে এই ‘সুপার এল নিনো’র প্রভাব দুই গোলার্ধে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে ভয়াবহ উপকূলীয় তাপপ্রবাহ, আকস্মিক বন্যা এবং ধসের কবলে পড়েছে পেরু। মার্চ মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেখানে অন্তত ৬৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় দু’লক্ষ মানুষ। ৭০০টিরও বেশি জেলায় জরুরি অবস্থা পর্যন্ত জারি করতে হয়েছে। অন্যদিকে, ইউরোপের বুকে এল নিনোর তাপ ঝাঁপিয়ে পড়ার আগেই সাহারান হিট ডোম বা তাপ-বলয়ের কারণে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পার করে গিয়েছে। ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, ইতালি সহ একাধিক দেশে তীব্র তাপপ্রবাহের জেরে অন্তত ১০ হাজার জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৯ হাজার জন ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সি। পরিস্থিতি এমনই যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘হু’ পর্যন্ত এই ভয়াবহ তাপপ্রবাহকে ‘সাইলেন্ট কিলার’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
‘সুপার এল নিনো’র প্রভাব থেকে রেহাই পায়নি ভারতও। আবহাওয়া দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১২৬ বছরের ইতিহাসে ২০২৬ সালের জুন মাসকে দেশের ‘পঞ্চম শুষ্কতম জুন’ হিসাবে রেকর্ড করা হয়েছে। স্বাভাবিক ১৬৫.৩ মিলিমিটার বৃষ্টির বদলে এ বছর জুন মাসে দেশে বৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৯৯.৫ মিলিমিটার! ঘাটতি প্রায় ৪০ শতাংশ। বৃষ্টিপাতের এই ঘাটতির জন্য আইএমডি আংশিকভাবে এল নিনোকে দায়ী করেছে। আসলে জুন মাসে বৃষ্টিপাতের ঘাটতি কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। কিন্তু সারা বিশ্বের বিভিন্ন আবহাওয়া সংস্থা যখন সুপার এল নিনোর সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করছে, এমন একটি বছরে বৃষ্টিপাতের এই ঘাটতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, দেশের ৩৬টি আবহাওয়া উপ-বিভাগের মধ্যে ২৪টিতেই বৃষ্টির তীব্র ঘাটতি দেখা গিয়েছে। মধ্য ভারতে বৃষ্টির ঘাটতি ছিল ৫০%। গুজরাত ও মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যগুলিতে এই ঘাটতি আক্ষরিক অর্থেই আশি শতাংশের গণ্ডি ছাড়িয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে খরিফ শস্যের উপর। ধান, ডাল, তৈলবীজ, আখ চাষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের প্রায় অর্ধেকই কৃষির উপর নির্ভরশীল। এই পরিস্থিতিতে বর্ষার খামখেয়ালিপনা দেশের খাদ্য সুরক্ষা ব্যবস্থাকেই এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
ভারতীয় কৃষকদের জন্য এই সংকট আরও জটিল আকার ধারণ করেছে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির কারণে। চলতি বছরের শুরু থেকেই আমেরিকা ও ইজরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ সমুদ্রবাহিত সার-বাণিজ্য থমকে যায়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন ইউরিয়ার দাম পৌঁছে যায় ৮৫০ ডলারে। ভারত সারের কাঁচামালের প্রায় ৯০% আমদানি করে। একদিকে অনাবৃষ্টিতে ফসলের ক্ষতি, অন্যদিকে আকাশছোঁয়া সারের দাম—এই দুইয়ের জাঁতাকলে পড়ে প্রান্তিক চাষিরা চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে কৃষকদের আত্মহত্যা ও ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়িয়ে তুলছে।
‘সুপার এল নিনো’র দাপটে দেশজুড়ে জলের অভাবের পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে শক্তি সংকট। তীব্র গরমের কারণে লাফিয়ে বাড়ছে এয়ার কন্ডিশনার ও কুলারের ব্যবহার। আর বৃষ্টির অভাবে দেশের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলির উৎপাদন তলানিতে এসে ঠেকেছে। আবার কয়লাচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি চালু রাখতে বিপুল পরিমাণ নদীর জলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু নদীগুলির জলস্তর নেমে যাওয়ায় জলাধারের জল চাষের জন্য দেওয়া হবে নাকি বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু রাখতে ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে দোটানায় সরকার। ভারতের কেন্দ্রীয় জল কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রধান প্রধান জলাধারগুলির জল ধারণ ক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়ে ৩৫ শতাংশের নীচে নেমে এসেছে। ভারতের প্রায় ৬০ কোটিরও বেশি মানুষ তীব্র জলকষ্টের মুখোমুখি এবং দিল্লি, বেঙ্গালুরু ও চেন্নাইয়ের মতো মেগাসিটিগুলি দ্রুত ‘ডে জিরো’ বা সম্পূর্ণ জলহীন অবস্থার দিকে এগিয়ে চলেছে।
অবশ্য এই সমস্ত কিছুর জন্য প্রকৃতিকে দোষ দেওয়ার আগে নিজেদের উন্নয়ন নীতির দিকেও তাকানো প্রয়োজন আমাদের। কেন্দ্রীয় সরকারের বহু সাধের ‘ইথানল মিশ্রণ’ প্রকল্পের জন্য চাল, ভুট্টা ও আখের মতো ফসলের চাষ বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই সমস্ত শস্য চাষে বিপুল পরিমাণ জল লাগে। আবার এক লিটার ইথানল তৈরির জন্য কয়েক হাজার লিটার ভূগর্ভস্থ জল অপচয় হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক ডেটা সেন্টারের রমরমা। একটি ১০০ মেগাওয়াটের হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার ঠান্ডা রাখতে প্রতিদিন প্রায় ২০ লক্ষ লিটার জলের প্রয়োজন হয়। আর চরম জলসংকটে ভুগতে থাকা মুম্বই, চেন্নাই, হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরুর মতো শহরে এই ধরনের ডেটা সেন্টার বেশি সংখ্যায় তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ, আমরা প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতাকে নিজেদের হাতেই ধ্বংস করে চলেছি।
এই সংকট মোকাবিলার উপায় কী? আসলে ‘সুপার এল নিনো’র মতো জলবায়ু বিপর্যয় কয়েকটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ বা শুধুমাত্র ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট’ দিয়ে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি এবং পরিকাঠামোগত পরিবর্তন। প্রথমেই আসা যাক আইনি স্বীকৃতির কথায়। ‘ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট ২০০৫’-এর অধীনে তাপপ্রবাহকে ‘নোটিফায়েড ডিজাস্টার’ হিসাবে ঘোষণা করতে হবে। তা হলে খরা ও বন্যার মতো তাপপ্রবাহের শিকার হওয়া পরিবারগুলিও ক্ষতিপূরণ ও সরকারি সাহায্য পাওয়ার অধিকারী হবে। যে সমস্ত চাষে জলের প্রয়োজন বেশি হয়, তার বদলে কম জলে চাষযোগ্য মিলেট (বাজরা, জোয়ার) বা ডালজাতীয় শস্য চাষে উৎসাহিত করতে হবে। জল সংরক্ষণের জন্য ‘মাইক্রো-ইরিগেশন’ পদ্ধতিও বাধ্যতামূলক করা জরুরি। পাশাপাশি, প্রতিটি গ্রাম-ব্লকে থাকা স্থানীয় পুকুর-দীঘিগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। যাতে সেগুলি ভূগর্ভস্থ জলের স্তর ধরে রাখতে সাহায্য করে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বিপদে পড়ে সমাজের পিছিয়ে পড়া দলিত, আদিবাসী এবং দিনমজুর শ্রেণি। তীব্র সংকটের দিনেও কেউ যাতে অনাহারে না ভোগে, তা নিশ্চিত করতে হবে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারকে।
ব্রিটিশ শাসনকালেও ভারতবর্ষ একাধিকবার দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হয়েছিল। এর মধ্যে অন্যতম ১৮৭৬-৭৮ সালের মহাদুর্ভিক্ষ, যা মাদ্রাজ দুর্ভিক্ষ নামেও পরিচিত। ওই সময়ে দাক্ষিণাত্যের মালভূমি অঞ্চলে ফসলের বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ ছিল তীব্র খরা। আর সেই খরার জন্য অনেকেই এল নিনোকে দায়ী করেন। যদিও তার সপক্ষে কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। যদিও মহা দুর্ভিক্ষের জন্য পুরোপুরি তীব্র খরাকে দায়ী করলে ভুল হবে। কারণ, ব্রিটিশ শাসকরা ওই সময়ে ভারতীয়দের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার বদলে শস্য রপ্তানি করেছিল। দুর্ভিক্ষের শুরুর সময় ভাইসরয় লর্ড লিটন ইংল্যান্ডে রেকর্ড ৩ লক্ষ ২০ হাজার টন গম রপ্তানি করেছিলেন। যার কারণে এই মন্বন্তর আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে শুরু হলেও তার প্রভাব বম্বে প্রেসিডেন্সিতেও ছড়িয়ে পড়েছিল। ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। এমনকি, ২০১৬ সালের খরায় যখন লাতুরের মানুষ জলের লাইনে দাঁড়িয়ে মারামারি করছিল, তখন ক্রিকেট পিচ ভেজাতে লক্ষ লক্ষ লিটার জল অপচয় করা হয়েছিল। বাধ্য হয়ে সরকারকে লাতুরে ১০ কামরার ‘ওয়াটার ট্রেন’ পর্যন্ত (জলদূত) চালাতে হয়েছিল। ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়, দুর্যোগ প্রাকৃতিক হলেও তার কারণে হওয়া মৃত্যু আসলে আমাদের তৈরি সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল। আসন্ন ‘সুপার এল নিনো’ মোকাবিলার জন্য শুধু আবহাওয়ার পূর্বাভাসের উপর নির্ভর করলে চলবে না। বিজ্ঞান, নীতি ও সামাজিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এই রুদ্র প্রকৃতির হাত থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচানো সম্ভব।