নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: ঘাট বৈধ! অথচ অভিযোগ, সেই বৈধ ঘাটেই রমরমিয়ে চলছে অবৈধ কারবার। অবৈধভাবে বালি মজুত করা হচ্ছে নদীর পাড়ে। তারপর তা পাচার করা হচ্ছে রমরমিয়ে। মেশিনের সাহায্যে বালি তোলার অনুমোদন নেই। অথচ সরকারি নিয়মের তোয়াক্কা না করে মেশিন দিয়েই বালি তোলা হচ্ছে। পিছনে রয়েছে প্রভাবশালীদের হাত! এনিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ পৌঁছাচ্ছিল জেলাশাসক বিধান রায়ের কাছে। রবিবার গভীর রাতে অতর্কিতে তিনি সেই বালি ঘাটে হানা দিলেন। অবৈধ কারবার ধরলেন হাতেনাতে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র চাপানউতোর শুরু হয়েছে জেলাজুড়ে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, রবিবার গভীর রাতে মহম্মদবাজার থানার অধীন ভূতুড়া পঞ্চায়েতের রাজ্যধরপুরের ময়ূরাক্ষী নদীর নদীঘাসবেড়া ঘাটে হানা দেন জেলাশাসক। তাঁর সঙ্গে ছিলেন অতিরিক্ত জেলাশাসক (উন্নয়ন) বিশ্বজিৎ মোদক, বিডিও অভিষেক মিশ্র। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছন মহম্মদবাজার থানার আইসি প্রসেনজিৎ ঘোষও। জেলাশাসক দেখেন, বৈধ ঘাটে রমরমিয়ে চলছে অবৈধ কারবার। ওই ঘাটে যেখানে যন্ত্রের সাহায্যে বালি তোলা নিষিদ্ধ, সেখানে নৌকার সাহায্যে বালি তোলা হচ্ছে। সম্পূর্ণ অবৈধভাবে বালি মজুত করা হয়েছে নদীর পাড়ে। শুধু তাই নয়, অবৈধভাবে সেই বালি পাচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। ঘটনাস্থলে প্রায় তিনটি জেসিবি, মেশিন লাগানো একাধিক নৌকা নজরে আসে জেলাশাসকের। পাশাপাশি রাস্তায় বালির গাড়ি আটকেও পরীক্ষা করেন জেলাশাসক। দেখা যায়, প্রায় ১৫টি ডাম্পার অতিরিক্ত বালি চাপিয়ে যাচ্ছিল। মহম্মদবাজার থানার আইসিকে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন জেলাশাসক। যদিও সূত্রের খবর, এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনও পদক্ষেপ করেনি পুলিশ।
তবে যে বালিঘাটে অভিযানে গিয়েছিলেন জেলাশাসক সেই ঘাটের লিজ হোল্ডারের বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ রয়েছে। মাসখানেক আগেই ওই বালি ব্যবসায়ীর মেদিনীপুরের বাড়িতে হানা দেয় এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) কর্তারা। প্রায় ১৪ ঘণ্টা ঘণ্টা তল্লাশির পর বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ, মোবাইল ও বেশকিছু নথিপত্র বাজেয়াপ্ত করে ইডি। কেন্দ্রীয় সংস্থার অভিযোগ, বৈধ খাদান থেকে অবৈধভাবে বালি তুলে ‘কিউআর কোড স্ক্যান’ এবং ‘ক্যারিং অর্ডার(সিও)’ জালিয়াতি করে বেশি দামে সেই সব বালি বিক্রি করে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন ওই ব্যবসায়ী। বীরভূমের পাশাপাশি ঝাড়গ্রামেও একাধিক বালিঘাট রয়েছে ওই ব্যবসায়ীর। একটি সূত্রের দাবি, একাধিক প্রভাবশালী হাত রয়েছে ওই ব্যবসায়ীর মাথায়। সেই কারণেই ইডির হানার পরেও ওই ব্যবসায়ীর অবৈধ কারবার যে বন্ধ হয়নি, তা স্পষ্ট।
বীরভূমে অবৈধ বালির কারবার নতুন নয়। বিরোধীদের অভিযোগ, শাসকদলের প্রভাবশালী নেতাদের হাত ধরেই বেঁচে রয়েছে এই অবৈধ কারবার। তবে, ইডির ওই হানার পরেই অবৈধ বালি তোলা রুখতে কড়া পদক্ষেপের নির্দেশ দেয় রাজ্য সরকার। নির্দেশে স্পষ্ট জানানো হয়, অবৈধ বালি খাদানগুলির কার্যকলাপ রুখতে চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। তারপর থেকেই অবৈধ কারবারের রুখতে আরও বেশি করে সচেষ্ট হয়েছে প্রশাসন। তাছাড়া, চলতি বছরের শুরুতেই এনিয়ে জেলাশাসককে একবার সতর্ক করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি সাফ জানিয়েছিলেন, সরকারের রেভিনিউ কেউ নিয়ে চলে যাবে, তোমরা আঙুল গুটিয়ে বসে থাকবে এটা সহ্য করব না। এমনকী, মহম্মদবাজার সহ কিছু থানার আইসি-কেও মুখ্যমন্ত্রীর রোষের মুখে পড়তে হয়েছিল। কিন্তু, তারপরেও পরিস্থিতি কী আদৌ বদলেছে?
নিজস্ব চিত্র