সংবাদদাতা, রামপুরহাট: কোথাও টুকরো কাগজে লিখে চুড়িদার, প্যান্টের চোরা পকেটে ভরা হচ্ছে। কোথাও আবার মাইক্রো জেরক্স করা কাগজ কাঁচি দিয়ে সাইজ করে কেটে লুকিয়ে পরীক্ষার হলে ঢুকছেন পরীক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার ডিপ্লোমা ইন এলিমেন্টারি এডুকেশন(ডিএলএড) পরীক্ষা শুরুর আগে রামপুরহাট গার্লস হাইস্কুলের সামনে এমনই চিত্র ধরা পড়ল। আগামীর শিক্ষক-শিক্ষিকাদের এভাবে ঢুকলি নিয়ে পরীক্ষার হলে ঢোকা দেখে পথচলতি অনেকেই তাজ্জব হয়ে যান।
ডিপ্লোমা ইন এলিমেন্টারি এডুকেশন পরীক্ষার সুরক্ষা নিয়ে কড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদ। আজ থেকে ডিএলএড-এর পার্ট টু পরীক্ষা শুরু হল। চলবে আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত। প্রশ্নপত্র যাতে কোনও ভাবেই ফাঁস না হয়, সেজন্য পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র পাঠানো হচ্ছে এমন বাক্সে যা বন্ধ থাকছে ‘ডিজিটাল কম্বিনেশন লক’-এর মাধ্যমে। প্রশ্নপত্রের সুরক্ষা বজায় রাখতে প্রথম পাতা এবং শেষ পাতায় কোনও প্রশ্ন রাখা হবে না বলে ঘোষণা করেছে সংসদ। কারণ, অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশ্নপত্রের প্রথম বা শেষ পাতার ছবি ভাইরাল হয়েছে। প্রশ্নপত্রে থাকবে কিউআর কোড। যাতে প্রশ্নপত্রের ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ালে সঙ্গে সঙ্গে চিহ্নিত করা যাবে। এছাড়া পরীক্ষা কেন্দ্রে ঢোকার আগে প্রত্যেক পরীক্ষার্থীকে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে পরীক্ষা সহ নানা পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদ।
কিন্তু, এত কড়াকড়ির মধ্যেও এদিন অন্য চিত্র ধরা পড়েছে রামপুরহাট গার্লস হাইস্কুলের সামনে। স্কুল সূত্রে জানা গিয়েছে, মুর্শিদাবাদের মোড়গ্রাম, নলহাটির লোহাপুর সহ পাঁচটি ডিএলএড কলেজের প্রায় ৩৫০জন পরীক্ষার্থীর সিট পড়েছে এই স্কুলে। সেই মতো অনেক আগে থেকেই পরীক্ষার্থীরা এই স্কুলের সামনে এসে জড়ো হন। তাঁদের কেউ স্কুলের সামনে টাউনহলের বারান্দায়, কেউ বা জিতেন্দ্রলাল মূর্তির নীচে বাঁধানো জায়গায় বসে টুকলি তৈরি করছিলেন। নকল করার জন্য রীতিমতো কসরত করতে দেখা যায় পরীক্ষার্থীদের। কেউ চিরকুটে লিখে পকেট বা শরীরের কোথাও লুকাচ্ছেন। কেউ বা মাইক্রো জেরক্স করে এনেছেন। তাঁরা কাঁচি দিয়ে সাইজ করে কেটে চুড়িদার ও শালোয়ারের চোরা পকেটে ভরছেন। পরীক্ষার হলে নকল করতে যেভাবে সারি দিয়ে বসে যেভাবে তাঁরা কসরত করছেন, তা রীতিমতো ‘শিল্প’। পাশে বসে থেকে সেইসব পরীক্ষার্থীদের অসদুপায় অবলম্বনে সহায়তা করছেন বয়স্করা। বেলা ১২টায় পরীক্ষা শুরুর কিছুক্ষণ আগে পরীক্ষার্থীরা স্কুলে ঢুকে পড়েন। কিন্তু, আশ্চর্যের বিষয়, গেটে পরীক্ষার্থীদের দেহ তল্লাশি ও মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে পরীক্ষা চললেও তাতে ধরা পড়েনি ওই টুকলির ওই চিরকুট।
এদিকে প্রকাশ্যে আগামীর শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নকল করার এই প্রবণতা দেখে পথচলতি অনেকেই তাজ্জব হয়ে যান। সুবিনয় মজুমদার নামে একজন বলেন, শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি প্রকাশ্যে এসেছে। আদালতের রায়ের পর যোগ্য অযোগ্য শিক্ষক নিয়ে হইচই পড়ে গিয়েছে। অনেকে চাকরিহারা হয়েছেন। কিন্তু, এদিন যা দেখলাম তাতে এই পরীক্ষার্থীদের অনেকেই তো প্রথম থেকেই অযোগ্য। আগামী দিনে এরাই স্কুলগুলির শিক্ষক-শিক্ষিকা হবেন। তাঁরা নতুন প্রজন্মকে কী শিক্ষা দেবেন সেটা ভেবেই খুব খারাপ লাগছে। ভবিষ্যৎ পড়ুয়ারা কী শিখবে? পরীক্ষা হলে কড়া নজরদারি হলে হয়তো এরা কেউই পাশ করতে পারবে না।
তখনও পরীক্ষা শুরু হয়নি। সেই সময় স্কুলের টিচার ইনচার্জ মল্লিকা হালদারকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, স্কুলের বাইরে পরীক্ষার্থীরা নকলের প্রস্তুতি নিলেও আমদের কিছু করার নেই। তবে হলের ভিতরে এসব কিছু হবে না। পরীক্ষা শেষের কিছুক্ষণ আগে ফের মল্লিকাদেবীকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, নকল সহ কেউ ধরা পড়েনি। এব্যাপারে ডিআই(প্রাথমিক) শুকলাল হাঁসদার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বাইরে ওসব চললেও হলে শান্তিপূর্ণ পরীক্ষা হয়েছে। জেলায় নকল সহ কেউ ধরা পড়েনি।