নিজস্ব প্রতিনিধি, বর্ধমান ও বহরমপুর: সিবিআইয়ের হাতে ধৃত চিকিৎসক তপন কুমার জানা বেপরোয়া মনোভাব নিয়ে চলতেন। কর্মজগতে হোক বা নিজের এলাকায়, কাউকেই তিনি পাত্তা দিতেন না। বর্ধমানের মিঠাপুকুরে তাঁর প্রতিবেশীদের সঙ্গেও তিনি মিশতেন না। এক প্রতিবেশী বলেন, এলাকার কারও সঙ্গে তেমন কথা বলতেন না। তাঁর চালচলন ছিল অন্যরকম। মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজে তাঁর দাপটে কেউ মুখ খোলার সাহস দেখাতেন না। তিনি বর্ধমানে বিভিন্ন নার্সিংহোমেও প্র্যাকটিস করতেন। শনিবার রাতেও তিনি খোসবাগানে একটি নার্সিংহোমে অপারেশন করেন। সেখান থেকে ঘুষের ১০ লক্ষ টাকা নিতে কলকাতায় রওনা হয়েছিলেন।
মুর্শিদাবাদ মেডিক্যালের অধ্যক্ষ অমিত কুমার দাঁ বলেন, তপনবাবু ন’বছর ধরে মেডিক্যাল কলেজের অ্যানাটমি বিভাগে আছেন। তিনি বর্তমানে এইচওডি পদে কর্মরত। তাঁর বাড়িতে সিবিআই হানা ও গ্রেপ্তারির ব্যাপারে আমি শুনেছি। কেন কী কারণে, এর বেশি কিছু জানি না।
তবে মেডিক্যাল কলেজ সূত্রে জানা গিয়েছে, অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিলেন এই চিকিৎসক। একসময় বামপন্থী নেতাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। মেডিক্যাল কলেজের পূর্বতন এক অধ্যক্ষের সময় তপনবাবু মুর্শিদাবাদ মেডিক্যালে প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন। পড়ুয়াদের উপরেও তিনি ছড়ি ঘোরাতেন। বিভাগীয় চিকিৎসকরা তাঁর দাপটে টুঁ শব্দ করতে পারতেন না। এমনকী, মাসের অর্ধেকের বেশি সময় তিনি মেডিক্যালে না থাকলেও প্রিন্সিপালকে সে ব্যাপারে কিছুই জানাতেন না। ওই চিকিৎসক মুর্শিদাবাদ মেডিক্যালের অ্যানাটমি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত অবস্থায় ছুটি না নিয়েই চলে যেতেন ভিনরাজ্যে। কাউকেই পরোয়া করতেন না। শাসকদল ঘনিষ্ঠ বেশ কয়েকজন চিকিৎসকের সঙ্গে তিনি প্রকাশ্যেই দুর্ব্যবহার করতেন বলে অভিযোগ।
মেডিক্যালের এক পদাধিকারী চিকিৎসক বলেন, বেসরকারি কলেজগুলিতে মোটা টাকার বিনিময়ে চিকিৎসক পড়ুয়াদের ভর্তিতেও তপনবাবুর হাত ছিল। কেউ প্রকাশ্যে কিছু মুখ না খুললেও তপনবাবুকে ধরলে ভালো কলেজে ভর্তি হওয়া যায়, সেই চর্চা চলত।
শনিবার রাতে সিবিআইয়ের আটজনের একটি তদন্তকারী দল বর্ধমান শহরের মিঠাপুকুরের হাতিশাল এলাকায় যায়। সেখানেই তপনবাবুর বাড়িতে তল্লাশি চলে। রবিবার সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত ওই অভিযান চলে। যদিও তল্লাশির সময় ওই চিকিৎসক বাড়িতে ছিলেন না। তাঁর স্ত্রীও চিকিৎসক। তিনি বাড়িতে ছিলেন। পরে সিবিআই জানায়, অভিযুক্ত চিকিৎসক তপনবাবুকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সেন্ট্রাল ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য(বহরমপুর) রঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, মুর্শিদাবাদ মেডিক্যালের অ্যানাটমির বিভাগীয় প্রধান হিসেবে তিনি কর্মরত আছেন। মেডিক্যাল এডুকেশন ইউনিটের কোঅর্ডিনেটর হিসেবে উনি প্রথমে নিযুক্ত হয়েছিলেন। তারপর অ্যাক্সেসর হিসেবে যোগ দেন। আমি ওর সহকর্মী হিসেবে দেখেছি, প্রত্যেক মাসেই উনি এখানে ওখানে চলে যেতেন। কারও কোনও পারমিশন নিতেন না। পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে এটা দৃষ্টান্ত তৈরি হল, যে এই পদে থেকে কেউ এভাবে ঘুষ নিতে পারেন। এমনটাও সম্ভব, কেউ ভাবতেও পারেনি। মুর্শিদাবাদ মেডিক্যালে সারা মাসে মাত্র ১০-১২ দিন থাকতেন। বাকি সময় এইসব কাজ সামলাতেন। বেশকিছু ছাত্র এখন অভিযোগ তুলছে যে, তাদের সঙ্গে তিনি অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করতেন। ধৃত চিকিৎসকের (ইনসেটে) বাড়িতে সিবিআই তল্লাশির পর।-নিজস্ব চিত্র