আমলকীর এত স্বাস্থ্যগুণ জেনেও আপনি খাচ্ছিলেন না? কীভাবে আমলকী খেলে কোন কোন রোগ দূর হয়?
  • ২২ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

লিখেছেন মালদা জেলার হবিবপুরের আর.এন.রায় রুরাল হাসপাতালের আয়ুর্বেদ মেডিক্যাল অফিসার (ন্যাশনাল আয়ুষ মিশন) ডাঃ বিশ্বজিৎ ঘোষ।

Advertisement

আয়ুর্বেদশাস্ত্রে আমলকী এক অমূল্য ভেষজ।
সুশ্রুত সংহিতা মতে যা অম্লরসপ্রধান, মধুর, তিক্ত,কষায় রসযুক্ত। চক্ষুষ্য (চোখের পক্ষে হিতকর), সর্বদোষঘ্ন ও বাজীকারক (শক্তি বর্ধক) গুণসম্পন্ন বলে বর্ণিত। সামগ্রিকভাবে, তারুণ্য ধরে রাখা, শারীরিক স্ফূর্তি বজায় রাখা এবং চুলের স্বাস্থ্যরক্ষায় আমলকী একটি উল্লেখযোগ্য ভেষজ। চরক সংহিতা মতে বয়ঃস্থাপক (তারুণ্য ধরে রাখে) রসায়নধর্মী এবং বহুবিধ ঔষধিগুণে সমৃদ্ধ।
চ্যবনপ্রাশের অন্যতম প্রধান উপাদান থেকে শুরু করে সৌন্দর্যচর্চা ও সৌন্দর্যরক্ষায়ও আমলকীর গুরুত্ব অপরিসীম। অন্যদিকে আমলকী ভিটামিন সি-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে পরিচিত। এর পাশাপাশি এতে রয়েছে বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান, যা শরীরের কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করে।
আয়ুর্বেদ গুণবিচারে আমলকী: 
১. ত্বকের তারুণ্য ও লাবণ্য রক্ষায় আমলকী: 
আমলকীতে উপস্থিত ভিটামিন সি, ট্যানিন, গ্যালিক অ্যাসিড এবং অন্যান্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান ত্বকের স্বাভাবিক স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সহায়ক। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান ফ্রি র‍্যাডিক্যালের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় ভূমিকা পালন করে। নিয়মিত খাদ্যতালিকায় ১–২ টি আমলকী রাখলে ত্বকের সতেজতা ও স্বাভাবিক লাবণ্য বজায় রাখতে সহায়তা মিলতে পারে। পাশাপাশি ত্বকের রুক্ষতা ও অকাল বলিরেখা প্রতিরোধে সুষম আহার এবং যথাযথ ত্বকচর্চাও গুরুত্বপূর্ণ।
২. হজমশক্তি ও জঠরাগ্নির সাম্য রক্ষায়: 
আয়ুর্বেদে আমলকীকে পরিপাকতন্ত্রের সুস্থতা রক্ষায় ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ হিসেবে বিবেচিত হয়ে। সকালে পরিমিত পরিমাণে আমলকীর রস সেবন করলে কোষ্ঠকাঠিন্য ও হজমের অস্বস্তি প্রশমনে সহায়ক হয়। আয়ুর্বেদ মতে এটি জঠরাগ্নির সাম্যতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। সুস্থ পরিপাকপ্রক্রিয়া শরীরের পুষ্টি, কর্মক্ষমতা এবং সামগ্রিক সুস্থতা বজায় রাখায় আমলকী অনবদ্য।
৩. মানসিক সতেজতা ও ক্লান্তি নিবারণে
বর্তমান কর্মব্যস্ত জীবনে মানসিক অস্থিরতা, ক্লান্তি ও অনিয়মিত জীবনযাত্রা অনেকের নিত্যসঙ্গী। পুষ্টিকর খাদ্যের অংশ হিসেবে আমলকীর রস শরীরের স্বাভাবিক পুষ্টি বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে। আয়ুর্বেদীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে আমলকী পিত্তপ্রশমক হিসেবে বিবেচিত। তবে অনিদ্রা, দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি কিংবা মানসিক অস্থিরতার ক্ষেত্রে আমলকীর রস সেবনের পাশাপাশি পথ্য আহার ও দিনচর্যা ও ঋতুচর্যা মেনে চলা উচিত।
৪. চুলের স্বাস্থ্য ও খুশকি প্রতিরোধে
আমলকীর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান এবং প্রচলিত ভেষজ ব্যবহারের কারণে চুলের পরিচর্যায় এর বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। আমলকী চুলের পরিচ্ছন্নতা, কোমলতা ও স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়। খুশকির সমস্যায় প্রচলিত একটি ঘরোয়া পদ্ধতি হলো ১ চামচ আমলকী চূর্ণের সঙ্গে পরিমাণমতো টক দই মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করা। স্নানের প্রায় ১৫ মিনিট আগে মাথার ত্বকে আলতোভাবে লাগিয়ে পরে ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া যায়। প্রয়োজনে উপযুক্ত শ্যাম্পু ব্যবহার করা যেতে পারে।
অন্যদিকে আমলকী তেল চুলের জন্য অমৃতসমান এবং এটি সর্বজনবিদিত। (আমলকী পরিমাণ মতো তেলের সঙ্গে মিশিয়ে মৃদু আঁচে গরম করে ছেঁকে নিন ও ঠান্ডা করে ব্যবহার করুন) এই তেল চুলের বৃদ্ধি,পুষ্টি ও কেশকৃষ্ণকরনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৫. নিস্তেজ ত্বকের পরিচর্যায় আমলকী:
ত্বকের নিস্তেজ ভাব ও অবাঞ্ছিত কালো ছোপের পরিচর্যায় আমলকী পেস্টের সঙ্গে হলুদের গুঁড়ো মিশিয়ে পেস্ট তৈরির একটি প্রচলিত ঘরোয়া পদ্ধতি রয়েছে। এর জন্য ১ চামচ আমলকী পেস্ট সঙ্গে ১ চামচ হলুদের গুঁড়ো মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করা যায়। স্নানের আগে চোখের চারপাশ এড়িয়ে ত্বকে আলতোভাবে লাগিয়ে প্রায় ১০ মিনিট পর ঈষদুষ্ণ জল দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হয়।
৬. বার্ধক্যজনিত সমস্যায় আমলকী: 
আমলকী রসায়ন (আন্টি অক্সিডেন্ট) গুণসমৃদ্ধ হওয়ায় জ্বরাব্যাধি (বার্ধক্য জনিত রোগ) এ আমলকী, ঘি অবলেহ অত্যন্ত উপকারী যোগ। এটি শারীরিক পুষ্টির পাশাপাশি স্নায়ুদূর্বলতা জনিত সমস্যায় ভালো কাজ দেয়।
৭. চোখের সমস্যায় আমলকী:
চোখ উঠলে ২-৩ টুকরো আমলকী গরমজলে সারারাত ভিজিয়ে রাখুন, পরদিন সকালে সেটা ছেঁকে ২ ফোঁটা করে দিনে দু-তিন বার চোখে দিন এতে চোখ ওঠা সেরে যায়। এক্ষেত্রে ত্রিফলা ভেজানো জলও ব্যবহার করা যেতে পারে।
৮. শীতপিত্ত বা অ্যালার্জিজনিত ত্বকের সমস্যায়:
শীতপিত্তে অর্থাৎ এলার্জির জন্য অনেকেরই মাঝে মাঝে গায়ে চাকা চাকা আকৃতির র‍্যাশ বেরয়। এক্ষেত্রে ৩ চামচ আমলকীর রসের সঙ্গে ২৫০ মিলিগ্রাম নিমপাতা চূর্ণ মিশিয়ে সকালে খালিপেটে সপ্তাহখানেক খেতে হবে এতে উক্ত সমস্যাটি নিশ্চিতরূপে প্রশমিত হয়। তবে এইসময় ডিম, চিংড়ি, পুঁইশাক জাতীয় খাওয়ার এড়িয়ে চলা উচিত।
৯. অম্লপিত্ত প্রশমনে আমলকী:
অম্লপিত্ত রোগে যেখানে প্রায়ই টক ঢেঁকুর হচ্ছে সঙ্গে গলা বুক জ্বালা,কিছু খেলেই বমি বমি ভাব এক্ষেত্রে পূর্বদিন রাতের আমলকী ভেজানো জল সেবন করলে পিত্তবিকৃতি নষ্ট হয়ে অম্লপিত্ত রোগ শান্ত হয়।
১০. কোষ্ঠকাঠিন্য ও অরুচি রোধে আমলকী স্বরস:
যারা প্রায়ই এই সমস্যায় ভুক্তভোগী তারা নিয়মিত কিছুদিন আমলকীর রস ২-৩ চামচ হাফ কাপ জলে মিশিয়ে সকালের দিকে সেবন করুন, তবে পাশাপাশি পর্যাপ্ত জল পান ও ফাইবার সমৃদ্ধ খাদ্য সেবনও জরুরি। অন্যদিকে মূলত জ্বর পরবর্তীকালে বা রোগমুক্তির পর অনেকেরই অরুচি দেখা দেয় সেক্ষেত্রে একটুকরো আমলকী সৈন্ধব লবণের সঙ্গে মিশিয়ে আচারের মতো খেলে অরুচি ভাব কেটে যায়।
সাথে হজমের গোলযোগ থাকলে উষ্ণ জল অনুপানে ত্রিফলা খাওয়া যেতে পারে।