রাজদীপ গোস্বামী, মেদিনীপুর: এতদিন বিষয়টি আড়ালে-আবডালে চলত বলে অভিযোগ ছিল। অনেকেই বলতেন, চিকিৎসক আর ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলির মধ্যে এসব ‘অশুভ আঁতাত’। রোগী দেখার পর একাধিক পরীক্ষার কথা প্রেসক্রিপশনে লিখে দিতেন ডাক্তারবাবুরা। নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেওয়া হতো বলেও অভিযোগ উঠত। এবার সেই গোপন বোঝাপড়ার বিষয়টি রীতিমতো বিজ্ঞাপন দিয়ে ফাঁস করে দিল পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সবং ব্লকের তেমাথানি লুটুনিয়ার ‘যমুনা ডায়াগনস্টিক প্যাথলজি অ্যান্ড পলিক্লিনিক সেন্টার’। যা প্রকাশ্যে আসতেই তুমুল আলোড়ন। পত্রপাঠ শোকজ জেলা স্বাস্থ্যদপ্তরের।
সবং ব্লকের তেমাথানি মোড়েই অবস্থিত যমুনা ডায়াগনস্টিক সেন্টারটি। তাদের একটি বিজ্ঞাপন-পোস্টার নজরে আসে সবার। সেখানে ‘ডাক্তারবাবুদের পরিষেবায়’ শিরোনামের তলায় পয়েন্ট আকারে লোভনীয় সব অফার দেওয়া হয়েছে। সেখানে লেখা, ‘বছরে ৫০ হাজার টাকা বি টু বি (বিজনেস টু বিজনেস) করলে স্মার্টফোন উপহার। বছরে এক লক্ষ টাকা বি টু বি করলে ফাইভ স্টার ফ্রিজ উপহার। বছরে ২ লক্ষ টাকা বি টু বি করলে ইলেকট্রিক স্কুটার। বছরে ২৫ হাজার টাকা বি টু বি করলে আকর্ষণীয় ট্যুর প্যাকেজ, গিফট।’ বিজ্ঞাপনটি সংশ্লিষ্ট মহলের ব্যাখ্যা, তুমিও ব্যবসা করো, আমাকেও ব্যবসা দাও। অর্থাৎ, রোগীদের নানা টেস্ট করাতে পাঠালে চিকিৎসকদের এইসব উপহার দেওয়া হবে। ওই বিজ্ঞাপনের শেষ লাইনে লেখা—‘হিসাবপত্র নিজের কাছে রাখিতে হবে।’ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, সত্যিই কি চিকিৎসকদের একাংশ এই ধরনের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত? ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলির মালিকের ব্যবসা বাড়াতে তাঁরা কি অপ্রয়োজনীয় টেস্টের কথা লেখেন? স্বাস্থ্যদপ্তরের এক আধিকারিক অবশ্য বলেন, আভিযোগ এলেই কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্যদপ্তর এখন জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে চলছে। জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য অধিকর্তা (সিএমওএইচ) সৌম্যশঙ্কর ষড়ঙ্গী বলেছেন ‘ওই সংস্থাটিকে শোকজ করা হয়েছে। কোনওরকম অনৈতিক কাজ বরদাস্ত করা হবে না।’ এদিন বিষয়টি জানতে যমুনা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ফোন করা হয়। ফোন ধরে কথা বলেন চন্দন সেন নামে এক ব্যক্তি। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, ‘আমি চিকিৎসদের গিফট দিতেই পারি। না দেওয়ার কি রয়েছে। লোকে তো ফ্ল্যাট, গাড়িও দিচ্ছে।’
দিন কয়েক আগেই ওষুধের দোকানের আড়ালে লাইসেন্স ছাড়াই পলিক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও রক্তের নমুনা সংগ্রহের কাজ চালানোর অভিযোগে চারটি সংস্থাকে বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্যদপ্তর। সবংয়ের ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টার দস্তুরমতো বিজ্ঞাপন দিয়ে অনৈতিক কাজকে প্রকাশ্যে আনার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়, সেই দিকে তাকিয়ে জেলাবাসী। মেদিনীপুর শহরের ব্যবসায়ী রানা দাস বলছিলেন, ‘এত দিন ডাক্তারবাবুদের একাংশের সঙ্গে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের আঁতাতের কথা শুনতাম। এখন দেখছি, বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রচারও হয়! অবিলম্বে কড়া পদক্ষেপ নিক প্রশাসন।’
মেদিনীপুর শহরের বাসিন্দা তথা চিকিৎসক রাজীব দে আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘এই ঘটনায় রাজ্য প্রশাসন ও চিকিৎসকরা দায়ী নন। এক ধরনের অসাধু ব্যবসায়ীদের জন্য চিকিৎসকদের বদনাম হচ্ছে। প্রশাসন কড়া ব্যবস্থা গ্রহণ করুক।’